প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:    দেশের রাজনীতিতে ‘হরিহর আত্মা’ হিসেবে অনেকের কাছে পরিচিত বিএনপি ও তার জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামীর সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আলাদা প্রার্থী থাকায় দুই দলের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে৷

 

 

 

 

দীর্ঘকাল ধরে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলা এই দল দু’টির মধ্যে কি তাহলে টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছে? এ প্রশ্ন করছেন অনেকে৷ আবার এর জন্য সরকারকে দায়ী করছেন কেউ কেউ৷ তাঁদের সন্দেহ, যুদ্ধাপরাধের বিচারে শীর্ষ নেতাদের হারানো দলটিকে এখন কিছু সুযোগ-সুবিধা দিয়ে বিএনপি থেকে আলাদা করতে চাইছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ৷ তবে এ বিষয়ে এখনই কোনো সিদ্ধান্ত টানতে নারাজ বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম খান৷

 

 

 

 

 

তিনি বলেন, ‘‘বিষয়টি নিয়ে তাদের সঙ্গে আমাদের এখনও কথা হয়নি৷ তারা যেহেতু এখনও আমাদের জোটে আছে, তাই এ বিষয়ে এখনই কিছু বলা ঠিক হবে না৷”

 

 

 

 

 

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ২০ দলীয় জোটের সমন্বয়কের দায়িত্বে আছেন৷ সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে জোটের বৈঠকে একাধিকবার জামায়াত নেতাদের তাদের প্রার্থী প্রত্যাহারের আহ্বান জানানোর কথা সাংবাদিকদের বলেছিলেন তিনি৷

 

 

 

 

তারপরও শেষ পর্যন্ত জামায়াত প্রার্থীর ভোটের লড়াইয়ে থাকার কারণ জানতে চাইলে নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘‘বিষয়টি অত বড় কিছু নয়৷ আগে থেকেই তারা বলছিল, সিটি কর্পোরশেন নির্বাচনে তারা এক জায়গায় মেয়র প্রার্থী চায়৷ আমরা বলেছিলাম, যেসব জায়গায় আমাদের সিটিং মেয়র আছে সেগুলোতে সম্ভব নয়৷ রংপুরসহ সামনে আরও নির্বাচন আছে, সেগুলোতে দেখা যাবে৷ ‘‘জোটে থাকলেও তারা একটি আলাদা দল৷ তারা ডিসিশন নিতেই পারে৷”

 

 

 

 

 

তবে জামায়াতের এই অবস্থানের পেছনে সরকারের ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করছেন জার্মান প্রবাসী গবেষক-লেখক মারুফ মল্লিক৷

 

 

 

 

 

তিনি বলেন, ‘‘সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে বিএনপির এজেন্টদের বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠলেও জামায়াতের ক্ষেত্রে তা হয়নি৷ এটা সরকারের জামায়াতঘনিষ্ঠতারই প্রমাণ দেয় বলে মনে করছি৷”

 

 

 

 

 

আগামী নির্বাচন সামনে রেখে ক্ষমতাসীনরা কিছু সুযোগ-সুবিধা দিয়ে জামায়াতকে বিএনপি থেকে দূরে সরাতে চাইছে বলেই মনে করেন বন ইউনিভার্সিটির ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো মারুফ৷ এ বিষয়ে অবশ্য ভিন্নমত দিয়েছেন সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক গাজী নাসিরউদ্দিন আহমেদ খোকন৷

 

 

 

 

বিএনপির পাশাপাশি জামায়াতের প্রার্থী থাকার কারণ নিয়ে তিনি বলেন, ‘‘যেহেতু বিএনপির উপরে সো-কল্ড সুশীল সমাজের একটা চাপ আছে, উদার গণতান্ত্রিক মিডিয়ার চাপ আছে, সেটা একটা কারণ হতে পারে৷ এর বাইরে জামায়াত একটু মাঠের শক্তিটাও যাচাই করে দেখতে চেয়েছে৷” তাঁর মতো বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম খানও বলছেন, জামায়াতের শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টার কথা৷

 

 

 

 

‘‘তারা ভেবেছিল, দেখা যাবে তাদের একটা বিরাট সমর্থন আছে৷ দে হ্যাভ লস্ট অ্যাট দ্যাট পয়েন্ট৷ বলা হচ্ছিল, সিলেটে ৪০ হাজার ভোট তাদের ফিক্সড৷ কিন্তু পেয়েছে ১০ হাজার৷”

 

 

 

 

 

সদ্য অনুষ্ঠিত সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বদর উদ্দীন আহমদ কামরানের চেয়ে ৬ হাজার ১৯৬ ভোট বেশি পেয়ে টানা দ্বিতীয় মেয়াদে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আরিফুল হক চৌধুরী৷

 

 

 

 

২০ দলীয় জোট থেকে আরিফুলকে সমর্থন দেওয়া হলেও সেখানে মহানগর জামায়াতের আমির এহসানুল মাহবুব জুবায়ের স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন৷ তিনি ভোট পেয়েছেন ১০ হাজারের কাছাকাছি৷ জামায়াত প্রার্থীর এত কম ভোট পাওয়ার কারণ হিসেবে দলীয় নেতা-কর্মীদের ভোটই ভাগ হওয়ার সন্দেহ করছেন গাজী নাসিরুদ্দিন আহমেদ৷

 

 

 

 

 

তিনি বলেন, ‘‘ধরা হয় যে, জামায়াতের ভোট ওখানে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার৷ জামায়াত সেখানে ভোট পেয়েছে ১০ হাজার৷ এখান থেকে কিন্তু মনে হয় না যে, জামায়াতের সবাই ওখানে জামায়াতকে ভোট দিয়েছে৷ এটা মনে হওয়ার কোনো কারণ নেই, অন্তত ভোটের সংখ্যাটা হিসাব করে৷”

 

 

 

 

 

এই নির্বাচন নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে মতভেদ দেখা দিয়েছে বলে বিএনপি ও তার জোটসঙ্গীদের খবর সংগ্রহে নিয়োজিত ঢাকার একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক জানিয়েছেন৷

 

 

 

 

নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামীর নেতা গোলাম পরওয়ার ও রফিকুল ইসলাম তাঁকে এমনটাই জানিয়েছেন৷

 

 

 

 

নির্বাচনের আগেও এ বিষয়ে পালটাপালটি বক্তব্য দিয়েছিলেন বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতারা৷

 

 

 

 

 

 

সেই প্রসঙ্গ তুলে গাজী নাসিরুদ্দিন বলেন, ‘‘হ্যাঁ, ১৮ দলীয় জোটের বৈঠকে সেটা (জামায়াতের প্রার্থী প্রত্যাহার) বলা হয়েছে৷ ওই বৈঠকের পরে পত্র-পত্রিকায় তখন দায়িত্বপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা গোলাম পরওয়ারের সঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মান অভিমানের খবর এসেছে৷”

 

 

 

 

বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেছিলেন, বিএনপির জেতার জন্য কারো উপর নির্ভর করতে হয় না, ‘বিএনপি সেলফ সাফিশিয়েন্ট জেতার জন্য’৷

 

 

 

 

তাঁর এই বক্তব্যের পর সংবাদমাধ্যমে বিবৃতি পাঠিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন গোলাম পরওয়ার৷

 

 

 

 

 

এই জামায়াত নেতা বলেন, ‘‘যদি তিনি এই ধরনের বক্তব্য দিয়ে থাকেন, তাহলে আমি তাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, ১৯৯১ সালে জামায়াত তার নিজ দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সমর্থন দিয়ে বিএনপিকে সরকার গঠনের সুযোগ করে দিয়েছিল৷ দেশ ও জাতির স্বার্থে এই ধরনের সমর্থন এবং উদারতা ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা৷”

 

 

 

 

জামায়াতের এই অবস্থানের প্রভাব বিএনপির রাজনীতিতে ফেলবে বলে মনে করেন কিনা জানতে চাইলে গাজী নাসিরউদ্দিন বলেন, ‘‘না, আমি মনে করি না কোনো প্রভাব ফেলবে৷”

 

 

 

 

আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ ছাড়া বিএনপির ‘কোনো সুযোগ নেই’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, ওই নির্বাচনে বিএনপি জামায়াতে ইসলামীর সর্বাত্মক সমর্থন পাবে৷

 

 

 

 

 

‘‘অলআউট সমর্থন যাকে বলে, সেটা বিএনপি পাবে৷ আমরা যদি ১০ বছরের ডেটা দেখি, ২০০১ থেকে যখন ভোটের ভিত্তিতে যে জোট নির্ধারিত হয়েছে তখন থেকে তাদের আচরণ যদি বিশ্লষণ করি, তাহলে বিএনপিকে জামায়াত থেকে আলাদা করার কোনো সুযোগ নেই৷

 

 

 

 

 

‘‘জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির যে হৃদ্যতা সেটা মনে হয় না শত আঘাতেও ছিন্ন হবে৷ সেটা ভাবার বাস্তব কোনো কারণ নেই৷ বিএনপির এখনকার রাজনীতি এবং জামায়াতের যে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই – এই দু’টো যদি একসঙ্গে চিন্তা করি, তাহলে সেটা সম্ভব না৷”

 

 

 

 

এ বিষয়ে তার সঙ্গে ভিন্নমত রয়েছে মারুফ মল্লিকের: ‘‘বিএনপি-জামায়াতের নির্বাচনকেন্দ্রিক যে জোট তা কোনো স্থায়ী জোট নয়৷ যে কোনো সময় এই সম্পর্ক ভেঙে যেতে পারে এবং সেটা অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়৷ বিশ্ব রাজনীতিতে এমন নজির অনেক রয়েছে৷”

 

 

 

 

 

জামায়াতকেবিএনপি থেকে সরাতে সরকারের তৎপরতারঅভিযোগ এবং তা আগামী নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে কিনা সে প্রশ্নের জবাবে নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘‘তারা আমাদের জোটে আছে৷ তাই এটা এখন আমাদের বলা ঠিক হবে না৷ তবে বলে রাখি, ২০০১ সালের নির্বাচনেও জামায়াতে ইসলামী চার জায়গায় প্রার্থী দিয়েছিল, সেটা ভালো হয়নি৷”

 

 

 

 

 

দুর্নীতি মামলায় কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে বন্দি দলীয় চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার মুক্তিই এখন তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে জানান বিএনপির সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরামের এই সদস্য৷

 

 

 

 

 

 

তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়াও নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার, নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন, দলীয় প্রভাবমুক্ত প্রশাসনসহ অনেকগুলো বিষয় রয়েছে তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে৷ ‘‘ওই বিষয়গুলো ঠিক হলে তখন আসবে অংশগ্রহণের প্রশ্ন৷ তখন দেখা যাবে কোন দলের কী ভূমিকা থাকে৷”