প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:       জঙ্গি পুরোপুরি নির্মূল করা না গেলেও নিয়ন্ত্রণ সম্ভব আর সেটা করতে আরো সময় লাগবে৷ আশার কথা, মানুষ সচেতন হচ্ছে এবং জঙ্গিদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাও বন্ধ হয়েছে৷ এমনটিই বললেন বিশ্লেষকরা৷

 

 

 

 

 

 

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশীদ বলেন, ‘‘জঙ্গি তো ভেতর থেকে তৈরি হয় না, চাপিয়ে দেয়া হয়৷ বাংলাদেশ এমন একটি দেশ যেখানে শুরু থেকেই জঙ্গিদের বিরুদ্ধে মানুষের একটা অবস্থান আছে৷

 

 

 

 

 

বিশ্বে যেখানেই জঙ্গিরা ঢুকেছে, সেই দেশকে শেষ করে দিয়েছে৷ কিন্তু বাংলাদেশকে তারা শেষ করে দিতে পারেনি৷ কারণ, এখানকার মানুষ জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে একটা শক্ত অবস্থান নিয়েছে৷ হ্যাঁ, এটা হয়ত পুরোপুরি নির্মূল হয়নি, তবে এখানে জঙ্গিরা টিকতে পারবে না, এটাও সত্য৷”

 

 

 

 

 

 

১৩ বছর আগে, ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ৬৩ জেলায় ৫০০ স্থানে বোমা ফাটিয়ে ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছিল জামা’আতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)৷ নিষিদ্ধঘোষিত সেই পুরোনো জেএমবি এখন নতুন করে আত্মপ্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছে৷ একই সঙ্গে দেশীয় এই জঙ্গি সংগঠন এখন আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনে পরিণত হওয়ার চেষ্টা করছে৷

 

 

 

 

এছাড়া ভারতে সক্রিয় জেএমবি নেতাদের সঙ্গে আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখা একিউআইএস-এর যোগাযোগ গড়ে উঠেছে বলেও ভারতীয় গণমাধ্যমে খবর বের হয়েছে৷

 

 

 

 

 

 

জঙ্গি দমনে যুক্ত আইন- শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্র বলছে, দেশের আরেক জঙ্গি সংগঠন এবং আল-কায়েদার মতাদর্শ অনুসরণকারী আনসার আল ইসলামের সঙ্গেও জেএমবির একটা বোঝাপড়া হয়েছে৷ ফলে খুব সহসাই যে বাংলাদেশ থেকে জঙ্গি নির্মূল হয়ে যাচ্ছে এমন ভাবা কঠিন৷

 

 

 

 

 

 

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘‘শুরুটা যত দ্রুত হয়, এর শেষটা তত তড়াতাড়ি হয় না৷ আমাদের পাশের দেশ শ্রীলংকায় তামিল টাইগারদের শেষ করতে বহু বছর চেষ্টা করতে হয়েছে৷ এখন হয়ত তারা সাফল্য পেয়েছে৷ আমাদের এখানেও হয়ত সাফল্য আসবে, তবে সময় লাগবে৷

 

 

 

 

 

বিশেষ করে তাদের আর্থিক জায়গা দুর্বল করতে পারলে তাড়াতাড়ি কাজ হয়৷ এখানে এমনভাবে মোটিভেট করা হয় যাতে একটি মানুষ তার নিজের জীবন দিয়ে দিচ্ছে৷ ফলে যারা ধরা পড়ে পরে ছাড়া পাচ্ছে, তাদের ডি-মোটিভেটের কাজটাও করতে হবে৷ এই কাজে সরকারের এক ধরনের চেষ্টা আছে৷”

 

 

 

 

 

দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় সারা দেশে ১৫৯টি মামলা হয়েছিল৷ এর মধ্যে ১০ মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়৷ বাকি ১৪৯টি মামলায় ১ হাজার ১০৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়৷

 

 

 

 

 

এসব মামলার মধ্যে ৯৮টির নিষ্পত্তি হয়েছে৷ ৫১টি মামলা এখনো বিচারাধীন রয়েছে৷ বিভিন্ন মামলার রায়ে ৩০৭ জনের সাজা হয়েছে৷ মৃত্যুদণ্ড হয়েছে ২৭ জনের৷

 

 

 

 

 

২০০০ সালে দিনাজপুরের ফুলবাড়িতে বোমা হামলার মধ্যদিয়ে জেএমবি কার্যক্রম শুরু করে৷ বর্তমানে জেএমবি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের কার্যক্রম বিস্তার করার চেষ্টা করছে৷

 

 

 

 

 

ইতোমধ্যে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে এদের শক্তিশালী নেটওয়ার্কের তথ্য মিলেছে৷ গত ৭ আগস্ট ভারতের বেঙ্গালুরু থেকে জেএমবির দুর্ধর্ষ পলাতক জঙ্গি ‘বোমা মিজান’কে গ্রেফতার করা হয়৷ পুলিশ ও র‌্যাবের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, এই মুহূর্তে জঙ্গিদের বিচ্ছিন্নভাবে হামলা চালানোর মতো ক্ষমতা থাকলেও তা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে৷

 

 

 

 

 

র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান বলেন, ‘‘আমাদের জঙ্গিবিরোধী অভিযান অব্যাহত আছে৷ এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া৷ তবে এই মুহূর্তে জঙ্গিদের বড় কোনো হামলা চালানোর অবস্থা নেই৷ র‌্যাব নিয়মিত জঙ্গি কার্যক্রম মনিটরিং করছে৷”

 

 

 

 

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খানও বলেন, ‘‘প্রতিষ্ঠার পর থেকেই র‌্যাব জঙ্গি দমনে গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে৷ র‌্যাবের অভিযানেই জেএমবির প্রধান আমির শায়খ আবদুর রহমান, সেকেন্ড-ইন-কমান্ড সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাইসহ শীর্ষ জঙ্গি নেতারা গ্রেফতার হয়েছে৷”

 

 

 

 

 

 

তিনি বলেন, ‘‘জঙ্গিদের তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, তবে নিয়ন্ত্রণে আছে৷ বর্তমানে উত্তরাঞ্চলে জঙ্গিদের কিছুটা তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে৷ এছাড়া অনেক সময় জেলা পর্যায়ে নানা কৌশলে কর্মী বা সদস্য সংগ্রহের কাজ করছে৷”

 

 

 

 

 

দেশে পুলিশ ও র‌্যাবের তৎপরতার মুখে বেশ কয়েক বছর আগেই পুরোনো জেএমবির অনেকে ভারতে আশ্রয় নেয় এবং সেখানে সংগঠিত হতে থাকে৷ ২০১৪ সালের ২ অক্টোবর বর্ধমানের খাগড়াগড়ে একটি জঙ্গি আস্তানায় বোমা বিস্ফোরণের পর ভারতে জেএমবির বিস্তারের বিষয়টি ব্যাপকভাবে ওই দেশে আলোচনায় আসে৷

 

 

 

 

 

চলতি বছরের জানুয়ারিতে আবার ভারতে জেএমবি আলোচনায় আসে৷ কলকাতা পুলিশের বিশেষ টাস্কফোর্স ভারতের গণমাধ্যমকে বলেছে, বুদ্ধগয়ায় তিব্বতের ধর্মীয় নেতা দালাই লামাকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল জেএমবি৷ এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে জেএমবির পাঁচ সদস্য গ্রেফতার হয়৷

 

 

 

 

 

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘‘বাংলাদেশে জঙ্গিদের সঙ্গে বাইরের একটা সখ্য আছে৷ শুরু থেকেই জেএমবির সঙ্গে আল-কায়েদার মতাদর্শিক বা নীতিগত মিল ছিল৷

 

 

 

 

 

কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ জঙ্গিদের পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করায় এখানে সেইভাবে তারা গেড়ে বসতে পারেনি৷ এক সময় রাষ্ট্রের সহযোগিতা তারা পেলেও এখন কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দল তাদের সমর্থন করে এমন তথ্য নেই৷ ফলে আবারও যে জঙ্গি মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে সেটার সুযোগ মনে হয় নেই৷’

 

 

 

 

 

 

তবে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘‘উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় জেএমবি সক্রিয় হয়ে উঠেছে৷ তারা ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ হয়ে কাজ করছে৷

 

 

 

 

 

 

চলতি বছর এ পর্যন্ত অর্ধশতাধিক জেএমবি সদস্য গ্রেফতার হয়েছে৷ এছাড়া জেএমবি সদস্য সংগ্রহের পাশাপাশি তহবিল গঠনের দিকেও মনোযোগ দিয়েছে৷ এক্ষেত্রে তারা ডাকাতিকে অন্যতম উপায় হিসেবে বেছে নিয়েছে৷”