প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:      খালেদা জিয়া (ফাইল ছবি)সদ্য প্রয়াত ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ীর মৃত্যুতে যখন সাত দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালিত হচ্ছে, তখনই সামনে এলো বাংলাদেশের বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার একটি বিরল ও কৌতূহলোদ্দীপক আলোচনার কথা।

 

 

 

 

খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে যে অবনতি হয়েছিল, তা কারও অজানা নয়। কিন্তু সেই প্রবল ‘টেনশনের আবহে’ও বাজপেয়ী নিজের উদ্যোগে খালেদা জিয়াকে হাঁটুর অস্ত্রোপচার করিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন; এমনকি শেয়ার করেছিলেন তার প্রিয় চিকিৎসকের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরও।

 

 

 

 

 

এই ‘হাঁটু-বৃত্তান্তে’র সূত্রপাত ২০০২ সালের জানুয়ারিতে কাঠমান্ডুতে সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের সময়।

 

 

 

 

বাজপেয়ীর প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়ে মিডিয়া-ইনচার্জ বা মুখপাত্রের দায়িত্ব পালনকারী অশোক ট্যান্ডন জানিয়েছেন সেই ঘটনার বিবরণ।

 

 

 

ট্যান্ডনের কথায়, ‘মাত্র কয়েক মাস আগেই ঢাকার ক্ষমতায় এসেছেন খালেদা জিয়া। কিন্তু তার দল নির্বাচনে জেতার পর থেকেই বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে যেভাবে, বিশেষত হিন্দুদের ওপর চরম নির্যাতন শুরু হয়েছিল, ভারত তাতে খুবই রুষ্ট ছিল। সার্ক সামিটের অবকাশে খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠকে বাজপেয়ী খুব কঠোরভাবে বিষয়টি তুলবেন বলেও ঠিক করে রেখেছিলেন।’

 

 

 

 

‘বস্তুত বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার দায়িত্ব যে দেশের সব ধর্মের মানুষকে রক্ষা করা, সে কথাও তিনি সেদিন খালেদা জিয়াকে স্পষ্ট ভাষায় মনে করিয়ে দেন। কিন্তু তার আগে বৈঠকের মেজাজটা অনেকটাই হালকা হয়ে গিয়েছিল হাঁটুর অস্ত্রোপচার নিয়ে দুই প্রধানমন্ত্রীর কথাবার্তায়’, বলেন ট্যান্ডন।

 

 

 

 

 

তিনি বলেন, ‘যতদূর মনে আছে প্রসঙ্গটা তুলেছিলেন বাজপেয়ী নিজেই। তার মাস কয়েক আগেই মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে তার হাঁটুর অপারেশন করেছেন ডক্টর চিত্তরঞ্জন রানাওয়াত। অপারেশন বেশ সফল হয়েছিল। তিনি তখন আবার বেশ ভালোই হাঁটতে পারছেন। কিন্তু খালেদা জিয়া যে একটু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছেন, সেটা তার নজর এড়ায়নি।’

 

 

 

 

 

ট্যান্ডন বলেন, ‘বৈঠকে বসার পরই বাজপেয়ী বললেন, ম্যাডাম প্রাইম মিনিস্টার, নিজের অভিজ্ঞতা থেকে আপনাকে বলবো, আপনিও হাঁটুর অপারেশন করিয়ে নিন, দেখবেন অনেক ভালো থাকবেন। খালেদা জিয়া সেই পরামর্শ হাসিমুখে নিলেও অস্ত্রোপচার নিয়ে যে তার একটু ভীতি আছে, সেটাও অবশ্য গোপন করেননি। হাঁটুর ব্যথা আর অপারেশন নিয়ে সেই বৈঠকের ফাঁকেই দুজনের অনেক কথাবার্তা হলো।’

 

 

 

 

কাহিনির বাকিটা শোনা যাক ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শশাঙ্কের মুখ থেকে।

 

 

 

 

ঠিক দুই বছর পর, ২০০৪ সালের জানুয়ারিতে ইসলামাবাদে সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের অবকাশে আবার দেখা হলো বাজপেয়ী ও খালেদা জিয়ার।

 

 

 

 

 

শশাঙ্ক এই প্রতিবেদককে বলছিলেন, ‘দুই প্রধানমন্ত্রীর সেই বৈঠকে আমিও উপস্থিত ছিলাম। কথাবার্তার শুরুতেই তিনি বেগম জিয়াকে জিজ্ঞেস করলেন, সে কি আপনি এখনও হাঁটুর অপারেশন করাননি? আরে না না, একদম ভয় পাওয়ার কিছু নেই, করিয়ে নিন! আমি ডা. রানাওয়াতকে বলে দেবো, ওনার চেয়ে ভালো এক্সপার্ট এই কাজে আর কেউ নেই।’

 

 

 

 

‘বলেই তিনি নিজের টিমের দিকে ইঙ্গিত করলেন, আমরা একটা কাগজে ডা. চিত্তরঞ্জন রানাওয়াতের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর, ইমেইল ইত্যাদি লিখে বাংলাদেশ টিমের হাতে তুলে দিলাম। একজন বর্ষীয়ান, শুভাকাঙ্ক্ষী অভিভাবকের মতো সেখানেই তিনি খালেদা জিয়াকে পরামর্শটা দিলেন, আর বৈঠকের টেনশনটাও যেন অর্ধেক হালকা হয়ে গেল’, বলছিলেন ভারতের এই সাবেক শীর্ষ কূটনীতিক।

 

 

 

 

 

 

ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পর্যবেক্ষকরা বলে থাকেন, ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে খালেদা জিয়ার আমলেই দুদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ সময়ের মধ্যে দিয়ে গেছে। বাংলাদেশে সে সময় সংখ্যালঘু নির্যাতনের নানা ঘটনা এবং আলফাসহ উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীর নেতাদের বাংলাদেশের মাটিতে আশ্রয় দেওয়াই ছিল সম্পর্কে অবনতির প্রধান কারণ।

 

 

 

 

 

কিন্তু এরমধ্যেও হাঁটুর অপারেশনের পরামর্শ দিয়ে আর বিখ্যাত ভারতীয় ডাক্তারের মোবাইল নম্বর শেয়ার করে খালেদা জিয়ার সঙ্গে অটল বিহারি বাজপেয়ী যে সৌজন্য দেখিয়েছিলেন, সে রকম নজির খুব কম।

 

 

 

 

 

 

ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শশাঙ্কের কথায়, ‘আমি মনে করি ওটাও ছিল আসলে বাজপেয়ীর একটা দারুণ স্মার্ট কূটনৈতিক পদক্ষেপ। বেগম জিয়ার সেদিনের কথা কতটুকু মনে আছে জানি না… কিন্তু ওই একটা মুভ দিয়েই কিন্তু বাজপেয়ী ব্যক্তিগত পর্যায়ে তার শ্রদ্ধা ও সমীহ আদায় করে নিতে পেরেছিলেন, আর ওটাই ছিল তার ট্রেডমার্ক স্টাইল!’