প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:      পৃথিবীর অন্যতম হিংস্র প্রাণি হচ্ছে কুমির। প্রায় সাড়ে ৫ কোটি বছর আগে ইওসিন যুগে এরা অন্যান্য ক্রোকোডিলিয়ান প্রজাতির থেকে আলাদা হয়। কুমিরের বেঁচে থাকার জন্য কামড় খুব জরুরী। প্রাপ্ত বয়স্ক একটি কুমিরের কামড়ে দশ টন চাপ সৃষ্টি করে।

 

 

 

 

 

পৃথিবীর বেশিরভাগ হিংস্রপ্রাণি আক্রমণের কলা-কৌশল শিখে পৃথিবীতে এসে। একটি সিংহ বা বাঘের বাচ্ছাকে অনেক দিন তার মায়ের সঙ্গে থেকে শিকারের কলা কৌশলের প্রশিক্ষণ নিতে হয় ।

 

 

 

 

 

কিন্তু এ ক্ষেত্রে কুমির একটু বিচিত্র। পৃথিবীতে আসার আগে সে ডিমের ভেতর থেকেই কামড় দিয়ে শিকার ধরার এই কৌশল আয়ত্ত করতে শেখে। কামড় দেয়া যেন তার জন্মগত স্বভাব।

 

 

 

 

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গড়ে উঠেছে কুমিরের খামার বাংলাদেশেও কুমির চাষে মিলছে সফলতা। কুমিরের খামারে ডিম থেকে কৃত্রিম পদ্ধতিতে ইনকিউবেটরে রেখে বাচ্চা ফোটানো হচ্ছে, বান্দরবনের উখিয়ায় রয়েছে দেশের বৃহৎ কুমিরের খামার ও প্রজনন কেন্দ্র।

 

 

 

 

 

যা আকিজ ওয়াইল্ডলাইফ ফার্মে নামে পরিচিত। ডিম থেকে বাচ্চা ফুটাতে সে খামারের অভিজ্ঞ কর্মচারী নুরুজ্জামান একটার পর একটা ডিমের মুখ খুলে দিচ্ছেন আর কুমিরের বাচ্চা বের হয়ে আসছে।

 

 

 

 

 

ডিমের খোসা একটু খুলে দিতেই বের হয়ে আসছে কুমিরের বাচ্চার মুখ আর এর মধ্যের প্রমাণ দিচ্ছে তার হিংস্রতার। ডিমের খোসার মধ্যে থেকেই কামড় দেয়ার চেষ্টা করছে অথচ সে তখনও শতভাগ পৃথিবীতে আসেনি। সবে মাত্র মুখটা বের হয়েছে। জন্ম নিয়েই পৃথিবীতে পুরুটা শরীর আসার আগেই হিংস্র কামড় বসিয়ে দেয় এমন প্রাণি বিরল।

 

 

 

 

 

সদ্য ফুটতে যাওয়া কুমিরের বাচ্ছার কামড়ের শক্তি এতোটাই যে নিমিষেই একজন মানুষের আঙ্গুল ক্ষত-বিক্ষত করে দিতে পারে। ডিমের ভেতর থেকেই এরা খুব শক্ত দাঁত আর ছোয়াল নিয়ে বের হয়। কুমিড় একটি ভয়ংকর সরীসৃপ প্রাণির ইংরেজি নাম- salt water crocodile বৈজ্ঞানিক নাম crocodylus porosus।

 

 

 

 

প্রাকৃতিকভাবে একটি মা কুমিড় গড়ে ৫০টি ডিম দেয় তবে সর্বোচ্চ ৮০টির মত ডিমও দিতে পারে। একটি মা কুমির ডিম দেয়ার সময় জলাশয়ের পাশের শুকনো জায়গায় আশ্রয় নিয়ে গর্ত খুড়ে সে গর্তেই ডিম পারে।

 

 

 

 

 

ডিম দেয়া শেষ হয়ে গেলে সে গর্ত লতাপাতা, বালু-মাটি দিয়ে ঢেকে দেয়। সেই সময় মা কুমিরটি ডিম পাহারার জন্য গর্তের আশেপাশে থাকে। এমনিতেই হিংস্রপ্রাণি হিসেবে পরিচিত কুমির সে সময় আরও হিংস্র হয়ে উঠে।

 

 

 

 

 

৮৫ দিন থেকে ৩ মাসের ভেতরের ডিম থেকে বাচ্চা বের হয়। কুমিরের বাচ্ছা যেমন জন্মগতভাবে আক্রমণ করা শিখেই পৃথিবীতে আসে তেমনি আরও কিছু অবাক করা তথ্য বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে জানা যায়।

 

 

 

 

কুমির নিয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ গবেষণা করছেন আদনান আজাদ আসিফ। তিনি জানান, কুমির এমন একটি প্রাণি যার লিঙ্গ বিভেদের সেক্স ক্রোমোজোম নেই। ডিম থেকে বাচ্চা পুরুষ হবে নাকি স্ত্রী হবে তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে তাপমাত্রার ওপর।

 

 

 

 

 

গর্তে থাকা ডিমের মধ্যে যে ডিমগুলো তাপমাত্রা বেশি পায় সেগুলো হয় পুরুষ কুমির আর যে ডিমগুলা তাপমাত্রা কম পায় সেগুলো হয় নারী কুমির। কুমিরের ডিম থেকে বাচ্চা বেশির ভাগই নিজে নিজে বের হতে পারে না। কুমিরের বাচ্চা ডিমের ভেতর থেকেই ডাকতে পারে।

 

 

 

 

 

 

৮৫ দিন যাওয়ার পর যখন ২-৩টা ডিম থেকে বাচ্ছা বের হওয়া শুরু করে তখন মা কুমির অন্য ডিম থেকে বাচ্চাদের শব্দ শুনতে পায় তখন কামড় দিয়ে ডিম ভেঙে বাচ্চা বের করে।

 

 

 

 

ডিম ভাঙার এই কামড়কে বলা হয় ‘জেন্ট্রাল বাইট’। জন্মের পর একটি কুমিরের বাচ্চা নিজ থেকেই খাবার সংগ্রহ করতে পারে। তাদের খাবারের তালিকায় রয়েছে সাধারণত পোকা মাকর ও ছোট মাছ ।

 

 

 

 

 

বাণিজ্যিকভাবে যারা কুমিরের চাষ করছেন তারা কৃত্রিমভাবেই ডিম ফুটাচ্ছেন সেক্ষেত্রে ডিম ইনকিউবেটরে রাখা হয়। ৮০-৯০ দিনের মধ্যে বাচ্চা বের হয়। তবে বাচ্ছা পুরুষ কুমির হবে নাকি নারী কুমির হবে তা নির্ভর করে ইনকিউবেটরের তাপমাত্রার ওপর।

 

 

 

 

 

তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রির নিচে হলে ৮০-৯০ ভাগ নারী কুমির ফুটবে আর তাপমাত্রা যদি ৩০ ডিগ্রির বেশি হয় সে ক্ষেত্রে ৮০-৯০ ভাগ পুরুষ কুমির ফুটবে। তবে ৩০.৫ ডিগ্রি থেকে ৩১.০৫ ডিগ্রি তাপমাত্রায় রাখলে প্রায় সমান সমান তফাত থাকে।

 

 

 

 

 

 

তবে পাহারারত হিংস্র কুমিরকে সরিয়ে ডিম ইনকিউবেটর নেয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ সময় অনেক কৌশলে কুমিরকে তাড়িয়ে দিতে হয়। একটু ভুল হলে তার আক্রমণে জীবন চলে যেতে পারে।

 

 

 

 

 

তবে এখানে প্রতি ধাপে ধাপে সতর্ক থাকতে হয়। গর্ত থেকে ডিম সংগ্রহ থেকে শুরু করে ইনকিউবেটর রাখা পর্যন্ত। এ ক্ষেত্রে সামান্য উল্টাপাল্টা হলেই সে ডিম থেকে বাচ্চা বের হওয়ার আর সম্ভাবনা থাকে না।

 

 

 

 

 

দেশে সুন্দরবন ছাড়া দেশে কোথাও কুমিরের দেখা মিলে না। তবে সরকারি ১টিসহ দেশে ৩টি কুমিরের খামার গড়ে উঠছে। যা কিনা জাপান, ফ্রান্স, চীনসহ বেশ কয়েকটি দেশে কুমির বিক্রি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা হচ্ছে।