প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:      আজ ২১ আগস্ট। দেশের ইতিহাসের একটি কালো দিন। ১৪ বছর আগে ২০০৪ সালের এই দিনেই রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে দলের সভাপতি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে নৃশংসতম বর্বরোচিত হামলা চালায় জঙ্গিরা। সেদিন ভাগ্যক্রমে শেখ হাসিনা বেঁচে গেলেও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন প্রাণ হারান।

 

 

 

 

 

 

আহত হয় শতাধিক মানুষ। তৎকালীন রাষ্ট্রযন্ত্রের গভীর ষড়যন্ত্র আর পৃষ্ঠপোষকতায় বিভীষিকাময় এ হামলার সঙ্গে জড়িত ছিল দুর্ধর্ষ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ (হুজিবি)।

 

 

 

 

 

ষড়যন্ত্র শুধু হামলায়ই শেষ হয়নি, বিচার ভিন্ন খাতে প্রভাবিত করতেও সাজানো হয়েছিল জজ মিয়া নাটক। হামলার ঘটনায় দায়ের হওয়া দুটি মামলায় সাক্ষীদের জবানবন্দিতে প্রকৃত অপরাধীদের মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে একের পর এক। এখন মামলা দুটির বিচার একেবারে শেষ পর্যায়ে।

 

 

 

 

 

মামলার অন্যতম আসামি বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবরের পক্ষে যুক্তিতর্ক শেষের মাধ্যমেই মূলত এই মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষ হচ্ছে। এই যুক্তিতর্ক শেষ হতে আর তিন থেকে চার কর্মদিবস সময় লাগতে পারে বলে ধারণা সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের।

 

 

 

 

 

 

এরপর রাষ্ট্রপক্ষের সমাপনী বক্তব্যের পরই রায়ের জন্য দিন ঠিক করবেন ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন। রাজধানীর নাজিম উদ্দীন রোডে পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের পাশে স্থাপিত বিশেষ এজলাসে একসঙ্গেই বিচার চলছে দুটি মামলার।

 

 

 

 

 

আগামী ২৭, ২৮ ও ২৯ আগস্টও আসামি পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য দিন ধার্য রয়েছে। এদিকে বিচার নিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, আসামিপক্ষ অহেতুক সময়ক্ষেপণ করেছে। তারা সময়ক্ষেপণ না করলে অনেক আগেই বিচার শেষ হতো।

 

 

 

 

 

এই মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক প্রথমবার্তাকে বলেন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার বিচার কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আগামী মাসের মধ্যে মামলাটির রায় হবে।

 

 

 

 

 

রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি সৈয়দ রেজাউর রহমান প্রথমবার্তাকে বলেন, বহুল আলোচিত এই মামলা দুটির বিচার এখন একেবারেই শেষ পর্যায়ে। তবে মামলার কার্যক্রম স্বাভাবিক গতিতে আনতে নানা ধরনের বাধা ছিল। আসামিপক্ষও শুনানির সময় অহেতুক সময় নষ্ট করে। তাই কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার জন্যই এ ন্যক্কারজনক হামলা চালায় আসামিরা।

 

 

 

 

 

ওই হামলার করুণ স্মৃতি নিয়ে এখনো বেঁচে আছেন অনেকে। অনেকেই হাত-পা হারিয়ে চিরদিনের জন্য পঙ্গু হয়ে বিচারের আশায় ১৪ বছর ধরে অপেক্ষা করছেন। একসময় নিরাশও হয়েছিলেন তারা। কারণ ঘটনার গুরুত্ব নষ্ট করতে তদন্ত ভিন্ন খাতে নিতে নানা চেষ্টা করেছে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। এখন অন্তত বলতে পারি সব আসামিরই সর্বোচ্চ সাজা হবে। ক্ষতিগ্রস্ত সবাই ন্যায়বিচার পাবে।

 

 

 

 

 

 

রাষ্ট্রপক্ষের আরেক আইনজীবী আকরাম উদ্দিন শ্যামল প্রথমবার্তাকে বলেন, মামলার মোট ৪৯ আসামির মধ্যে বর্তমানে এরই মধ্যে ৪৪ জনের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়েছে। এখন আসামি লুত্ফুজ্জামান বাবরের যুক্তি শেষ হলেই মূলত মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষ হবে। এরপর রাষ্ট্রপক্ষ সমাপনী বক্তব্য উপস্থাপন করার পরই আদালত রায়ের জন্য দিন ঠিক করবেন। অভিযোগপত্রে মৃত্যুদণ্ডের ধারা না থাকায় বাকি চারজনের যুক্তিতর্ক প্রয়োজন নেই বলেও তিনি জানান।

 

 

 

 

 

 

 

 

তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের মোট ৪৯১ সাক্ষীর মধ্যে ২২৫ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এই ২২৫ সাক্ষীর বক্তব্যেই আসামিদের অপরাধ প্রমাণ হয়ে গেছে। এরপর আসামিপক্ষও ২০ জন সাফাই সাক্ষী প্রদান করেছে। তিনি বলেন, আমরা ২৫ কার্যদিবসে রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন সমাপ্ত করেছি। আর আসামিপক্ষ এখনো পর্যন্ত ৮৫ কার্যদিবস সময় নিয়েছে। আশা করছি তারা অহেতুক সময় নষ্ট না করে দ্রুত যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করেব। মামলার সব আসামিই সর্বোচ্চ শাস্তি পাবে বলেও আশা প্রকাশ করেন রাষ্ট্রপক্ষের এই আইনজীবী।

 

 

 

 

 

 

মামলার নথি সূত্রে জানা গেছে, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী শান্তি সমাবেশে দলীয় সভাপতি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। ওই হামলায় দলীয় নেত্রী ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন। এ ঘটনার দুটি মামলায় মোট আসামি ৫২ জন।

 

 

 

 

 

তার মধ্যে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতে ইসলামী নেতা আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের এবং সিলেটে ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীকে হত্যাচেষ্টা মামলায় হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি আবদুল হান্নানের ও শরীফ শাহেদুল ইসলাম বিপুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। ফলে এ মামলা থেকে তাদের নাম বাদ পড়েছে। অবশিষ্ট ৪৯ আসামির বিচার চলছে।

 

 

 

 

 

আসামিদের মধ্যে ৮ জন জামিনে এবং ১৮ জন পলাতক। বাকি আসামিরা কারাগারে রয়েছে। চাঞ্চল্যকর এ মামলায় পর্যায়ক্রমে তদন্ত ও চার্জশিটে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান, তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবর ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিবের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নামও যুক্ত হয়েছে আসামির তালিকায়।

 

 

 

 

 

 

জজ মিয়া নাটক : বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে নারকীয় এ ঘটনার পর থেকেই মামলা ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। সাজানো হয় ‘জজ মিয়া’ নাটক। হামলার দিন পুলিশ বাদী হয়ে মতিঝিল থানায় একটি মামলা করে। পরদিন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মামলা করতে গেলে তা নেওয়া হয়নি।

 

 

 

 

 

উল্টো একটি প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করে শুরু থেকে হামলার ঘটনা ভিন্ন খাতে নেওয়ার ষড়যন্ত্র করে সিআইডি। এর নেপথ্যে কলকাঠি নাড়েন তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবরসহ একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। অপপ্রচারের অংশ হিসেবে আওয়ামী লীগের দিকে সন্দেহের আঙ্গুলও তোলে বিএনপি।

 

 

 

 

 

 

এরপর প্রথমে পার্থ সাহা নামের এক নিরীহ যুবককে আটক করে তাকে অমানবিক নির্যাতন করে মামলটি ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। পরে ২০০৫ সালে নোয়াখালীর সেনবাগের বাসিন্দা জজ মিয়া নামে আরেক নিরীহ যুবককে আটক করে ১৭ দিন হেফাজতে রেখে সাজানো জবানবন্দি আদায় করা হয়। জজ মিয়াকে আটকের পর তার পরিবারের ভরণপোষণের জন্য মাসে মাসে টাকা দিতেন সিআইডির কর্মকর্তারা।

 

 

 

 

 

 

 

একপর্যায়ে তাকে রাজসাক্ষী করতে সিআইডির অপচেষ্টা ফাঁস করে দেন তার পরিবারের সদস্যরা। বাবরের নির্দেশনায় এ হামলায় জজ মিয়াকে সামনে এনে তদন্তের নামে ‘আষাঢ়ে গল্প’ প্রকাশ করতে থাকেন সিআইডির তৎকালীন এএসপি আবদুর রশীদ, বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন ও মুন্সী আতিকুর রহমান।