প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:    বাবা গ্রামের ভ্যানচালক। তিন ভাই-বোনের মধ্যে সবচেয়ে জেমি (ছদ্মনাম) বড়। নিজেদের জমিজমা না থাকায় পরের জমিতে তাদের বাস। ঘর বলতে একটা চালা ঘর। বছর দেড়েক আগের কথা, গ্রামের এক দালালের খপ্পরে পড়ে মাত্র ১০ হাজার টাকায় ২০১৬ সালের ১৫ অক্টোবর জর্ডানে পাড়ি জমান জেমি।

 

 

 

 

 

জর্ডানে যাওয়ার পর সেখানে একটি বাসায় বাসাবাড়ির কাজও নেন জেমি। এরই ফাঁকে সেখানে সোনিয়া নামের এক নারীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। প্রথম পরিচয়েই সোনিয়া তাকে বেশি বেতনে চাকরির প্রলোভন দেখান।

 

 

 

 

 

এতে জেমিও রাজি হয়ে যান। পরে জেমিকে সোনিয়া তার বাসায় তুলে খারাপ কাজে বাধ্য করেন। সম্প্রতি দেশে ফিরে জেমি জানতে পারেন তিনি অন্তঃসত্ত্বা।

 

 

 

 

 

 

বলছিলাম মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলার জেমির কথা। জর্ডানের স্বপ্ন তার সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। গেল ঈদুল আজহার পরদিন একটি মেয়ে সন্তান প্রসব করেছেন জেমি।

 

 

 

 

 

কিন্তু তার আগে জর্ডান থেকে গ্রামে ফিরে জেমিকে গ্রামবাসীর কটুকথা আর মানসিক নির্যাতন সইতে হয়েছে। তাকে ও তার পরিবারকে গ্রামছাড়ার হুমকিও দেওয়া হয়। তবে আশার কথা, সেই অবস্থা এখন স্বাভাবিক পরিস্থিতির দিকে এগুচ্ছে। তার পরিবারও সেই শিশুটিকে স্বাভাবিকভাবে নিয়েছে।

 

 

 

 

 

জেমির ভাষ্য, ‘সোনিয়া আমার সর্বনাশ করছে কিন্তু এই নিষ্পাপ বাবুটা তো করে নাই।’

 

 

 

 

 

নির্যাতিত নারী জেমি জানান, জর্ডান যাওয়ার পর তিন মাস একটি বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করেন তিনি। সেখানে একদিন বাসার বাইরে ময়লা ফেলতে গিয়ে মানিকগঞ্জের একই উপজেলার সোনিয়ার সঙ্গে তার পরিচয় হয়।

 

 

 

 

সেই প্রথম পরিচয়ে তাকে সোনিয়া ভালো বেতনে অন্য বাসায় চাকরির প্রলোভন দেখান। জেমিও রাজি হয়ে তার বাসায় ওঠেন। কিন্তু পরে তাকে দিয়ে সোনিয়া খারাপ কাজ করাতে শুরু করেন। এভাবেই কেটে যায় দেড় বছর।

 

 

 

 

এর ফাঁকে একদিন জেমি তার বাসা থেকে পালিয়ে এলেও পরে তাকে আবারও খুঁজে বের করে বাসায় নিয়ে যান সোনিয়া। চলতি বছর সোনিয়া বাজার করতে গেলে কোনোভাবে দেশটির পুলিশ জানতে পারে তার বাসায় বাঙালি রয়েছে।

 

 

 

 

 

 

পরে সেখান থেকে জেমিসহ আরও ২০ নারীকে উদ্ধার করে পুলিশ। গেল রজমানে জেমিকে দেশে পাঠানো হয়। দেশে ফিরে তিনি একটি ক্লিনিকে পরীক্ষা করে জানতে পারেন তিনি অন্তঃসত্ত্বা। গত ২৩ আগস্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একটি কন্যা সন্তান জন্ম দেন জেমি।

 

 

 

 

জেমি বলেন, ‘সোনিয়া আমারে দিয়া খারাপ কাজ করাইত। তারে কইতাম, আপা আমারে টেকা দেন, বাড়িতে পাঠামু, কিন্তু সে দিত না। কিচ্ছু খাইতে দিত না। খালি কিছু কইলেই মারত। বাড়িতে ফোনও করতে দিত না। সে আমার সর্বনাশ করছে। তার ফাঁসি চাই আমি।’

 

 

 

 

 

টানা দেড় বছর পরিবারের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ ছিল না জেমির। ফলে চিন্তায় পড়ে তার পরিবারও। বাধ্য হয়ে জেমির বাবা সিঙ্গাইর থানায় একটি মানব পাচার মামলা করলে জর্ডান পাঠানো সেই দালালকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

 

 

 

 

 

 

 

কিন্তু সেই দালাল নয়, জর্ডানে থাকা সোনিয়া নামের এক নারী যে জেমিকে আটকে রেখে এত্তসব করছে, তখনো বিষয়গুলো অজানা ছিল পুলিশের। দেশে ফিরে জেমি প্রশাসনকে সবকিছু জানান।

 

 

 

 

জর্ডানে যৌনকাজে বাধ্য করার অভিযোগে গত ২৮ আগস্ট জেমির বাবা বাদী হয়ে জর্ডানে বসবাসরত সিঙ্গাইর উপজেলার চর-চান্দহর গ্রামের সোনিয়া আক্তার ওরফে রাবিয়া, তার বাবা লেহাজুদ্দিন, মা জরিনা বেগম, স্বজন আয়েশা আক্তার ও ধর্ষক ভারতীয় নাগরিক গরজিদকে আসামি করে সিঙ্গাইর থানায় মামলা দায়ের করেন।

 

 

 

 

 

সে মামলায় সোনিয়ার বাবা-মাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এখন শুধু অপেক্ষা সোনিয়াকে গ্রেফতার করে দেশে ফেরত আনার। তবে মামলার পর উল্টো হুমকি সহ্য করতে হয়েছে জেমির পরিবারকে।

 

 

 

 

 

 

 

সোনিয়ার পক্ষে স্থানীয় কিছু ব্যক্তি এসে বারবার মামলা তুলে নেওয়ার জন্য তার বাবা ও পরিবারকে বিভিন্নভাবে চাপ দিচ্ছেন বলে জানান জেমির বাবা।

 

 

 

 

 

জেমির বাবা তাবারক মিয়া (ছদ্মনাম) বলেন, ‘মাইয়াটা যখন বিদ্যাশ গেল তার কোনো খুঁজ পাই না। সোনিয়ারে বারবার ফোন করি কিন্তু সেও কিছু কয় না। খালি কইত, চাচা আপনার মাইয়া অনেক টেকা পাঠাইতে পারব। শ্যাষে জানলাম সে আমার মাইয়াটার সর্বনাশ করছে। আমি এ্যার বিচার চাই।

 

 

 

 

 

যখন মাইয়াটা দ্যাশে ফিরল, গেরামে কত জন কত কিছু কইত। এহন আর কয় না। পুলিশ আসছিল। হেরা আমাগো কইছে তারা নাকি বাবুটার দেখাশুনা কইরব। আপনে কন, আপনার মাইয়ার যদি এমন সর্বনাশ হইত, কী করতেন?

 

 

 

 

 

এ ঘটনার সর্বশেষ খবর হলো, জেমির পাশে দাঁড়িয়েছে মানিকগঞ্জ পুলিশ প্রশাসন। গতকাল ৩ সেপ্টেম্বর, সোমবার দুপুরে পুলিশ সুপার (এসপি) রিফাত রহমান শামীম ও সিঙ্গাইর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তাদের বাড়িতে গিয়েছিল।

 

 

 

 

 

 

সেখানে তারা জেমি ও তার সন্তানের খোঁজখবর নেন এবং জেমির পরিবারকে ৫০ হাজার টাকার অনুদান দেন এসপি। আশ্বাস দেন সবসময় পাশে থাকার।

 

 

 

 

 

পুলিশ সুপার রিফাত রহমান শামীম বলেন, ‘মেয়েটির পরিবারকে কিছু আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে এবং তারা যাতে আত্মসম্মান নিয়ে সমাজে বসবাস করতে পারেন, সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

 

 

 

সিঙ্গাইর থানার ওসি খোন্দকার ইমাম হোসেন বলেন, এ ঘটনায় মামলা হওয়ার পর সোনিয়ার বাবা-মাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সোনিয়াকে দেশে ফেরত আনার জন্য আইনগত প্রক্রিয়া শুরু করেছি।

 

 

 

 

 

এ ছাড়া যে ভারতীয় নাগরিক তার সর্বনাশ করেছে, তার পাসপোর্ট থেকে তথ্য নেওয়ার চেষ্টা চলছে। তাকেও আইনের আওতায় আনা হবে। আর এ মামলায় যারা জড়িত, সবার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে।

 

 

 

 

 

 

 

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন বিভাগের হেড অব প্রোগ্রাম শরিফুল হাসান বলেন, মেয়েটি দেশে ফেরার পর তার পরিবার অনেক চাপে ছিল। সে পরিস্থিতি থেকে তারা বেরিয়ে এসেছে। এ ঘটনায় মামলার পর সোনিয়ার বাবা-মাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।