প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:      যুদ্ধ, গণহত্যা বা নির্যাতন যেকোনো মানুষের জন্যেই এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতা। কিন্তু, নারী বা শিশুদের জন্যে এই ভয়াবহতা আরো কয়েকগুণ বেশি। বলা যায়, একজন নারীর জন্যে আশ্রয়কেন্দ্রও যেনো আরেক যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে ওঠে।

 

 

 

 

এর প্রমাণ মিলবে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে গেলেই। আজ শনিবার ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নারী-কিশোরীদের মানবেতর জীবনযাপনের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

 

 

 

 

 

সেখানে কথা হয়, ১৫ বছর বয়সী অন্তঃসত্ত্বা সানজিদার সঙ্গে। সানজিদার বিয়ে হয়েছে আবুল কাশেম নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে। যার বয়স ৬৬ বছর!

 

 

 

 

 

 

অথচ এক বছর আগে সানজিদা মিয়ানমারের রাখাইনে একটা স্কুলে পড়াশুনা করতো। শুধু অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও পরিবারের সবাইকে মেরে ফেলা হয়েছে বলে সানজিদাকে বিয়ে করতে হয়েছে এক বৃদ্ধকে।

 

 

 

 

 

বিবিসির প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলে সানজিদা। সে বলে, ‘ছোট থাকতে কখনো কল্পনাও করি নাই যে, এতো বয়স্ক মানুষকে বিয়ে করবো। কিন্তু করতে হয়েছে। আমার বাচ্চা হবে। আমার চিন্তা, এই লোক তো মারা যাবে, আমি কিভাবে আমার বাচ্চাকে বড় করে তুলবো। আমার স্বামী কোনো কাজ করতে পারেন না। গত এক বছর ধরে আমি ভাত আর ডাল খাচ্ছি। আমরা মাছ-মাংস কিনতে পারি না। আমি আমার সন্তানকে নিয়ে খুবই চিন্তিত।’

 

 

 

 

 

 

 

কথা হয়, সখিনা নামে আরেক নারীর সঙ্গে। তিনি হারিয়ে ফেলেছেন তাঁর ১৩ বছর বয়সী মেয়ে আয়েশাকে। জানা যায়, সখিনার স্বামীকে মিয়ানমার সেনাবাহিনী মেরে ফেলে। এরপরে আয়েশাকে নিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন তিনি। আর তারপরই হারিয়ে ফেলেন মেয়েকে। ধারণা করা হচ্ছে, আয়েশাকে হ্য়তোবা পাচার করে দেওয়া হয়েছে।

 

 

 

 

 

 

 

সখিনা জানেন না, মেয়ে কোথায় আছে। আদৌ কি এ জীবনে দেখতে পাবেন মেয়েকে? তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ের কী হয়েছে জানি না। খালি আল্লাহ জানে। আমার মনে হয় না ওকে আবার দেখতে পাবো। এক বছর হয়ে গেলো। ও যদি আবার ফিরে আসত।’

 

 

 

 

 

এ ধরনের হাজারো গল্প ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে। তবে, এখন সবচাইতে সাধারণ যে গল্প, তা হলো- রোহিঙ্গা নারী-কিশোরীদের যৌনকর্মে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা।

 

 

 

 

 

কেউ কেউ বেঁচে থাকার তাগিদে জড়িয়ে পড়ছেন এ জীবনে। আবার কাউকে বাধ্য করা হচ্ছে। পাচার হয়ে যাচ্ছেন অনেক নারী। আর এর বিশাল অংশটাই হলো কিশোরী।

 

 

 

 

 

কথা হয় রোজিনা নামে এমনই এক কিশোরীর সঙ্গে। যৌন সম্পর্কে জড়াতে না চাইলেও কিছু লোক তাকে ধর্ষণ করে। এরপরই সে যৌনকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করে। এ জীবন থেকে বেরিয়ে নিজ দেশে ফিরতে চায় রোজিনা।

 

 

 

 

রোজিনা বলে, ‘আমি আর কিছু চাই না, শুধু মিয়ানমারে ফিরে যেতে চাই। আমার দেশে ফিরে যেতে চাই। আমার অনেক আপনজন ফেলে এসেছি। এখানে থাকতে আমার ভালো লাগে না। মিয়ানমারে কাটানো জীবনকেই আমি ভালোবাসি। ফিরে গিয়ে সেখানে বিয়ে করতে চাই। সুন্দর একটা পরিবার চাই। এখানে যা করছি, তাই করতে থাকলে আমার জীবন ধ্বংস হয়ে যাবে।’

 

 

 

 

 

 

এই সংখ্যাটা এতটাই বিশাল এবং পরিস্থিতি এত ভয়ঙ্কর হয়ে পড়েছে যে ক্যাম্প এলাকায় শুধু নারীদের জন্যেই রাখা হয়েছে মনোচিকিৎসক।

 

 

 

 

আর খদ্দের হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, স্থানীয় রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে সমাজের প্রভাবশালী পর্যন্ত আছেন।

 

 

 

 

 

ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির লৈঙ্গিক সমতাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ লিসা একেরো বলেছিলেন, ‘যদি বেসরকারি সাহায্য সংস্থাগুলো শরণার্থীদের একেবারে ন্যূনতম প্রয়োজনীয়তাটুকু মেটাতে না পারে, তাহলে নারী-শিশুদের পাচারের শঙ্কা বাড়বে। যদি এখানে টেকসই ব্যবস্থা গড়ে তোলা না যায়,তাহলে ভবিষ্যতে আমরা দেখব এখানে পাচারের ঝুঁকি বাড়ছে।’