ফজলুল বারী:   দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়ার জেলবাস নিয়ে এখনো তোলপাড় দেশের রাজনীতি। শাসকদল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, খালেদা জিয়ার দন্ড দুর্নীতিপ্রবণ রাজনীতিকদের জন্যে একটি সতর্ক সংকেত। আর এই ওবায়দুল কাদেরই কক্সবাজারে গিয়ে বলেছেন, ‘সেখানে নাকি বদির বিকল্প নেই!’

 

 

 

 

 

আগামী নির্বাচনে বদির জন্যে নৌকা মার্কায় ভোট চেয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক! কে এই বদি? দেশজুড়ে তার নাম ইয়াবা বদি। মাদক ইয়াবা ব্যবসা দেশজুড়ে মরণ ছোবল দিয়েছে। আর ইয়াবা ব্যবসার নাম আসলেই নাম আসে বদির। আর এদিকে ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আওয়ামী লীগে বদির বিকল্প নেই!

 

 

 

 

 

 

 

দেশের রাজনীতিতে ওবায়দুল কাদেরদের প্রসঙ্গ টানতে গেলে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথের একটি স্মরণীয় উক্তি মনে পড়ে যায়। দামি একটা কথা বলেছেন রাজনাথ। তা হলো-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের কম কথা বলা উচিত। বাংলাদেশে এর উল্টো চিত্র! স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা এখানে বেশি কথার জন্যে বিরক্তিকর একেকটি চরিত্র।

 

 

 

 

 

সাগর-রুনি হত্যাকান্ডের পর তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন ৪৮ ঘন্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেপ্তারের কথা বলেছিলেন। এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বদল হয়েছে দু’দফা। কিন্তু সেই ৪৮ ঘন্টার আর শেষ নেই!

 

 

 

 

 

 

রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর পিলার ধরে ধাক্কার আজগুবি মন্তব্যের জের ধরে তাকে এক পর্যায়ে ধাক্কা মেরে মন্ত্রিসভা থেকে বেরই করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।তা বলাইসার! ইংরেজি নববর্ষের রাত ১২ টা ১ মিনিটের প্রোগ্রাম সন্ধ্যার মধ্যে শেষ করার ফরমান জারি করেছিলেন এই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী!

 

 

 

 

 

অথচ তার ছেলে ও ছেলের বউ মধ্যরাতে বর্ষবরণের ছবি ফেসবুকে এসেছে। বিএনপির আমলের ‘আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়া গেছে’, ‘লুকিং ফর শত্রুজের’ আলতাফ হোসেন চৌধুরী, লুৎফুজ্জামান বাবরের সঙ্গে এদের পার্থক্য কোথায়?

 

 

 

 

 

শুধু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নয়, অতিকথন, অপ্রয়োজনীয় কথনের রোগটি সরকারের অনেক মন্ত্রীর মধ্যে আছে। তাদের একজন ওবায়দুল কাদের। দলের সাধারণ সম্পাদক হিসাবে তিনি দলের মুখপাত্র, কথা বলবেন, এটা ঠিক আছে।

 

 

 

 

 

কিন্তু তার প্রতিদিনের কথামালার যোগফল কি দাঁড়ায়? আওয়ামী লীগে জিল্লুর রহমান, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, উনারাও তো সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, তাই না? তাদের কথাবার্তায় রাজনৈতিক প্রজ্ঞার কী ঘাটতি ছিলো?

 

 

 

 

 

 

এই ওবায়দুল কাদেরই তো কিছুদিন আগে বলেছিলেন, বিতর্কিত ব্যক্তিদের আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দেবেন না। ইয়াবা বদি কী একটি বিতর্কিত চরিত্র নয়? হঠাৎ কিসের গুণপ তার মনে হয়েছে ইয়াবা বদি আওয়ামী লীগের জন্যে খুব অপরিহার্য? তার ঘনঘন কক্সবাজার সফর, দলবলসহ বিশেষ বিশেষ হোটেল-রিসোর্টে খানাপিনার খরচ কারা যোগায়? ওই এলাকায় জমি সংক্রান্ত বিশেষ কিছু কানাঘুষা কেনো ছড়াচ্ছে?

 

 

 

 

 

একটা দলের পক্ষে আগামী নির্বাচনে কে মনোনয়ন পাবে, আর কে পাবে না এটা ঠিক করার জন্যে মনোনয়ন বোর্ড আছে। সাধারণ সম্পাদক হিসাবে ওবায়দুল কাদের ওই বোর্ডের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।

 

 

 

 

 

কিন্তু মনোনয়ন বোর্ডের বালাই ছাড়াই যদি একা একা তিনি দেশজুড়ে বিতর্কিত একটি চরিত্রকে যদি মনোনয়ন দিয়ে ফেলেন তাহলে ওই মনোনয়নন বোর্ডের কাজ কী?

 

 

 

 

 

 

ওবায়দুল কাদের এমন এক দিনে বিতর্কিত বদিকে মনোনয়ন দিয়ে ফেলেছেন, যেদিন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা প্রকাশ করা হবে। এটা আরেক অতিকথন।

 

 

 

 

 

 

মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়, আইন মন্ত্রনালয় নয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের পুরনো তালিকায় তার নাম আছে। তার অর্থবিত্ত নিয়ে দুদকের মামলায় বদি জেলও খেটেছেন।

 

 

 

 

 

বদি জেলে থাকা অবস্থায় ওই এলাকার ইয়াবা ব্যবসায়ীদের মধ্যে তটস্থ একটি ভাব ছিল। এখন আপনারা মাদক ব্যবসায়ীদের নতুন তালিকা করবেন, সেখানে বদির নাম না থাকলে কি তা হাস্য কৌতুকের সৃষ্টি করবে না? যেখানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বদিকে মনোনয়ন দিয়ে ফেলেছেন, সেখানে বদির নাম থাকবে মাদক ব্যবসায়ীদের নতুন তালিকায় এটা কী এখন আর কেউ বিশ্বাস করবে?

 

 

 

 

 

 

অথচ ইয়াবা সম্রাট নামে পরিচিত ক্ষমতাসীন দলের সাংসদ কক্সবাজার-৪ আসনের আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদির নাম বারবার সামনে আসছে।

 

 

 

 

গত এক দশক ধরে বদিকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে সরকারি সকল সংস্থার ইয়াবা ব্যবসায়ীদের তালিকা। সরকারি সকল সংস্থাও গোয়েন্দা প্রতিবেদন দিয়েছে এমপি বদির বিরুদ্ধে!

 

 

 

 

 

২০১৪ সালে সরকারি এক তালিকায় বদির নাম উঠে আসে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের করা ইয়াবা ব্যবসায়ীদের ওই তালিকায় বলা হয়েছে,আব্দুর রহমান বদির ছত্রছায়ায় আরো অনেকে ইয়াবা ব্যবসা করছেন।

 

 

 

 

 

 

এদিকে মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগ থাকার পরও এমপি বদির বিরুদ্ধে কােন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না- এই প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল সাংবাদিকদের বলেছেন, সংসদ সদস্য বদির বিরুদ্ধে অভিযোগ আমাদের কাছে আছে।

 

 

 

 

 

আমরা সেই অভিযোগগুলো সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিচ্ছি। বদিসহ অন্য মাদক ব্যবসায়ীদের বিষয়ে আপনাদের কাছেও কোনও তথ্য থাকলে আমাদের দিন। বদির বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, তথ্য-প্রমাণ নাই।

 

 

 

 

 

আসলে দায়িত্বশীলরা দেশটাকে দিনে দিনে এমন হাসি-তামাশার বানিয়ে ফেলছেন! দেশের মানুষ দায়িত্বশীল মন্ত্রীদের কথায়-আচরণে প্রাজ্ঞবান দেখতে চায়। চালের দাম কমাতে না পেরে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, তিনি মনে করেন মোটা চালের কেজি চল্লিশ টাকার কম হওয়া উচিত নয়!

 

 

 

 

২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে দশ টাকা কেজি চাল খাওয়াবার কথা বলা হয়েছে, এটা নিয়ে কম বিতর্ক হয়নি। এখন বলছেন চল্লিশ টাকার কম হওয়া উচিত নয়! এখন ভাবছেন কৃষকের কথা, তখন ভেবেছেন ভোটারের কথা! এই চল্লিশ টাকা কেজি চাল, পিয়াজের দাম এসব কি আগামী নির্বাচনের ইস্যু হবে না?

 

 

 

 

 

 

দুর্নীতির দায়ে খালেদার দন্ড নিয়ে খুশি খুশি মন নিয়ে বলছেন, আওয়ামী লীগের দরকার বিতর্কিত বদিদের! দুঃখিত ওবায়দুল কাদের সাহেব।

 

 

 

 

 

লেখক: ফজলুল বারী, পরিব্রাজক সাংবাদিক, বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী।