প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:     রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন (রাসিক) নির্বাচনের আর ১৬ দিন বাকি। আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা শুরু হয়েছে ৪দিন হলো। কিন্তু এরই মধ্যে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ভোটের মাঠ। প্রচারণার শুরুতেই স্নায়ুচাপে পড়েছেন বড় দুই দলের মেয়র প্রার্থী।

তাঁদের অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগে বাড়ছে উত্তেজনার পারদ। সময় যত গড়াচ্ছে রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মাঠে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। এরই মধ্যে কোথাও কোথাও মারধরের ঘটনাও ঘটেছে।

প্রধান দুই মেয়র প্রার্থী আওয়ামী লীগের এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন ও বিএনপির মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের কর্মীদের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগ উঠেছে।

এসব অভিযোগ তদন্ত করছে নির্বাচন কমিশন। তবে এখনও এ নিয়ে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেননি রিটার্নিং কর্মকর্তা। ফলে উদ্বেগ বাড়ছে নগরবাসীর।

রিটার্নিং কর্মকর্তার দফতর জানিয়েছে, এই তিন দিনে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের কর্মীদের বিরুদ্ধে পাঁচটি লিখিত অভিযোগ দেয়া হয়েছে। এর চারটি অভিযোগ দেয়া হয়েছে বৃহস্পতিবার।

এসব অভিযোগ দিয়েছেন নৌকা প্রতীকের প্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। তিনি নারী প্রচার কর্মী এবং সংখ্যালঘু ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানো, অপপ্রচার, টাঙানো পোস্টার কেটে ফেলা এবং ভোটারদের প্রলোভন দেয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগ আনেন। বুধবার বিকেলেও নৌকা প্রতীকের পক্ষে আরেকটি অভিযোগ দেয় হয়।

অন্যদিকে এ দুই দিনে দুটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ধানের শীষ প্রতীকের প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট অ্যাডভোকেট তোফাজ্জল হোসেন তপু। এর বাইরে কোনো প্রার্থীর অভিযোগ নেই।

লিখিত অভিযোগে জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট তোফাজ্জল হোসেন তপু বলেন, বিএনপি নেতাকর্মীদের গ্রেফতার এবং মিথ্যা মামলায় হয়রানি করছে পুলিশ।

এছাড়া আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের সন্ত্রাসীদের সঙ্গে নিয়ে পুলিশ নেতাকর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিএনপির পক্ষে ভোট না করার হুমকি দিচ্ছে। এটি সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থীকে জেতাতে নগরীর কাশিয়াডাঙ্গা থানা এবং ডিবির ওসি অতি উৎসাহী ভূমিকা পালন করছেন। এই দুই ওসির প্রত্যাহার দাবি করেন তিনি।

একই সঙ্গে নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সম্প্রতি এই দুই থানায় দায়ের করা দুটি মামলা বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেন। এছাড়া দুটি অভিযোগেই ধানের শীষ প্রতীকের পোস্টার-ব্যানার টাঙাতে বাধা, প্রচার কর্মীদের ওপর হামলা, মারধর এবং প্রচার সামগ্রী ভাঙচুরের অভিযোগ করেন এই
বিএনপি নেতা।

এসব অভিযোগ লিখিত আকারে রিটার্নিং অফিসারকে জানানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত সাতটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছেন তারা। এর মধ্যে দুটি ধানের শীষ প্রতীকের। বাকি পাঁচটি অভিযোগ নৌকা প্রতীকের।

একে অন্যের বিরুদ্ধে নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগ করেছেন দুই প্রার্থী ও তাদের লোকজন। এর বাইরে আর কোনো প্রার্থীর অভিযোগ নেই। তারা বলছে নির্বাচনের পরিবেশ স্বাভাবিক।

আর নির্বাচনী আরচণবিধি সম্পর্কে তদন্ত চলছে। ’  নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন হচ্ছে কি-না তা দেখভালে মাঠে রয়েছে ১০ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ১০টি দল। বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। এখন পর্যন্ত নির্বাচনের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রয়েছে।

গত মঙ্গলবার থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর পরে গতকাল বৃহস্পতিবার প্রথম সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপি অভিযোগের ফিরিস্তি তুলে ধরে। বিএনপির অভিযোগ, আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থীর লোকজন তাদের ,কর্মীদের পেটাচ্ছে।

ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টার ছিঁড়ে ফেলছে। পুলিশ বাড়ি বাড়ি গিয়ে সাধারণ নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার ও হয়রানি করছে। সংবাদ সম্মেলন থেকে নগরের কাশিয়াডাঙ্গা থানার ওসি এবং মহানগর ডিবির ওসির প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের অভিযোগ, নৌকার মেয়র প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের ধানের শীষে ভোট দিতে বিএনপির মেয়র প্রার্থীর লোকজন নানাভাবে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। সেই সঙ্গে  খ্যালঘুদের ধানের শীষে ভোট না দিলে দেশছাড়া করার হুমকি দেওয়া হয়েছে।

গত বুধবার বিকেলে রিটার্নিং অফিসারের কাছে আওয়ামী লীগের পাঠানো লিখিত অভিযোগ থেকে জানা যায়, বিএনপির মেয়র প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকরা আওয়ামী লীগের প্রার্থীর নামে অপপ্রচার ও সংখ্যালঘু ভোটারদের নানাভাবে হুমকি দিচ্ছে।

গত বুধবার সকালে নগরের পঞ্চবটি নদীতীরবর্তী এলাকায় বিএনপির কিছু কর্মী-সমর্থক ভোটারদের মধ্যে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা শুরু করে। তারা ভোটারদের বলে, ‘আপনারা লিটনকে নির্বাচিত করলে তিনি আপনাদের এখান থেকে উচ্ছেদ করে দেবেন। ’ ওই সময় সংখ্যালঘু ভোটারদের বলা হয়, ‘ধানের শীষে ভোট না দিলে তোমাদের মেরে দেশছাড়া করব। ’

এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার রাজশাহীর আরডিএ মার্কেট এলাকায়গণসংযোগ করেন আওয়ামী লীগের  প্রার্থী এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন। এ সময় তিনি নৌকার বিজয় সুনিশ্চিত উল্লেখ করে বলেন, ‘বিএনপির অভ্যাস অভিযোগ করা। তারা এখন নালিশি দলে পরিণত হয়েছে।

তাই রাসিক নির্বাচন ঘিরেও তারা নানা অভিযোগ করে যাচ্ছে। তারাই নানাভাবে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করছে।‘বিএনপির প্রার্থীর লোকজনই বিভিন্ন স্থানে আমার ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলছে। তারা আমার সমর্থকদের, এমনকি সংখ্যালঘুদেরও নানাভাবে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। ’

এদিকে বৃহস্পতিবার দুপুরে দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে মেয়র প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল বলেন, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য প্রশাসন এবং নির্বাচন কমিশনের সদিচ্ছা ও নিরপেক্ষতা প্রয়োজন।

এটি না থাকায় এখানে লেভেল প্লেইং ফিল্ড তৈরি হয়নি। প্রচার-প্রচারণাসহ নির্বাচনী সকল কর্মকাণ্ডে শুরু থেকেই হয়রানির শিকার হচ্ছি। নৌকা প্রতীকের নেতাকর্মীরা পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন।

পাশাপাশি আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করে সেগুলোর তদন্ত করে নির্বাচন কমিশনকে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বুলবুল বলেন, ১০ জুলাই বেলা ১১টার পর প্রতীক বরাদ্দ হয়েছে। কিন্তু ৯ জুলাই রাত থেকেই পুরো নগরী নৌকা প্রতীকের প্রচারপত্রে ছেয়ে গেছে। এমনভাবে ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুন টাঙানো হয়েছে যাতে অন্য প্রতীকের প্রচারপত্র টাঙানোর সুযোগ নেই।

নৌকা প্রতীকের প্রচারপত্রে ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বুলবুল। বলেন, এ দুই দিনে অন্তত চার কোটি টাকার প্রচারপত্র ছড়ানো হয়েছে। এ অর্থের উৎস জানতে চান বুলবুল।

তবে নগরীতে পোস্টার ব্যানার পোস্টার ও ফেস্টুন টাঙানোর মত অনেক জায়গা রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন নৌকা প্রতীকের মেয়র প্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। তিনি বলেন, নেতাকর্মীদের উৎসাহ দিতে না পারা, উজ্জীবিত করতে না পারা বিএনপির ব্যর্থতা। এ কারণেই প্রচারণায় ঠিকমত নামতে পারেনি বিএনপি। এখানে আমাদের কোনো দায় নেই।

লিটন পাল্টা অভিযোগ করেন, গত পাঁচ বছর নগরীর কোনো উন্নয়ন হয়নি। সেই কারণে নিশ্চিত পরাজয় বুঝতে পেরে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ও তার কর্মী-সমর্থকরা অপপ্রচারের লিপ্ত হয়েছে।

আওয়ামী লীগের অভিযোগের প্রসঙ্গে বিএনপির মেয়র প্রার্থী বুলবুল বলেন, ‘কারা সংখ্যালঘুদের জমি জোর করে দখল করেছে, কাদের অত্যাচারে সংখ্যালঘুরা রাজশাহী ছেড়ে ভারত চলে গেছে, তা রাজশাহীবাসী জানে। আগামী ৩০ জুলাই রাজশাহীবাসী সেই জবাব দিতে প্রস্তুত।

বুলবুল অভিযোগ করে আরো বলেন, বুধবার বিএনপির এক কর্মীকে মারধর করে যুবলীগের কর্মীরা পুলিশের কাছে দিয়েছে। পরে পুলিশ ওই কর্মীর নামে বোমা বিস্ফোরণের মামলা দিয়েছে। কিন্তু রাজশাহী শহরের কোথায় বোমা বিস্ফোরণ হয়েছে, তা পুলিশকেই জবাব দিতে হবে। ’

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা মিজানুর রহমান মিনু বলেন, ‘ইসির প্রধান কমিশনার সরকারের আজ্ঞাবহ। তাঁকে দিয়ে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। ’

পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে ‘পুলিশ কাউকে হয়রানি করছে না। যাদের নামে মামলা আছে, শুধু তাদেরই ধরা হচ্ছে।