প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:       বাংলাদেশে পারিবারিক ট্র্যাজেডি কোন জায়গায় গেছে, তা বিমানবন্দর সড়কে মেয়ের নিহত হওয়ার জায়গায় বসে মিমের বাবার কান্না করা থেকে বোঝা যায়। রাস্তা ছাড়া সান্ত্বনা নেই কোথাও, তাই রাস্তাতেই নেমেছে নিহত মিম আর রাজীবের সহপাঠিরা।

 

 

 

 

 

কাঁদছে সবাই, রাগছে সবাই। তথাকথিত মাদকবিরোধী বন্দুকযুদ্ধে নিহত কমিশনার একরামুলের কান্না শুনে তাঁর মেয়ের আত্মা কেঁপে গিয়েছিল। একটু পরেই এতিম হবে যে মেয়ে, সে বলেছিল, ‘বাবা, কান্না করতেছ যে!’ মিমের বাবা জাহাঙ্গীরের কান্না শুনে মৃত্যুর ওপার থেকে কি মিমও বলছে, ‘বাবা, কান্না করতেছ যে!’

 

 

 

 

 

 

পরিবারগুলো পিতা হারাচ্ছে, সন্তান হারাচ্ছে। জীবন আর জিয়োচ্ছে না এই দেশে। সার‍ল্য মার খাচ্ছে। নাগরিকের আত্মবিশ্বাস টলে যাচ্ছে। সন্তান নিয়ে আমরা ভয়ে আছি। এই ভয় রাখার কোনো জায়গা পাচ্ছি না।

 

 

 

 

 

আমাদের বুকে কাটা কলিজার শোক, সেখানে নুন-ঝাল মাখানো হায়েনার হাসি হাসছে নির্দয় ক্ষমতার মালিকেরা। এই মৃত্যুর মেগাসিরিয়াল আর কতদিন চলবে? এই কি আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি?

 

 

 

 

 

গত মাসেই ধনী এমপির দুলাল রাস্তার রাজা হতে গিয়ে পিষে মারল এক আম আদমিকে। কী হয়েছে? কিচ্ছু হয়নি। ক্ষমতাধরেরা এখন জীবন-মৃত্যুর ম্যানেজার হয়ে বসেছে।

 

 

 

 

 

তাদের হাতে বিশাল এক টালিখাতা। সেখানে ধর্ষণের টালিতে অনেক নাম, হত্যার টালিতে অনেক সংখ্যা, নির্যাতনের টালির সংখ্যা বেশুমার। আমাদের আশার সমাধি এই বাংলাদেশে আজ কবরের শান্তি বিরাজ করছে।

 

 

 

 

 

 

শহুরে মানুষ বড় একা। নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্ত বাবা-মায়েরা এখানে একটা সন্তানকে সুন্দরভাবে মানুষ করার জন্য জীবনের সব সুখ-আহ্লাদ বিসর্জন দেন। চরম অনিশ্চয়তার এই পৃথিবীতে সন্তান এনেছেন যাঁরা, তাঁরা ভয়ে থাকেন।

 

 

 

 

 

সন্তানকে যেহেতু এনেছেনই, তাকে একটা মানুষের মতো জীবন দিতে না পারার ভয় তাঁদের তাড়া করে। এত সাধনার সন্তানকে এভাবে স্বৈরাচারী বাস-ট্রাক পিষে ফেলবে?

 

 

 

 

 

দুদিন আগেই খাগড়াছড়িতে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে খুন করে ফেলা রাখা হয়েছিল যে ১১ বছর বয়সী এক শিশুকে, সে কি আমাদেরও সন্তান নয়? তারা কি মা-বাবাদের বলছে না, ‘আমাকে তুই আনলি কেন, ফিরিয়ে নে’!

 

 

 

 

 

 

এভাবে নিষ্পাপের নির্মম ধ্বংস দেখে যাওয়ার ফল কী? আমরা কি অসুস্থ হয়ে যাব? দেশ ছেড়ে পালাব? নাকি নির্বিকারভাবে মুরগির খোঁয়াড়ের বাসিন্দা হয়ে খুদকুঁড়ো খেতে থাকব, যতক্ষণ না শিয়ালদের হাত আমাদের কাউকে না কাউকে টেনে নেয়?

 

 

 

 

 

রাস্তায় আজও স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা নেমেছে। তাদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে সারল্যের জেদ। তাদেরও ভয় পাচ্ছে সরকার। তাদেরও লাঠি-পুলিশ দিয়ে দমন করতে হচ্ছে। মায়েরা-বাবারা নামলেও তা-ই করবে।

 

 

 

 

 

কিন্তু কোথায় আমাদের পেশাজীবী নেতারা, নাগরিক সংগঠনের নেতারা। তাঁরা দায়সারা। কেননা, সব সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ও সুশীল ফোরামের নেতৃত্ব হয় বশীভূত নয়তো বিতাড়িত।

 

 

 

 

 

সমাজে কোনো ক্ষোভের জোয়ার আসতে না পারে, তার জন্য সবখানে বলপ্রয়োগের ছিপি আটকানো। কিন্তু এতে কি রক্ষা হবে? বাঁধেও পানি অপসারণের জন্য কিছু সেফটি ভালভ বা নালা থাকে। সব ভালভ, সব নালা বন্ধ করলে তো বাঁধটাই হুমকির মুখে পড়বে, তাই না?

 

 

 

 

 

মিমের বাবাকে কেউ দেখতে আসেনি। না মন্ত্রী, না শ্রমিক ফেডারেশনের কোনো নেতা। তাঁর জবানিতে শুনুন, ‘মেয়ে মরা বাপ আমি। কী কষ্টে আছি, কেউ তো খবর নিল না।

 

 

 

 

আমাগো অভিভাবক মন্ত্রী শাহজাহান খান, তিনি নাকি আমার মেয়েসহ দুজন মরার কথা বলতে বলতে হাসতেছিলেন। এই কথা শুইনা আমার দুঃখে বুক ভাইঙ্গা আসছে…।

 

 

 

 

 

আমি আর বাস চালামু না। । যে বাস আমার মেয়েরে নিয়া গেল, সেই বাস আর ধরুম না আমি। আমি সারা জীবন বাস চালাইছি সেই ছোট থাইকা। কেউ আমার গাড়িতে অ্যাকসিডেন্ট হয় নাই। আমি তো কাউরে মারি নাই। তাইলে আমার মতো মানুষের মেয়ের কপাল এমন হইলো কেন?’

 

 

 

 

 

তাঁর কথার উত্তর সরকার দেবে। কিন্তু আমরা তাঁর স্বাভিমানকে সম্মান করেই বলতে চাই, চালক হিসেবে আপনি যখন কোনো দুর্ঘটনা ঘটাননি, কাউকে মারেননি কখনো, তখন আপনি কেন বাস চালাবেন না।

 

 

 

 

আপনার হাতেই যাত্রীরা বেশি নিরাপদ। আর চালক হিসেবে আপনি যেহেতু দায়িত্বশীল, আপনি যেহেতু চালকদের নেশা-গাফিলতি নিয়ে সচেতন, মালিকদের দায়িত্বহীনতারও শিকার আপনি, সেহেতু সড়কে কী করলে যাত্রীরা নিরাপদ থাকবে, নিরাপদ থাকবে চালক ও তাঁদের সন্তানেরাও, সেটা আপনিই ভালো জানেন। আপনি শুধু বাসই চালাবেন না, আপনি সড়ক পরিবহনব্যবস্থা চালানোরও যোগ্য। আপনাকেই আমাদের দরকার।

 

 

 

 

 

 

ঢাকায় যারা বাস চালান, তাঁদের ঠিকমতো গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণ নেই বলে মনে করেন জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, ‘খোঁজ নেন, এরা হেলপার। দুই দিন বাস চালাইয়া ড্রাইভার হইয়া গেছে। এরা মানুষ মারবো না তো কী?

 

 

 

 

 

এদের কোনো ঠিকানা নাই। আপনারা আসল জায়গায় হাত দেন। এই যে নিরাপদ সড়ক চান, কী লাভ। আমার মেয়েরে তো ফেরত পামু না। আপনারা উদ্যোগ নেন। আমি বাস চালানো শিখামু। প্রশিক্ষণ ছাড়া একজনেরও লাইসেন্স দিবেন না। আমি বিআরটিএকে সহায়তা করমু।’

 

 

 

 

 

 

আপনার সহায়তা সত্যিই বাংলাদেশের দরকার। কেন আপনি যোগাযোগমন্ত্রী হবেন না? যিনি আজ আমাদের যোগাযোগমন্ত্রী, তাঁর এ বিষয়ে আপনার চেয়ে কোন যোগ্যতা বেশি?

 

 

 

 

যাঁরা মনে করেন, উচ্চশিক্ষিত না হলে কিংবা ঘাগু রাজনীতিবিদ না হলে মন্ত্রী হওয়া যায় না, তাঁরা মন্ত্রিসভার দিকে তাকিয়ে দেখুন। কতজন উচ্চশিক্ষিত? সে শিক্ষাই বা কী কাজে লাগছে? আর সবচেয়ে শিক্ষিত মন্ত্রীরা কী জনসেবা করছেন?

 

 

 

 

 

বরং যে মানুষটা কায়েমি স্বার্থের অংশ নন এবং যিনি জীবনের কারণেই মাফিয়াদের স্বার্থে বিরুদ্ধে, নিজের স্বার্থেই তিনি ভাল করতে চাইবেন। ভুক্তভোগী মানুষেরাই সমস্যার সমাধানে বেশি আগ্রহ থাকবার কথা, কারণ কষ্টটা তাঁদেরও।

 

 

 

 

 

আজ যদি আমাদের মন্ত্রী-এমপিদের সন্তানেরা গণপরিবহনে চড়ত, জনগণের বিদ্যালয়ে পড়ত এবং চিকিৎসা নিত সরকারি হাসপাতালে, তাহলে চলাচল, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে আমরা আরো ভাল করতাম না? যে মন্ত্রী ভিআইপি সুযোগ পেয়ে রাস্তায় নামেন, তিনি মুরগির খাঁচার মতো বাসে বসে লক্ষ-কোটি মানুষের জ্যামে আটকে থাকার কষ্ট কীভাবে বুঝবেন?

 

 

 

 

 

 

যে এমপির পুত্রধন জনপথে বাহাদুরি করে মানুষ মারে, তিনি কীভাবে সন্তানহারা বাবার কষ্ট বুঝবেন? তাঁদের থেকে মিমের বাবার মতো মানুষ মন্ত্রী হওয়ার অনেক যোগ্য। এটা আবেগের কথা না।

 

 

 

 

 

 

 

যার ব্যথা সে-ই বোঝে, যার অভিজ্ঞতা আছে, সে-ই সমাধানের জন্য চেষ্টা করে। দেশ যাঁদের টাকা বানাবার কারখানা আর স্বপ্ন যাদের বিদেশমুখী; তাদের বদলে আমরা জাহাঙ্গীর আলমদের মতো দেশের মাটি কামড়ে থাকা পিঁপড়ার মতো মানুষের উত্থান চাই।

 

 

 

 

 

 

 

গ্রিক ইতিহাসবিদ হেরোডেটাস বলেছিলেন, শান্তির সময়ে সন্তান বাবাকে কবরে শুইয়ে দেয়, আর যুদ্ধের সময়ে বাবারা কবর দেয় সন্তানকে। জানতে চাই, কীসের যুদ্ধ চলছে দেশে? নিষ্পাপের নিধনের এই দেশ আমাদের নয়।

 

 

 

 

ফারুক ওয়াসিফ: লেখক ও সাংবাদিক।
সূত্র: প্রথম আলো