প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:     কোরবানির চামড়া কালেকশন করাকে অনেকেই কওমি মাদরাসাগুলোর ঐতিহ্য বলে দাবি করেন। ঈদুল আজহায় পরিবার-পরিজনকে পেছনে ফেলে ‘ইলমে দ্বীনের খেদমত’ হবে ভেবে নিজ নিজ মাদরাসার পক্ষে কালেকশন করতে নামেন বর্তমানের অধিকাংশ ‘নায়েবে রাসূল’-আলেমগণ। কিন্তু আমাদের দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট দেখলে অনেকের মনে এ কথা বদ্ধমূল হয়ে যেতে পারে যে, এভাবে পথে পথে ঘুরে কালেকশন করা বুঝি ইসলামের কোন একটি বিধান। দ্বীনি ইলমের চর্চা বাঁচিয়ে রাখতে বুঝি মানুষের দুয়ারে দুয়ারে হাজিরা দেয়ার কোন বিকল্প নেই!

 

 

 

 

 

খোঁজ নিলে দেখা যায়, ব্যাপারটি মোটেও এমন নয়। দেওবন্দি ধারার এমন বহু প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশেও বিদ্যমান আছে যেগুলো চাঁদা কালেকশন না করেও বিকল্প উপায়ে সুশৃঙ্খলভাবে চলছে। এতে বরং সমাজে তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, অতীতের অনেক বড় বড় উলামায়ে কেরামও কওমি মাদরাসার জন্য এ ধরণের কালেকশন করাকে অপছন্দনীয় বলে মত দিয়েছেন। তারা এটাকে মাদরাসার শিক্ষক এবং বিশেষ করে তালিবুল ইলমদের জন্য মানহানিকর বলেও বর্ণনা করেছেন।

 

 

 

 

 

 

আমিরে শরিয়ত মাওলানা মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) বলেন– ‘মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ও ছাত্ররা জাকাত-ফেতরার টাকা, খাস করে কোরবানির চামড়া সংগ্রহ করার জন্য শহরের অলিতে-গলিতে ঘোরাফেরা করে। এটা দ্বীনের জন্য বড়ই বেইজ্জতির কথা। এতে মাদরাসার ছাত্র ও শিক্ষকদের প্রতি মানুষের হেয় দৃষ্টি তৈরি হয়, যা ধর্মের জন্য ক্ষতিকর।’

 

 

 

 

 

তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, মাদরাসা কর্তৃপক্ষের প্রতি বিশেষ অসিয়ত থাকল, তারা যেন ছাত্রদের এভাবে চামড়া সংগ্রহ করতে না পাঠায়। বরং মাদরাসা প্রাঙ্গণে ও শহরের বিভিন্ন জায়গায় ক্যাম্প থাকবে। সেখানে মাদ্রাসাদরদী জনগণ নিজেদের দায়িত্বে চামড়া পৌঁছাবেন। আল্লাহ পাকের ওপর ভরসা করে মাদরাসা চালান। হেয়তাপূর্ণ কাজ বন্ধ করুন।’ (আমিরে শরিয়ত মাওলানা মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর রহ./ লেখক : নাসীম আরাফাত, পৃষ্ঠা : ১৯)

 

 

 

 

 

 

হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলি থানবি (রহ.) বলেন– ‘আলেমদের চাঁদা কালেকশনের দ্বারা দীনের বড় অসম্মানি হচ্ছে। সাধারণ জনগণ মনে করে, আলেমরা বুঝি নিজেদের জন্যই এত দৌড়ঝাঁপ করছে। এ জন্য আমার অভিমত হল, আলেমগণ কিছুতেই চাঁদা কালেকশনে যাবেন না; বরং দীনের কোন কাজ করতে হলে সমাজের গণ্যমান্য ধনাঢ্য ব্যক্তিদের একত্রিত করে বলে দিবেন, দীনের হেফাজতের জন্য অমুক কাজটি করা দরকার। আপনারাও চিন্তা করে দেখুন এর প্রয়োজন রয়েছে কিনা।

 

 

 

 

যদি আপনাদের দৃষ্টিতেও প্রয়োজনীয় মনে হয় তাহলে সকলে মিলে এ কাজটি আঞ্জাম দেওয়ার ব্যবস্থা করুন… আলেমগণ মূল কাজ করবেন। সম্পদশালীগণ অর্থের যোগান দিবেন। আর যদি সমাজের গণ্যমান্য ধনাঢ্য ব্যক্তিরা বলে এ কাজের প্রয়োজন নেই; বরং এটি অনর্থক তাহলে আলেমদের পক্ষে চাঁদা কালেকশনের প্রয়োজন নেই। সে কাজ বন্ধ করে ঘরে বসে থাকবেন। ব্যবসা, চাষাবাদ কিংবা অন্য কোন পেশায় লিপ্ত হোন এবং অবসর সময় যতটুকু সম্ভব দীনের কাজ করুন… আমার মতে আলেমদের দ্বারা চাঁদা কালেকশন করাবেন না। তাদেরকে চাঁদা আদায়ের কাজে নিযুক্ত করবেন না। এতে তাদের গুরুত্ব ও মর্যাদা কমে যায়। (আল-ইলমু ওয়াল-উলামা। অনুবাদ : আব্দুল গাফ্ফার শাহপুরী। পৃষ্ঠা : ৩১০-৩১১)

 

 

 

 

 

 

তিনি আরো বলেন- ‘আল্লাহর কসম করে বলছি, আলেমগণ যদি ধনীদের কাছ থেকে বিমুখ হয়ে যান যেমন কিনা-আলহামদুলিল্লাহ-আহলে হক বিমুখ রয়েছেন তাহলে বড় বড় অহংকারীরাও তাদের সামনে মাথা নিচু করতে বাধ্য হবে। আলেমদের জন্য এটাই উত্তম যে, যদি কোনো দুনিয়াদার তাদেরকে কোনো কিছু হাদিয়া দেয় তো গ্রহণ করতে অসম্মতি জানাবেন। বস্তুত, আলেমদের অস্তিত্ব তো এমন ‘মাহবুব’ ও প্রিয় ছিল যে, কারো ঘরে গেলে তার জন্য ঈদের দিন বলে গণ্য হত। কিন্তু আফসোস! আজ ‘ঈদের দিনে’র বদলে ‘ভীতির দিন’ হয়ে গেছে। এ অবস্থা সৃষ্টির নেপথ্যের নায়ক ( !) হল কিছু লোভী আলেম। তাদের কারণে এখন আলেমরূপী কাউকে দেখলেই মনে করে কিছু চাইতে এসেছে বুঝি।’ (প্রাগুপ্ত)

 

 

 

 

 

 

আল্লামা সুলতান যওক নদবি (দা.বা.) তাঁর আত্মজীবনী ‘আমার জীবনকথা’য় লিখেছেন– ‘হজরত মাওলানা হারুন বাবুনগরী (মৃত্যু ১২ই জিলহজ্ব ১৪০৫হিঃ) ছিলেন একজন উঁচুমাপের মুতাওয়াক্কিল। সৃষ্টি থেকে বিমুখতা ও আল্লাহ নির্ভরশীলতা তাঁর প্রতিটি কথাবার্তা ও চালচলনে প্রকাশ পেত। মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে হুজুর বলেন, শুরুর পনের ষোল বছর আমি কারো কাছ থেকে চাঁদা চাইনি। আজও আমি শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে বলি যে, ছাত্র ও শিক্ষকরা যেন কোন চাঁদার জন্য কারো কাছে না যায়। আল্লাহ পাক বর্তমান অবস্থার চাইতে ভালো চালাবেন। কিন্তু আমার এ কথার উপর তারা আস্থা রাখতে পারছে না। মাদরাসার অর্থনৈতিক মন্দা অবস্থায়ও হুজুর শহরে বন্ধু-বান্ধবদের কাছে চাঁদার জন্য অথবা মাদ্রাসার কোন প্রয়োজনীয়তার কথা প্রকাশ করতে যান নি। বিদেশেও কাউকে পাঠানোর চিন্তা করেননি।

 

 

 

 

 

একবার হজ সফরে কেউ হুজুরকে বলল, হুজুর! মাদ্রাসার প্রয়োজনীয়তার কথা বললে অনেক সহযোগিতা পাওয়া যেত। তখন হুজুর বললেন, আমি এখানে মানুষের কাছে আসিনি। এসেছি আল্লাহর দরবারে হাজিরা দেবার জন্য। তাঁর কাছে যদি মাদরাসা কবুল হয়ে যায় তা-ই যথেষ্ট নয় কি? (পৃষ্ঠা : ১১২)

 

 

 

 

 

 

বিশিষ্ট বাংলা সাহিত্যিক মাওলানা আবু তাহের মিসবাহ (দা.বা.) বলেন– ‘মানুষের কাছে দ্বীনের খাদেমরা কিছু চাবে, এটা তো হতেই পারে না। আর যদি চাওয়া ছাড়া কেউ কিছু দিতে চায় তবে দেখো তার উদ্দেশ্য কী। যদি তার উদ্দেশ্য হয় তোমার প্রয়োজন পূর্ণ করা তোমার প্রতি রহম করা তাহলে বলো, আমার (বা আমাদের প্রতিষ্ঠানের) আপনার কাছে কোন প্রয়োজন নেই। আমাদের প্রয়োজন আল্লাহই দেখবেন। আর যদি তার উদ্দেশ্য হয় দ্বীনের খেদমত করে নিজে সৌভাগ্যবান হওয়া, আখেরাতের জন্য কিছু ছামান যোগাড় করা তবে তাকে ফিরিয়ে দেয়ার কারও অধিকার নেই।’ (জীবন পথের পাথেয়, পৃষ্ঠা : ১৫৩)