গৌতম কুমার রায়: ২২ কিংবা ৩১ শ্রাবণের অঝোড় কান্না আগস্ট ট্রাজিডিতে। ৬ আগস্ট শিলাইদহে গেলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে মনে পড়ে এক হারানো সুরে। একসময়ে যে কবির পদচারনায় ছন্দ ছড়িয়ে পড়তো সেই শিলাইদহে কবির প্রয়াণে আজ দু:খের সুর লহরী বেজে ওঠে।

 

 

 

 

শিলাইদহ আছে তবে নেই শুধু কবি। ১৯৪১ সালের ৬ আগস্ট হতে এই দিনে আজো পদ্মা নদীর ঘোলা জলের কলোরবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিয়োগ ব্যথার কান্না শোনা যায়। আবার ১৫ আগস্ট টুঙ্গিপাড়ায় গেলে মনে পরে বাঙালির রাজপুত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে।

 

 

 

 

 

 

তবে ইতিহাসের এই রাখাল রাজাকে এ দিনে দেখা মেলে শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের পক্ষে চির শায়িত স্তব্ধ আওয়াজে। এই টুঙ্গিপাড়ার মধুমতি নদীর জল বেয়ে চলেছে সব সময়।

 

 

 

 

 

মুজিবকে বঙ্গবন্ধু হতে যে রসদ যুগিয়েছিল তা এই টুঙ্গিপাড়ার মাটি থেকেই। কিন্তু জাতির পিতা এখানে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হতে শায়িত আছেন বিশ্বাস ঘাতকের বর্বরতার কলঙ্কিত স্মৃতি নিয়ে।

 

 

 

 

 

রবীন্দ্রনাথ এবং বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির মহা মুক্তির মহা প্রাণ হিসেবে নিজেদেরকে উজাড় করে দিয়েছেন। তারা মহা সংকটেও নিজেদের বিচক্ষণ চিন্তা দিয়ে জাতির পরে বিশ্বাস রেখে গেছেন। এক একজন আমাদেরকে জাগ্রত করেছেন বিশ্ব প্রকৃতিশালার সভ্য মঞ্চে।

 

 

 

রবীন্দ্রনাথ বাঙালিকে তুলে এনেছেন সাহিত্য সংস্কৃতির মন্ত্র দিয়ে, মঙ্গলালোকের গান বাজিয়ে, মহা মানবের আগমনী বার্তা ঘোষণার মাধ্যমে। বঙ্গবন্ধু আমাদেরকে জাগ্রত করেছেন স্বাধীকার থেকে স্বাধীনতা দিয়ে আবার অধীনতা থেকে অধিকার দিয়ে।

 

 

 

 

 

 

কবির শাশ্বত বাণি তার গানে, কবিতায়,উপন্যাসে,ছড়ায়,ছোট গল্পে, পত্রগুচ্ছে,নাটকে। আবার বঙ্গবন্ধুর শাশ্বত বাণি ‘‘রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেবো। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম,—জয় বাংলা।”

 

 

 

 

বাঙালির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের স্বাধীনতার দিকপত্র ছয় দফার আন্দোলন যতটা এগিয়েছে রবীন্দ্রনাথ ততটাই নিষিদ্ধ হয়েছেন পাকিস্তানী শাসকদের কাছে। আমাদের জাতীয় সঙ্গিত ‘ আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি.. কোটি কোটি বাঙালির হৃদয় ও অনুভূতির কথা হলেও পাকিস্তানিদের হৃদয় যন্ত্রণার উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হতো তা। যে কারণে কবি ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর পাকিস্তানে নিষিদ্ধ হয়ে গেলেন।

 

 

 

 

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনে মৃত্যুশোক এসেছিল শৈশব বয়সে। ওই অল্প বয়সে এই শোক অনুভূতি প্রসঙ্গে কবি বলেছেন, ‘শিশুদের লঘু জীবন বড়ো বড়ো মৃত্যুকেও অনায়াসেই পাশ কাটাইয়া ছুটিয়া যায়, কিন্তু অধিক বয়সে মৃত্যুকে অত সহজে ফাঁকি দিয়া এড়াইয়া চলিবার পথ নাই। তাই সেদিনকার সমস্ত দুঃসহ আঘাত বুকে পাতিয়া লইতে হইয়াছিল।’

 

 

 

 

 

 

রবীন্দ্রনাথের জীবনের বিভিন্ন ধাপে অনেক প্রিয়জনের মৃত্যুর ব্যথা সামনে এসে হাজির হয়েছিল। এক একটি মৃত্যু এক এক ধরনের শোক ব্যথা গেঁথে দিয়েছিল কবিকে। সেটা হতে পারে বয়সের তারতম্যে অথবা ঘটনার তারতম্যে।

 

 

 

 

 

 

শৈশবে কবি হারিয়েছিলেন মমতাময়ী মাকে। তারপর প্রথম যৌবনে বৌঠান কাদম্বরী দেবীর মৃত্যু। এরপরে প্রিয়তমা পতœী মৃণালিনী দেবী, মধ্যমা কন্যা রেণুকা, কনিষ্ঠ পুত্র শমীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জ্যেষ্ঠা কন্যা বেলা, দৌহিত্র নীতীন্দ্রর অকাল মৃত্যু। অবশেষে কবির বার্ধক্য জীবনে এসে মৃত্যুশোক আসে ভ্রাতুষ্পুত্র সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনাবসানে। বার বার মৃত্যুশোক আলিঙ্গন করেছিল কবিকে।

 

 

 

 

 

 

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমার বাল্যকাল হতে দেখেছেন এদেশের মানুষের, কৃষকের, শ্রমিকের, মেহনতী মানুষের করুণ দুর্দশার চিত্র। যে জন্য তার হৃদয় উদ্বেলিত ব্যথিত হয়েছে বারবার। তিনি ইংরেজ এবং জমিদারের অত্যাচারে, পাকিস্তানিদের শাসকগোষ্ঠির বিরুদ্ধে ধর্মের নামে অধর্মের লড়াইয়ে তিনি নিজের সুখ-বিলাসিতাকে উপেক্ষা করেছেন। হত্যা, লুন্ঠন, নিপীড়নে তিনি কেঁদেছেন।

 

 

 

 

 

পিতা এবং মাতার মৃত্যুটা বঙ্গবন্ধুকে চরম ব্যথিত করে তুলেছে। ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের যে আত্মাহুতি এবং মা-বোনদের যে নিপীড়ন,নির্যাতন তা যেমন জালেমের বিরুদ্ধে অগ্নিমন্ত্রকে ত্বরান্বিত করে বিজয়কে এগিয়ে এনেছিল আবার তার স্বাধীনতার মন্ত্র বারবার গণশত্রæদের অন্তরে কাঁপন সৃষ্টি করেছিল।

 

 

 

 

যে জন্য ত্যাগের অপার মহিমার বিনিময়ে , দুঃখের শেঁকড় বেয়ে এসেছে আমাদের স্বাধীন মানচিত্র। শিলাইদহ এক সময় ছিল জমিদারি কাছারির কার্যক্রম। আজ সেই শিলাইদহ হয়েছে বিশ্ব মানবদের স্মৃতি অন্মেষণের পটভূমি হিসেবে। এখানে এলে এখনও রবীন্দ্রনাথের সাক্ষাৎ মেলে। অন্তর আনন্দের উপাদান মেলে।

 

 

 

 

 

যদি টুঙ্গিপাড়ার কথা বলি যেখানে দুরন্ত যৌবনের উন্মদনায় স্বাধীনতার বিচ্ছুরণ আলোর আভা উদ্ভাসিত হয়েছিল এই মাটির উর্বরতা থেকে। মহানায়ক এখানে নিজের মধ্যে রসদ গ্রহণ করেছিলেন বাঙালির মহা মুক্তির মন্ত্র সৃষ্টির জন্যে। মাঠ পেরিয়ে ঘাট। আঁধার পেরিয়ে আলোর সন্ধান দিতে মুজিব ছুটেছিলেন প্রান্তর বেয়ে প্রান্তরে। তার আহŸানে জাতি জাগ্রত হলো। একত্রিত হলো এক মুক্তি আলেখ্যের চেতনা ও বিশ্বাসে।

 

 

 

 

 

 

১৯৪১ সাল। কবি গেলেন। আনন্দলোকের অনন্ত যাত্রায়। শবযাত্রার মিছিলে দু:খের অনুুসঙ্গ।কবি আমাদের বিবেক ব্যথিত করে গেলেন। আজো ৬ আগস্ট আমাদের মাঝে হাজির হয় যেন কত চেনা মুখের ¤øান সুখের ভালবাসা নিয়ে। তবু কবি তুমি আমাদের চেতনায় ও নিঃশ্বাসে, বিবেক ও বিশ্বাসে, শৈলী ও মৌলিকতায়। আমাদের ভালবাসায় শিলাইদহ ফিরে আসে বিবেক তৈরীর অনুসন্ধানে। যেন এখানে কবি আছেন আমাদেরই অপেক্ষায় যুগ যুগ ধরে।

 

 

 

 

 

 

১৯৭৫ সাল। ১৫ আগস্ট। বাঙালির দিকপাল হারিয়ে গেলেন বন্দুকের বারুদের কাছে। জাতিকে নিয়ে জনকের মুক্তির দিকপত্রে নেমে এলো শকুনের নোখর। আমাদের সাধ্য ও সাধনার তপস্যে দিক-বিদিক হলো।

 

 

 

 

 

ইতিহাসের স্বাক্ষ্যে হাজির হলো মীর জাফর। তবে শেখ মুজিবর রহমান তার সৃষ্টি ও কর্মের জন্য অমরত্ব পেলেন ইতিহাসের পাতায়। কোলাহলের টুঙ্গিপাড়া এবার নীরব ও নিথর। ‘হে পিতা তোমার অকাল বিদায় আমাদেরকে দিক হারা করেছে।

 

 

 

 

 

হে পিতা যারা তোমাকে নিষিদ্ধ ও নির্বাসিত করতে চেয়েছিল তাদের ঠিকানা আজ আস্তাকুড়ের মধ্যে।’ বাঙালির মহানায়কের সামনে তার মহাপ্রাঙ্গনে যে নারকীয়তা তা জনকের মৃত্যুর পূর্ব ক্ষণ পর্যন্ত আরো প্রিয়তমা স্ত্রী, পুত্রসহ আরো নিকটতম ২০ জনের মৃত্যু যন্ত্রণা তাকে ব্যথিত করেছিল আঘাতের চরম নিষ্টুরতায়।

 

 

 

 

 

শিলাইদহ এবং টুঙ্গিপাড়া বাঙালিদের আজ উপেক্ষার বদলে প্রাপ্তির পবিত্র আশ্রম। যেখানে সৃষ্টি থেকে প্রাপ্তির পরিসমাপ্তি হয়েছে। পদ্মা এবং গড়াইয়ের জলে দু’জায়গায়ই হারানোর বেদনায় করুণ সুরের মায়াচারি ছায়ার কালোর গভীরতা উঁকি দিয়েছে।

 

 

 

 

 

তার একজন বাঙালি সাহিত্যের মহাকবি, আরেকজন বাঙালি জাতির অলৌকিক প্রাণ পুরুষ। রবীন্দ্রনাথ এবং শেখ মুজিবর রহমান। যেন পাহাড়ের সাথে পাহাড়ের সখ্য। প্রাণের সাথে প্রাণের নিবিড়তা। তাইতো এই আগস্ট মাস বাঙালির হারানোর মাস।

 

 

 

 

 

 

রবীন্দ্রনাথ নেই,নেই শেখ মুজিবর রহমান। শিলাইদহ আছে,আছে টুঙ্গিপাড়া। আগস্ট মাসে বিয়োগ শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করে তা বিকিয়ে দিতে হবে বাঙালির জীবন কান্ডারী জননেত্রী শেখ হাসিনাকে। যিনি আমাদেরকে পথ দেখাবেন রবীন্দ্র ধারায় মুজিবের স্বপ্নলোকে নিয়ে যেতে।
লেখক: গবেষক, উদ্ভাবক ও পরিবেশ ব্যক্তিত্ব।