রুমানা রশীদ রুমি:     সেদিন আমার ছেলের বাবা ফেসবুকে খুব মন দিয়ে তার এক কলেজ জীবনের বান্ধবীর ছবি দেখছিলেন ।এতটা তন্ময় হয়ে যে আমি পাশে বসে কত কি বললাম সে যেন অন্যমনস্ক ।কৌতুহলের বশে উঁকি দিলাম তার মোবাইলে ।

 

 

 

 

দেখি যাকে তিনি দেখছেন তিনি যথেষ্ট শালীন পোশাকের রীতিমতন পর্দা করা মানে মাথায় হিজাব পরে তার বাচ্চাদের সাথে ছবি তুলে নিজের ফেসবুক এ্যাকাউন্টে আপলোড দিয়েছেন ।

 

 

 

 

তবুও কর্তা যেহেতু সেদিকে মগ্ন তাই মজা করে ফতোয়া শুরু করলাম –জানো তো পর্দা কিন্ত শুধু নারীর গায়ে না ।পুরুষের চোখেও ।বলা হয়েছে একবার চোখ পড়ে গেলে চোখ ফিরিয়ে নিতে ।

 

 

 

 

 

আর আধুনিক ব্যাখা হলো যেহেতু তিনি পর্দা করে আছেন আর তুমি তার পরও দেখেই যাচ্ছ এক্ষেত্রে তোমার পাপ হচ্ছে ।সুতরাং চোখ ফেরাও আমার কথা শোন ।

 

 

 

 

একান্ত নিজের ব্যক্তিগত কথাগুলো বলে লেখাটা শুরুর পেছনে কারণ মানুষ অন্যের ব্যক্তিগত বিষয় জানতে পছন্দ করে। সে দায় এড়াতে অন্যের কথা না বলে তাই নিজেদের কথাগুলো বলেই একটা বিষয় তুলে ধরতে চাই ।

 

 

 

 

৩মে ২০১৮এ ভারতীয় নায়িকা প্রিয়াঙ্কা চোপড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইন্সটাগ্রামে একটি ছবি পোস্ট করেন ।তাতে তার পরনে পোশাক ব্লেজার বুকের ওপর স্টাইল করে কাটা ।সে ছবি দেখে অনেকেই তার দিকে নেতিবাচক মন্তব্য ছুঁড়ে দেন ।

 

 

 

 

ছোট পোশাকে নরেন্দ্র মোদীর সাথে সাক্ষাৎ,কিংবা নিউইয়র্ক টেলিভিশনে সাক্ষাৎকারেও তার এ ছোট পোশাক বলে দেয় সে তার আগের মন্তব্যে অনড় ‘শরীর আমার পছন্দ আমার’ ।

 

 

 

 

এই প্রিয়াঙ্কা যখন ইউনেসকোর শুভেচ্ছা দূত হয়ে রোহিঙ্গাদের শিবিরে এসে’ একজন উদ্বাস্তু শিশুর দায়িত্ব সমস্ত বিশ্বের’ বলে সারা বিশ্বের কাছে আহ্বান জানান তখন কি প্রিয়াংকার ‘শরীর আমার পছন্দ আমার’ মন্তব্য নিয়ে মাতামাতি সাজে? নাকি তার এই মানবতাবাদী আহ্বান নিয়ে কাজকে বেশী মূল্য দেয়া সাজে ?

 

 

 

বাস্তবটা হলো নারী উন্নয়নে নারী পর্দা ইস্যু অফ টপিক এবং আত্নঘাতী ।বরং এ আলোচনা নারীকে উন্নয়নের সাথে যুক্ত হতে বাধার দেয়ার একটা ইস্যু মাত্র ।

 

 

 

কেউ উগ্র পোশাক পরলো কিংবা হিজাব পরলো কোনটিই কিন্ত আলোচনার বিষয়বস্ত নয় ।কারন এটা যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার ।কেউ পর্দা করে ফ্যাশন করেন কেউ আবার ছোট পোশাকে ফ্যাশনে সাচ্ছন্দ্যবোধ করেন ।কিন্ত যা শালীনতার বাইরে হোক তা পর্দা বা অন্য কিছু তা কিন্ত কারো ভালো লাগে না ।

 

 

 

 

যা অন্যকে বিব্রত করে এমন কিছু করার দরকারটাই বা কি । হিজাব করে পর্দায় নিজেকে মোড়ালেও মেকাপ দিয়ে আকর্ষনীয় করে তোলার মধ্যে আদৌ পর্দার লক্ষ্য পূরণ হয় না ।আবার ধর্মীয় অনুষ্ঠানে স্লিবলেস ড্রেস পরে কেয়ার না করাটাও সমীচীন নয় ।সব জায়গারই ড্রেস কোড থাকে ।

 

 

 

 

 

বিয়ে বাড়ির গেট আপ নিয়ে নিশ্চয়ই হাসপাতালে রোগী দেখা যায় না? আমাদের মায়েরা শিখিয়েছেন মসজিদের পাশ দিয়ে মুসুল্লিরা বের হবার সময় মাথায় কাপড়টা তুলে দিতে ।কিংবা আজান দেয়া শুরু হলে বা কোন কারনে রোজা না রাখলেও ইফতারের টেবিলে বসলে মাথায় কাপড়টা তুলে দিতে ।

 

 

 

 

এটা একটা ভদ্রতা ।মানে যিনি নিজেকে একটু ধর্মীয় অনুভূতি দিয়ে আগলে রাখছেন তার প্রতি সম্মান দেখানো ।দিনে দিনে স্মার্ট হতে গিয়ে এতটুকু ভদ্রতাবোধ নষ্ট হয়ে যাওয়া সুখকর হবে না । আবার যিনি হয়ত এতদিনে ধর্মীয় চেতনায় নিজেকে সঁপেছেন তিনি এমনই ফতোয়া দেয়া শুরু করলেন যেন বোঝাতে চান যে বা যারা পর্দা করলেন না তিনি যেন সমাজের নোংরা কীট ।

 

 

 

 

আদতে কোনটিই কাম্য হতে পারেনা ।কেননা ধর্মীয় চেতনা মানুষ লালন করবে অন্তরে ।তার নিজের কাজে সে সংযম পালনের মধ্য দিয়ে পালন করবে ।অন্যকে আহত করে নয় ।

 

 

 

 

আজকের কর্পোরেট নারীদের আগেই খোলামেলাভাবে আসতে প্রলুব্ধ করা হয়েছে ।কিন্ত নারীর কাজের জায়গাটাকে প্রাধান্য দেয়া কিন্ত এতে ধুলো জমে ।বিশেষ করে পিছিয়ে পড়া বাংলাদেশের মত দেশের ক্ষেত্রে ।এমন একটা সময় ছিল যখন এদেশের নারীরা বাড়ি থেকে যে গাড়িটি করে বের হতেন তা কাপড়ে মোড়ানো থাকত ।

 

 

 

 

সে জায়গা থেকে নারীদের আস্তে আস্ত বের করে আনা হয়েছে যেখানে নারীর মেধা,মনন.নারীর কাজের দক্ষতা আর ক্ষমতাকে প্রমান করা মূল লক্ষ্য ছিল ।নারী করেছেও তাই ।কিন্ত নারী উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা কিন্ত এখনোপূরণ হয়নি ।এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া ।সেখানে নারীকে তার কাজ দিয়েই তাকে প্রমান করতে হবে ।

 

 

 

 

 

শারিরীক প্রদর্শনে নয় ।অথচ আলোচনা যদি এখনো পর্দা বা খোলামেলা পোষাকে পড়ে থাকে তবে কিভাবে নারীর কাজকে মূল্য দেও্য়া হবে ? বাস্তবে কাজের জায়গায় পুরুষেরও ভূল হয় ।কিন্ত নারীর ভূলের খৈসারত দিতে কৈফিয়ত খালি শরীর প্রসঙ্গ ।

 

 

 

 

যেখানে সে প্রতিনিয়ত তার জ্ঞান,মেধা নিয়ে বা জানার সীমাবদ্ধতা নিয়ে চ্যালেন্জের মুখে পড়ে তখন তার শারিরীক গড়ন এখন আর আলোচনাই থাকা উচিত নয় ।ধর্ষনকে যেন নারী শারিরীক শক্তি দিয়ে প্রতিহত করতে পারে তখন জোরালো ভাবে দরকার তার আত্নরক্ষামূলক প্রশিক্ষন ।কোন পুরুষের সহযোগী মনোভাব নয় ।

 

 

 

 

মূলত কাজ করে পুরুষের জায়গাটা দখল করাটা পুরুষ সহজে মেনে নেয় না ।তাই পুরুষতন্ত্রকে ভাঙ্গতে এই পর্দার মতন অফ টপিকে কথা বাড়িয়ে বোকামি করার পক্ষপাতি নই আমি ।বরং যদি আমার মাথায় কাপড় পুরুষকে বাম হাত ঠেলে না দিতে দেয় বা আমার কাজকে সহজে সমাধান করতে সাহায্য করে তবে তাই ভালো ।তবু কাজটিই নারীর প্রাধান্য পাওয়া উচিত ।পুরুষের নারীর শরীর নিয়ে গসিব যেন নিজের মধ্যেই থেমে যায় ।

 

 

 

 

রোজার মাসে হঠাৎ কেন টিভি পর্দায় সংবাদ পাঠিকারা মাথায় কাপড় তোলেন তা নিয়েও সমালোচনা করেন তারা । দিক না মাথায় কাপড় ক্ষতি কি ? গনমাধ্যম তো সবার । সেখানে কাউকে তার অনুভূতিতে সম্মান দেখানো খারাপ কিছু তো নয় । দেশৈর প্রধানমন্ত্রী নারী ।তিনি শালীন পোশাকে কত প্রকাশ্য জনপথ মাড়িয়ে উন্নয়ন করে চলেছেন ।তবে শালীন পোশাকে ক্ষতি কি? কাজটিই তো বড় ।পোশাক কি অফ টপিক নয়?

 

 

 

আসলে কথা ওঠে তখনই যখন কোন মেয়ে বা নারী খোলামেলাভাবে প্রকাশ্যে চলাকে তা লেবু কচলানোর মত তেতো করা হয় ।অথচ পাশাপাশি তখন কেন আমাদের দৃষ্টি সংযত হবার কথাটাও পর্দা শিক্ষার সাথে আসে না । বুঝি না কেন তখন সে দৃষ্টিতে সম্মান থাকে না ?নারীর শরীরের প্রতি পুরুষের কামুক দৃষ্টি বায়োলোজিকাল বিষয় হলেও নিয়ন্ত্রণ যোগ্য ।

 

 

 

 

কিন্ত পাশ থেকে টিজ করা, ধর্ষন করা,এসিড নিক্ষেপ, হত্যা ,অপহরণ বা গুম করার প্রবণতা তখনই আসে যখন প্রতিপক্ষ নিজের সংযম নষ্ট করে ।সে পারভাটেড হয় ।আমার নিজের মতন একটা ব্যাখ্যা আছে ।ধর্মকে সব বিষয়ে জড়ানোও ঠিক নয় ।পারভাশন থেকে নিয়ন্ত্রিত থাকতে সংযত থাকা গুরুত্বপূর্ন ।

 

 

 

 

 

যেটা নৈতিক শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ।যা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আর কর্মক্ষেত্রে এখন ট্রেনিং করে মেশানো হয় ।সহকর্মীকে বা সহপাঠীকে কতটুকু কথা শঅলীনতাকে অতিক্রম করে না তা নিয়ে ইতিমধ্যে কাজ হচ্ছে ।তাই যারা নিন্দুকেরা তারা যা বলুক বরং নিজেকে কাজে প্রমান দেয়াই নারীর উন্নয়নের সহায়ক ।

 

 

 

 

 

 

 

কারো বাড়তী কথা শুনে কাজে মনোযোগহানি ঘটানোর মতন সময় কিন্ত নারীর এখন নাই ।বরং ভালো নিজের মতন নিজেকে শালীনতার আবেশে রাখা ।নিজেকে বিব্রত পরিস্থিতির মধ্য না ফেলতে এটুকু ক্ষতি কি ।কোমরে কাপড় গুজে ঝগড়া করার মত ব্যক্তিত্বহীনতাও উন্নয়নে ধাবমান নারীর জন্য এখন আর শোভনীয় নয় ।এগুলো যোগ্যতাহীন পুরুষেরা করে মরুক ।