প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:       কুরবানী আল্লাহর তাআলার নৈকট্য লাভের অন্যতম একটি মাধ্যম ও গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাত। বান্দা এর মাধ্যমে আল্লাহর তাআলার আনুগত্য প্রকাশ করার সাথে সাথে তাকওয়ার দৌলত আর্জন করে থাকে। আর এটাই কুরবানীর অন্যতম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।

 

 

 

 

পবিত্র কোনআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ”আল্লাহর নিকট জন্তুর গোশত এবং রক্ত পৌঁছায় না, বরং একমাত্র তোমাদের তাকওয়াই পৌঁছায়।”-(সূরা হজ্ব, আয়াত-৩৭)

 

 

 

 

 

কুরবানীর প্রতি গুরুত্ব আরোপ করতে গিয়ে রাসূল (সা:) বলেছেন, “কুরবানী দেওয়ার সামর্থ্য থাকার পরও যে কুরবানী দেয় না সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়”। – (আহমাদ, ইবনে মাজাহ হা/৩১২৩)।

 

 

 

 

 

আকিকা বলা হয়, নবজাতকের মাথায় গজানো প্রথম চুলগুলোকে। সপ্তম দিনে যেহেতু এগুলো মুড়িয়ে মাথা থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয় এ জন্য এ চুলগুলোকে আকিকা নামকরণ করা হয়েছে। এই প্রেক্ষিতে মাথা মোড়ানোর সময় যে ছাগল জবাই করা হয় সেটাকেও আকিকা বলা হয়। (মাযাহেরে হক)

 

 

 

 

 

 

কোরবানীর সাথে আকীকা দেয়া যায় কি না?

আমাদের দেশে সাতভাগে গরু দিয়ে কুরবানী করার ক্ষেত্রে আকীকার অংশীদার হওয়ার নিয়ম ব্যপকভাবে প্রচলিত আছে। এটি হাদীছ সম্মত নয়। একটি গরু দিয়ে যদি একজন সন্তানের আকীকা করা যদি ঠিক না হয়, তাহলে কুরবানীর গরুর সাথে ভাগে আকীকা করা সঠিক হওয়ার প্রশ্নই আসে না। সর্বোপরি কতিপয় আলেম কোরবানীর গরুর সাথে ভাগে আকীকা দিলে তা বৈধ হবে বলে মত দিয়েছেন। কিন্তু তা হাদীছ সম্মত নয়।

 

 

 

 

 

 

মুলত, কুরবানী ও আকীকা দু’টি পৃথক সুন্নাত। সতুরাং তা একই দিনে হ’লে সাধ্যমতে দুটি-ই আদায় করবে। নইলে কেবল আকীকা করবে। কেননা আকীকা জীবনে একবার হয় এবং তা সপ্তম দিনেই করতে হয়।

 

 

 

 

 

কিন্তু কুরবানী প্রতি বছরই করা যায়। সমাজে প্রচলিত কুরবানীর পশুতে আকীকার নিয়ত করা শরীয়ত সম্মত নয়। রাসূল (ছাঃ) বা ছাহাবায়ে কেরামের যুগে এ ধরনের আমলের অস্তিত্ব ছিল না।

 

 

 

 

১. আবুদাউদ, নাসাঈ, তির্মিযী, ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/৪১৫৩; ইরওয়া হা/১১৬৫। ২. আলোচনা দ্রঃ নায়লুল আওত্বার ৬/২৬৮, আক্বীক্বা অধ্যায়; মিরআত ২/৩৫১ ও ৫/৭৫।

 

 

 

 

 

 

একত্রে কুরবানি ও আকিকা করার বিধানঃ
কুরবানি ও আকীকা আলাদাভাবেই করাউচিৎ। তবে একত্রে করলে আদায় হবে না তা নয়। একত্রে করলেও কুরবানী-আকীকা দুটোই আদায় হবে। কারণ আকীকাও এক ধরনের কুরবানী। হাদীস শরীফে আকীকার উপরও ‘নুসুক’ শব্দের প্রয়োগ হয়েছে। আরএখানে ‘নুসুক’ অর্থ কুরবানী।

 

 

 

 

 

হাদীসের আরবী পাঠ এই-

سئل رسول الله صلى الله عليه وسلم عن العقيقة، فقال : لا أحب العقوق كأنه كره الاسم، قالوا يا رسول الله! نسألك عن أحدنا يولد له، فقال : من أحب منكم أن ينسك عن ولده فليفعل، على الغلام شاتان مكافأتان، وعلى الجارية شاة.

(দ্র. আলমুসান্নাফ, আব্দুর রাযযাক : ৭৯৬১; আলমুসনাদ, আহমদ : ৬৭১৩, ৬৭২২; আসসুনান, আবু দাউদ(আকীকা অধ্যায়) ২৮৪২; আস-সুনান, নাসায়ী : ৭/১৬২, ১৬৩; আলমুসান্নাফ, ইবনে আবী শাইবা ১২/৩২৪হাদীস : ২৪৭২৭; আলমুসতাদরাক, হাকিম, ৫/৩৩৭, হাদীস : ৭৬৬৬)

 

 

 

 

 

 

سئل رسول الله صلى الله عليه وسلم عن العقيقة، فقال : لا يحب الله العقوق، من ولد له منكم ولد فأحب أن ينسك عنه فليفعل.
(দ্র. আলমুসান্নাফ, ইবনে আবী শাইবা ১২/৩২১, হাদীস : ২৪৭২২; আলমুয়াত্তা, ইমাম মালিক, আকীকাঅধ্যায়, হাদীস : ৬৫৮)

 

 

 

 

 

আকীকাও যখন এক প্রকারের কোরবানী তখন একটি গরু বা উট দ্বারা একাধিক ব্যক্তির (সাত জন পর্যন্ত)আলাদা-আলাদা কুরবানী আদায় হওয়ার হাদীসগুলো থেকে কুরবানী-আকীকা একত্রে আদায়ের অবকাশও প্রমাণিত হয়। এটা শরীয়তের পক্ষ হতে প্রশস্ততা যে, গরু বা উটেরক্ষেত্রে একটি ‘জবাই’ সাত জনের সাতটি জবাইয়ের স্থালাভিষিক্ত গণ্য হয়। একারণেএকটি উট বা গরু সাত জনের পক্ষে যথেষ্ট হয়।

 

 

 

 

 

সহীহ মুসলিমে সাহাবী জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, ‘আমরা হজ্বেরইহরাম বেঁধে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে বের হলাম। তিনিআমাদেরকে আদেশ করলেন যেন প্রত্যেক উট ও গরুতে সাতজন করে শরীক হয়েকুরবানী করি।’-সহীহ মুসলিম, কিতাবুল হজ্ব, হাদীস : ১৩১৮/৩৫১

 

 

 

 

 

 

 

خرجنا مع رسول الله صلى الله عليه وسلم مهلين بالحج، فأمرنا رسول الله صلى الله عليه وسلم أن نشترك في الإبل والبقر، كل سبعة منا في بدنة.
অন্য বর্ণনায় আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘(একটি) গরুসাতজনের পক্ষ হতে এবং (একটি) উট সাতজনের পক্ষ হতে (কুরবানী করা যাবে)।’
البقرة عن سبعة والجزور عن سبعة.
-আস-সুনান, আবু দাউদ, হাদীস : ২৮০১, কিতাবুল আযাহী

 

 

 

 

 

 

 

সারকথা, ‘নুসুক’ বা কুরবানীর ক্ষেত্রে শরীয়তের প্রতিষ্ঠিত মূলনীতি এই যে, ছাগল,ভেড়া ও দুম্বার ক্ষেত্রে একটি ‘জবাই’ (إراقة الدم) দ্বারা একটি কুরবানী আদায় হলেও উট ওগরুর ক্ষেত্রে একটি ‘জবাই’ দ্বারা সাতটি কুরবানী আদায় হতে পারে।

 

 

 

 

 

অর্থাৎ এখানে‘জবাইয়ে শরীক হওয়া’ও (সর্বোচ্চ সাত জনের) কুরবানী আদায়ের পক্ষে যথেষ্ট।আকীকাও যেহেতু ‘নুসুক’ বা কুরবানী তাই এ মূলনীতিতে আকীকাও শামিল থাকবে।সুতরাং ‘একটি পশু জবাই’ করা দ্বারা যেমন তা আদায় হবে, তেমনি নির্ধারিত নিয়মে‘জবাইয়ে শরীক হওয়ার’ (شركة في دم) দ্বারাও তা আদায় হবে।

 

 

 

 

 

 

 

সুতরাং এ প্রশ্নের অবকাশ নেই যে, ‘আকীকায় তো পশু জবাই করতে বলা হয়েছে। অতএব অন্তত একটি পশু জবাইয়ের দ্বারাই তা আদায় হতে পারে।’ কারণ শরীয়তেরদৃষ্টিতে পশু জবাই (إراقة الدم)-এর দায়িত্ব যেমন একটি পশু জবাই করার দ্বারা আদায় হয়তেমনি নির্ধারিত পশুতে ‘শরীক হওয়ার’ দ্বারাও (شركة في دم) আদায় হয়। আকীকার ক্ষেত্রেএই মূলনীতি প্রযোজ্য নয় বলে দাবি করলে ব্যতিক্রমের বিধানসম্বলিত দলীল লাগবে। আমাদের জানামতে এমন কোনো দলীল নেই।

 

 

 

 

 

থাকল, দুই ধরনের কুরবানী এক পশু দ্বারা আদায় হওয়ার প্রশ্ন, তো এটি একটিইজতিহাদী বিষয়। একারণে মুজতাহিদ ইমামগণের মাঝে এ বিষয়ে কিছু মতপার্থক্যওআছে। কিন্তু নস বা কুরআন-সুন্নাহর সুষ্পষ্ট কোনো বিধানে এ বিষয়ে নিষেধ আছে বলেআমাদের জানা নেই; বরং অনুমোদনের পক্ষে হাদীস-আছারের দলীল আছে।

 

 

 

 

 

পক্ষেবিখ্যাত তাবেয়ী ইমাম ‘আতা ইবনে আবী রাবাহ রাহ. এর ফতোয়াটিই সম্ভবতবিজ্ঞজনের যথেষ্ট হবে। তিনি বলেছেন, ‘উট ও গরু সাতজনের পক্ষ হতে কুরবানী হতেপারে। আর এতে শরীক হতে পারে কুরবানীকারী, তামাত্তু হজ্বকারী এবং হজ্বের ইহরামগ্রহণের পর হজ্ব আদায়ে অপারগ ব্যক্তি।(দ্র. আসসুনান, সায়ীদ ইবনে মানসূর-আল কিরা লি-কাসিদি উম্মিল কুরা, পৃ. ৫৭৩)

 

 

 

 

 

 

প্রখ্যাত তাবেয়ী হাসান বসরী রাহ. বলেন,

إذَا ضَحُّوا عَنْ الْغُلَامِ فَقَدْ أَجْزَأَتْ عَنْهُ مِنْ الْعَقِيقَةِ .
যদি শিশুর পক্ষ থেকে কুরবানীর দিন কুরবানী করা হয় তাহলে উক্ত কুরবানী শিশুর আকিকার জন্যও যথেষ্ট হবে । (অর্থাৎ এর দ্বারা আকিকাও আদায় হবে) , মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা ৫/৫৩৪,।