প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:     নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি) রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভারতীয় সীমান্ত এলাকায় আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এ দুই জেলার সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে আসছে তাদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একের পর এক অভিযানের পরও পদ্মা নদীর ওপারের চরাঞ্চল থেকে জঙ্গিদের নির্মুল করা যাচ্ছে না।

 

 

 

 

 

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, অবৈধপথে সহজে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকায় জঙ্গিরা সীমান্ত এলাকায় আস্তানা গাঁড়ছে। এছাড়া দুর্গম এলাকা হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি এড়িয়ে নিরাপদে কার্যক্রম পরিচালনা এবং সীমান্ত পথে ভারত থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ আমদানির কথা বিবেচনায় রেখেও জঙ্গিরা এসব এলাকায় অবস্থান করছে। তবে এখন বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি।

 

 

 

 

 

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার দক্ষিণ পাশ দিয়ে পদ্মা নদী প্রবাহিত। নদীর ওপারে গোদাগাড়ীর চর আষাড়িয়াদহ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার চর কোদালকাটি ইউনিয়ন। ভারতীয় সীমান্ত লাগোয়া দুর্গম এ দুটি ইউনিয়নে এখন জঙ্গিদের আনাগোনা। ছদ্মবেশে তারা এলাকায় অবস্থান নিয়ে নানা কৌশলে চালিয়ে যাচ্ছে সাংগঠনিক কার্যক্রম। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে এই চর থেকে জেএমবির পাঁচ জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব।

 

 

 

 

 

 

তারা হলো, গোদাগাড়ী উপজেলার আলীপুর বারইপাড়া গ্রামের জামাল উদ্দিনের ছেলে আমিনুল ইসলাম (৩২), চর বোয়ালমারী আদর্শগ্রামের মকবুল হোসেনের ছেলে মোশাররফ হোসেন ওরফে মুরসালিন (২২), চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার পশ্চিম কোদালকাটি মধ্যচরের রুস্তম আলীর ছেলে রফিকুল ইসলাম (৪০), গোলাম রব্বানীর ছেলে ইসমাইল হোসেন (৩০) এবং আইনুদ্দিন মন্ডলের ছেলে আবদুল মতিন (৪০)। এদের মধ্যে আমিনুল জেএমবির গোদাগাড়ীর সমন্বয়কের দায়িত্বে ছিলেন।

 

 

 

 

 

গ্রেপ্তার এসব জঙ্গিদের কাছ থেকে ম্যাগজিন ও চার রাউন্ড গুলিসহ একটি বিদেশী পিস্তল, ২০০ গ্রাম গারপাউডার, সাতটি হ্যান্ডনোট, চারটি জিহাদী বই, দুটি করে মোমবাতি, মুঠোফোন ও মেমোরিকার্ড, তিনটি সীমকার্ড এবং একটি করে পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্রসহ বোমা তৈরির নানা সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে। গ্রেপ্তার পাঁচজনের মধ্যে আমিনুল ইসলাম জেএমবির স্থানীয় সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছিলেন বলে জানিয়েছে র‌্যাব।

 

 

 

 

 

র‌্যাবের মেজর এএম আশরাফুল ইসলাম বলেন, ১৩ ও ১৪ মে রাজশাহী এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে জেএমবির চার সক্রিয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানায়, আমিনুল নামের এক ব্যক্তি গোদাগাড়ী এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকায় জেএমবির সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছেন। তার নির্দেশ মতোই পরিচালিত হচ্ছে সাংগঠনিক কার্যক্রম। এ তথ্য পাওয়ার পর আমিনুলের খোঁজে নামেন র‌্যাবের গোয়েন্দারা।

 

 

 

 

 

 

অবশেষে র‌্যাব জানতে পারে, চর বোয়ালমারী এলাকায় অবস্থান করছেন জেএমবি নেতা আমিনুল। সেখানে অভিযান চালিয়ে আমিনুল ও মোশাররফকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের চর কোদালকাটিতে অভিযান চালিয়ে অন্য তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা সবাই জেএমবিতে সক্রিয় থাকার অভিযোগ স্বীকার করেছেন। তাই তাদের সবার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও জানান মেজর আশরাফুল ইসলাম।

 

 

 

 

 

র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে জেএমবির স্থানীয় সমন্বয়ক আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন. মামা আবু সাঈদের (পলাতক জেএমবি নেতা) মাধ্যমে তিনি জেএমবিতে যোগ দেন। যোগদানের পর তিনি গোদাগাড়ী উপজেলা সদরে ছদ্মবেশে সুতার ব্যবসা করতেন। এর আড়ালে তিনি সংগঠনের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ১৩ ও ১৪ মে ২০১৮ তার সংগঠনের সক্রিয় কিছু সদস্য র‌্যাবের হাতে ধরা পড়ার পর চরাঞ্চলে অবস্থান নেন। এ সময় তিনি সীমান্তবর্তী এলাকা বগচর, চর কোদালকাটি, চর বোয়ালমারী ও মধ্যচরে সংগঠনের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিলেন। সেখান থেকেই তিনি জেএমবি সদস্যদের বিভিন্ন নির্দেশনা, ইয়ানতের টাকা ও উগ্রবাদী বই সংগ্রহ এবং বিতরণ করতেন।

 

 

 

 

 

 

আমিনুলের সহযোগী মোশারফ হোসেন হোসেন র‌্যাবকে জানিয়েছেন, ২০১৫ সালের শুরুর দিকে সুতা কিনতে গিয়ে তার আমিনুলের সঙ্গে পরিচয় হয়। পরবর্তীতে তার মাধ্যমে তিনিও জেএমবিতে যোগ দেন। মোশাররফ জেএমবির পলাতক সদস্যদের চরাঞ্চলে আশ্রয় দিতেন। সীমান্তের খুব কাছে বাড়ি হওয়ার কারণে তিনি জেএমবি সংগঠনের সদস্যদের সীমান্ত পারাপারে সহায়তা করতেন। এছাড়া ভারত থেকে সংগঠনের জন্য অস্ত্র এবং বিস্ফোরক দ্রব্য আমদানি করতেন। গ্রাম্য চিকিৎসকের পেশার আড়ালে তিনি চরাঞ্চলে সংগঠনকে চরাঞ্চল থেকে নিয়মিত ইয়ানতের টাকা সংগ্রহ করে দিতেন। নানা প্রলোভনে সরলমনা মানুষকে সংগঠনে যোগ দেওয়ারও দাওয়াত দিতেন তিনি।

 

 

 

 

 

গত বছরের নভেম্বরে চর কোদালকাটির পাশের চর আলাতুলিতে জঙ্গিদের একটি আস্তানার সন্ধান পায় র‌্যাব। পাঁচ বছর আগে জেগে ওঠে চরটি। এলাকবাসীর কাছে চরটি ‘মধ্যচর’ নামে পরিচিত। নদীপাড় থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে ফাঁকা মাঠের এই চরে থেকে পশুপালন ও ফসল ফলানোর জন্য একটিমাত্র বাড়ি করেছিলেন গোদাগাড়ীর আদর্শ গ্রামের বাসিন্দা রাশিকুল ইসলাম। অভিযানের ১৫ দিন আগে পাখি শিকারের জন্য অবস্থান করার কথা জানিয়ে দুই ব্যক্তি বাড়িটি ভাড়া নিয়েছিলেন। সেখানে র‌্যাবের অভিযানে তিনজন নিহত হন। উদ্ধার হয় বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরকদ্রব্য।

 

 

 

 

 

 

এর কিছুদিন আগে গোদাগাড়ীর বেনিপুর গ্রামে ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার ত্রীমহোনী গ্রামে দুটি জঙ্গি আস্তানার খোঁজ পায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ দুটি জঙ্গি আস্তানায় অভিযানে কয়েকজন জঙ্গি নিহত হন। এর মধ্যে বেনীপুরের আস্তানায় নিয়মিত যাতায়াত ছিল জেএমবির শীর্ষনেতা সোহেল মাহফুজ ওরফে হাতকাটা সোহেলের। পরবর্তীতে তাকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে যাওয়ার জন্য তিনি এ এলাকায় অবস্থান করছিলেন বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

 

 

 

 

সরকারি একটি গোয়েন্দা সংস্থার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সীমান্তে অবস্থান নিয়ে জঙ্গিরা এখন জাল নোট, সোনা ও মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। পাচারকাজে তারা ভারতের রাণীনগর, লালগোলা, ভগবানগোলা ও বাংলাদেশের মুকসেদপুর, খরচাকা, চর আষাড়িয়াদহ, মানিকচক, কোদালকাটি, আলাতুলী, হাকিমপুর, শিবগঞ্জ, কিরণগঞ্জ, বালিয়াদীঘি, তেলকুপি, মনাকষা, মাধবপুর, সিংনগরসহ কয়েকটি সীমান্তকে নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করছে। অবৈধ কারবার থেকে আয় করা টাকা জঙ্গি কর্মকাণ্ডে ব্যয় করা হচ্ছে।

 

 

 

 

 

সূত্র জানায়, জঙ্গিরা মাদক, অস্ত্র, বিস্ফোরক ও সোনা চোরাচালানের জন্য মাদ্রাসার ছাত্র, মসজিদের মুয়াজ্জিন, ঈমাম এবং দাড়িওয়ালা ব্যক্তিদের টার্গেট করছে, যাতে তাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সন্দেহ না করে। অনেকেই লোভে পড়ে অস্ত্র, সোনা ও মাদক বহনে জড়িয়ে পড়ছেন। আর এভাবেই কেউ কেউ জড়িয়ে পড়ছেন জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে। তবে বর্তমানে সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে দাবি করেছেন বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা।

 

 

 

 

 

 

র‌্যাব-৫ এর মেজর এএম আশরাফুল ইসলাম বলেন, সীমান্ত এলাকায় আগের চেয়ে অনেক বেশি গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এ জন্য মাঝে মাঝেই সেসব এলাকা থেকে আমরা জঙ্গিদের ধরতে পারছি। তবে সীমান্ত পথে যাতায়াত এবং চোরাচালান বন্ধে অন্য বাহিনীকেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে, বিশেষ করে যারা সীমান্ত এলাকায় দায়িত্বে আছেন। তাহলে সীমান্ত এলাকায় জঙ্গিদের আনাগোনা কমবে।

 

 

 

 

 

 

 

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ১ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক শামীম মাসুদ আল ইফতেখার বলেন, সীমান্তে চোরাচালান এবং জঙ্গি কার্যক্রম বন্ধে আমরা সব সময় কঠোর অবস্থানে আছি। সোমবার বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল সাফিনুল ইসলাম চর আষাড়িয়াদহ এলাকার দুটি বর্ডার আউট পোস্ট (বিওপি) পরিদর্শন করেছেন। তিনি কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন। আমাদের সদস্যরা সে অনুযায়ী কাজ করছেন।