ঢাকা, বুধবার, ১৩ই ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং | ২৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

বনের পশুর আগে মনের পশু কোরবানি করুন !

এম আরমান খান জয়,গোপালগঞ্জ :

মনের পশু জবাই ছাড়া কোরবানি কি হয় ?
বনের পশু দিনের শেষে বনের পশুই রয়।
যে পেতে চায় প্রভুর থেকে প্রেমের পুরুস্কার,
বনের আগে মনের দিকেই দৃষ্টি থাকে তার ।
দাম কতো আর নাম কতো এই বৃত্তে পড়ে রই,
ভোগ বিলাসে আত্মত্যাগের সময় পেলাম কই!
যে কোরবানি ব্যার্থ দিতে মানবতার জয়,
সে কোরবানি হত্যা ছাড়া আরতো কিছু নয় …

 

 

 

 

পবিত্র ঈদুল আজহা মুসলিম জাতির অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব প্রতিবছর চান্দ্রমাসের ১০ জিলহজ ঈদুল আজহা বিশ্বের মুসলমানদের কাছে কোরবানির অফুরন্ত আনন্দের সওগাত ও ত্যাগের উজ্জ্বল মহিমা নিয়ে আসে।

 

 

 

 

 

আকাশে ভাসছে কোরবানির চাঁদ। চাঁদে কোরবানির ঈদ। চলছে কোরবানির প্রস্তুতি। গোয়ালের গুরু যাচ্ছে হাটে, হাটের গরু গোয়ালে। আনন্দ উল্লাসে চলছে গরু ক্রয়ের লড়াই। গরুকে বধূ সাজে আনা হচ্ছে কোরবানির হাটে। গরুর গায়েও দেখা গেছে ‘লা ইলাহা ইল্লালাহ’র ট্যাট্টু। দামেরও হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতা। এ নতুন কিছু নয়। এগুলো আমাদের গরু কোরবানির চিরাচরিত চিত্র। ঈদ যেহেতু আনন্দ উল্লাস থাকবেই। ঈদুল আযহা মানেই ত্যাগের আনন্দ। ত্যাগটা কিসের? পশু জবাইয়ের ত্যাগ। উল্লাসটা রক্তনদীর। পশুর লাল রক্তের সঙ্গে ভেসে যাবে মনের কাল রক্তও।

 

 

 

 

 

বিষয়টি এমনই হওয়ার ছিল। তবে আজকাল কোরবানির দৃশ্য দেখে অন্য কিছু ভাবতে হচ্ছে। প্রতিবছর কোরবানি এলে-গেলেও, পশুর রক্তের বন্যা বইলেও মানুষ রক্তের বন্যা আর থামে না। মানুষে মানুষে হানাহানি, খুনাখুনি লেগেই আছে। হিংসা প্রতিহিংসা, লুট আহাজারি, দখলদারিত্বের মারমার কাটকাট যুদ্ধ। এসব যুদ্ধ লেগে আছে কোরবানির হাটেও। চাঁদা আদায়, দালালি, জবরদখলের দৃশ্য হাটের নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। সবকিছু ছাড়িয়ে কোরবানির দিনের জবাই প্রতিযোগিতা দেখেও লজ্জাবোধ হয়। কোন মহল্লা থেকে আগে শুরু হবে, কার গরুটা আগে জবাই হবে এ নিয়ে চলে টানা হেচড়া। ফলে সমাজবন্ধনে নতুন করে দেখা দেয় সঙ্কট। কোরবানির চামড়া নিয়েও চলে স্বার্থবাদী বাণিজ্য। ন্যায্য মূল্য না দিয়েই ছিনিয়ে নেওয়া হয় গরিব, এতিম, অসহায়দের সংগৃহীত কোরবানির পশুর চামড়া।

 

 

 

 

 

 

আত্মত্যাগের দিনে ভোগ ও বাণিজ্যের মহড়া চলে সর্বত্র। দামি গরুর গোস্ত বণ্টনেও অনেকে কার্পণ্যতার পরিচয় দিতে দ্বিধা করেন না। গরিবদের হাত ডিঙ্গিয়ে চলে যায় রক্ষিত ফ্রিজে। এগুলোর নামই কি কোরবানি? কোরবানি মূল তাৎপর্য থেকে অনেকদূর পিছিয়ে আছে সমাজ। কোরবানি হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার সমগ্র ইবাদত কোরবানি, আমার জীবন, আমার মরণ সবই বিশ্বের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য নিবেদিত।’ (সূরা-আনআম-১৬২)

 

 

 

 

 

কোরআনের এ আয়াতে কোরবানি একমাত্র আল্লাহর জন্য হবে বলে নির্দেশ দেওয়া হয়। এখানে বলা হয়, আমার জীবন যৌবন, আমার সম্পদ, আমার আহার, আমার ঘুম সবই হবে আল্লাহর জন্য। আর সবই যখন হবে আল্লাহর জন্য সমাজে থাকবে না হিংসা, বিদ্বেষ, প্রতিহিংসার আগুন। কারও মঙ্গলে কারও মন হিংসুটে হয়ে উঠবে না। মনের নোংরামি ভেসে যাবে আত্মশুদ্ধির ডানায়। সমাজ হয়ে উঠবে পাপ-পঙ্কিলমুক্ত। বইবে শান্তির ফল্গুনধারা।

 

 

 

 

 

 

পরিশেষে, মানবজীবনে সব জিনিসের চেয়ে আল্লাহর নির্দেশকে সর্বাগ্রে স্থান দেওয়ার শিক্ষা রয়েছে কোরবানিতে। অল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জীবনের প্রিয়তম বস্তুকে হারাতে হলেও তা থেকে পিছিয়ে যাওয়া যাবে না। এ মহান আত্মত্যাগের উদ্দেশ্য সামনে রেখেই মুসলিম উম্মাহর মাঝে কোরবানির প্রচলন হয়। কাম-ক্রোধ, লোভ-লালসা প্রভৃতি খোদাপ্রেম-বিরোধী রিপুগুলোকে আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ ও দমন করার শিক্ষা রয়েছে এ কোরবানিতে। প্রতিবছর ঈদুল আজহা মুসলিম জাহানে এসে মুসলমান জাতির ঈমানি দুর্বলতা, চারিত্রিক কলুষতা দূর করে ত্যাগের উজ্জ্বল মহিমায় তাদের ঈমানি শক্তিকে বলীয়ান, নিখুঁত ও মজবুত করে।

 

 

 

 

 

মুসলমানরা এ কোরবানির মাধ্যমে সমাজে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার দীক্ষা নেন, সমাজের বুক থেকে অসত্য, অন্যায়, দুর্নীতি ও অশান্তি দূর করার জন্য নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দেওয়ার প্রেরণা লাভ করেন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়, ‘কোরবানি হত্যা নয়, সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন।’ সুতরাং, মানুষের মনের মধ্যে যে পশুশক্তি সুপ্ত বা জাগ্রত অবস্থায় বিরাজমান, তা অবশ্যই কোরবান করতে হবে। কেননা, কোরবানির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করা, পশু কোরবানি হচ্ছে আত্মকোরবানির প্রতীক। তাই কোরবানি করার ক্ষমতাসম্পন্ন প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর একমাত্র আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে ঈদুল আজহায় কোরবানি নিখুঁতভাবে আদায় করতে যতœবান হওয়া উচিত।

Translate »