প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:    ম্যাচের শুরুতে নিশ্চয়ই অনেক দর্শক টিভির সামনে থেকে উঠে গিয়েছিলেন। কারণ বাংলাদেশের টপ অর্ডারের হতশ্রী ব্যাটিং আর তামিম ইকবালের চোট- হতাশ করে দিয়েছিল টাইগার শিবিরকে। কিন্তু তারপর লেখা হলো রূপকথা। প্রতিরোধ গড়লেন মুশফিক-মিথুন। মুশি খেললেন ক্যারিয়ারসেরা ইনিংস। ইনিংসের শেষ দিকে দেখা গেল এক আবেগময় দৃশ্য। আঙুলে ব্যান্ডেজ নিয়ে মুশফিককে সঙ্গ দিতে নামলেন তামিম ইকবাল! চোখে জল চলে এল দর্শকদের!

 

 

 

 

 

৯ম উইকেট পড়ে যাওয়ার পর তামিমের মতো সাহসী সঙ্গী পেয়ে ঝলসে উঠলেন মুশফিক। ১৬ বলে তুলে নিলেন ৩২ রান। তার ১৪৪ রানের ইনিংসের যোগ্য মর্যাদা দিতে বল হাতে ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠলেন মাশরাফি, মুস্তাফিজ, মিরাজরা। ব্যাটে বলে অসাধারণ পারফরমেন্স দেখিয়ে ১৩৭ রানের বিশাল জয় দিয়ে এশিয়া কাপ শুরু করল টিম টাইগার।

 

 

 

 

 

২৬২ রানের জয়ের টার্গেটে ব্যাটিংয়ে নেমে বাংলাদেশের পেস আক্রমণের শিকার হয় লঙ্কানরা। পুঁজি লড়াকু হলেও এই স্কোর নিয়ে জয় পেতে হলে যা করা দরকার ঠিক সেই কাজটাই করে দেন অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা আর মুস্তাফিজুর রহমান। ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারে প্রথম আঘাত হানেন মুস্তাফিজ। লেগ বিফোরের ফাঁদে পড়েন কুসল মেন্ডিস (০)। পরের ওভারে এসেই উপুল থারাঙ্গার (২৭) স্টাম্প উপড়ে দেন ম্যাশ।

 

 

 

 

ফিরতি ওভারে এসেই ০ রানে ধনাঞ্জয়া ডি সিলভাকে এলবিডাব্লিউ করে প্যাভিলিয়নের পথ ধরিয়ে দেন টাইগার ক্যাপ্টেন। অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুজকে নিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করেছিলেন কুসল পেরেরা। তাকে ব্যক্তিগত ১১ রানে এলবিডাব্লিউ করে দেন তরুণ ঘূর্ণি তারকা মেহেদী হাসান মিরাজ। ৩৮ রানে ৪র্থ উইকেটের পতন ঘটে শ্রীলঙ্কার।

 

 

 

 

 

মিরাজের বলে ক্যাচ দিয়ে বেঁচে গেলেও বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি দাসুন শানাকা। সেই মিরাজের বলেই সাকিবের দুর্দান্ত থ্রোতে ৭ রান করে রান-আউট হয়ে যান তিনি। আরেক পেস তারকা রুবেল হোসেন মঞ্চে এসেই শিকার করেন লঙ্কান ক্যাপ্টেন অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুজকে (১৬)। তখনও বাংলাদেশের চিন্তার কারণ হয়ে ছিলেন থিসারা পেরেরা। কিন্তু ঝড় তোলার আগেই ব্যক্তিগত ৬ রানে মিরাজের বলে ধরা পড়লেন রুবেলের হাতে।

 

 

 

 

 

দিলরুয়ান পেরেরার সঙ্গে নাইটওয়াচম্যান সুরঙ্গা লাকমাল জুটি গড়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু লাকমালকে বেশিদূর যেতে দেননি মুস্তাফিজ। ২০ রানেই তাকে বোল্ড করে দেন ‘কাটার মাস্টার’। জয় তখন কেবল সময়ের অপেক্ষা। দিলরুয়ান পেরেরাকে (২৯) মোসাদ্দেক আর আপসনোকে সাকিব প্যাভিলিয়নে ফেরত পাঠালে ৩৫.২ ওভারে ১২৪ রানেই অল-আউট হয়ে যায় লঙ্কানরা। ১৩৭ রানের দুর্দান্ত জয় তুলে নেয় মাশরাফি বাহিনী।

 

 

 

 

এর আগে দুবাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে টসে জিতে ব্যাটিংয়ে নেমে বিপদে পড়ে বাংলাদেশ। ইনিংসের প্রথম ওভারের পঞ্চম বলে লিটন দাসকে (০) কুসল মেন্ডিসের তালুবন্দি করেন ১ বছর পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরা গতিদানব লাসিথ মালিঙ্গা। অফ স্টাম্পে পিচ করা বল একটু বেরিয়ে যাচ্ছিল। লিটন চেষ্টা করেছিলেন সামনের পায়ে ডিফেন্স করার। বল তার ব্যাটের কানায় লেগে যায় প্রথম স্লিপে মেন্ডিসের হাতে।

 

 

 

 

পরের বলেই স্টাম্প উড়ে যায় সাকিব আল হাসানের (০)। সুইং করে ভেতরে ঢোকা বলটি যেন চমকে দিয়েছিল সাকিবকে। এক বছর পর ওয়ানডে ক্রিকেটে স্বপ্নের মতো ফেরা হলো লাসিথ মালিঙ্গার। বাংলাদেশের জন্য আরও বড় এক ধাক্কা হলো তামিমের আহত হয়ে প্যাভিলিয়নে ফেরা। ইনজুরি আক্রান্ত তামিম সুরাঙ্গা লাকমলের বাউন্সের পুল করতে চেয়েছিলেন। বল গ্লাভসে লেগে আহত হয়ে মাঠ ছাড়েন তিনি।

 

 

 

 

মহাবিপদের মধ্যে জুটি গড়ে তোলেন মুশফিকুর রহিম এবং মোহাম্মদ মিঠুন। দ্রুত উইকেটে মানিয়ে নেওয়া এই দুজনের জুটি একসময় পঞ্চাশ ছাড়িয়ে যায়। ঘুরতে থাকে রানের চাকা। ৫২ বলে ক্যারিয়ারের প্রথম হাফ সেঞ্চুরি পূরণের পর ৬৮ বলে ৫ চার ২ ছক্কায় ৬৩ রান করে মিথুন লাসিথ মালিঙ্গার তৃতীয় শিকার হলে বিপদে পড়ে বাংলাদেশ। ভাঙে ১৩১ রানের দুর্দান্ত এক জুটি।

 

 

 

 

পরবর্তী ব্যাটসম্যান মাহমুদ উল্লাহ রিয়াদ ৪ বলে ১ রান করে প্যাভিলিয়নে ফিরেন। ফিরতি ওভারে এসে আবারও ছোবল মারেন মালিঙ্গা। তার শর্ট বল মোসাদ্দেকের (১) ব্যাটের কানায় লেগে কিপারের গ্লাভসে চলে যায়। এরপর মুশফিকের সঙ্গে ৩৩ রানের জুটি গড়ে আশা জাগাচ্ছিলেন মিরাজ। কিন্তু স্ট্রেইট ড্রাইভ খেলতে গিয়ে সুরঙ্গা লাকমলের বলে তারই দুর্দান্ত ক্যাচের শিকার হন ১৫ রান করা এই অল-রাউন্ডার।

 

 

 

 

দলের এমন বিপর্যয়ে অনেক বার লোয়ার অর্ডার থেকে আশা জাগিয়েছেন অধিনায়ক মাশরাফি। তবে আজ পারলেন না। ১১ রান করে ধনাঞ্জয়া ডি সিলভাকে উড়িয়ে মারতে গিয়ে ধরা পড়লেন উপুল থারাঙ্গার হাতে। মুশফিক যখন সেঞ্চুরি থেকে ৪ রান দূরে, তখন ধনাঞ্জয়া ডি সিলভার বলে এলবিডাব্লিউ হয়ে যান রুবেল হোসেন (২)।

 

 

 

 

 

ধ্বংসস্তুপে দাঁড়িয়ে অনবদ্য ব্যাটিংয়ে ক্যারিয়ারের ৬ষ্ঠ ওয়ানডে সেঞ্চুরি তুলে নেন ‘মি. ডিপেন্ডেবল’ খ্যাত মুশফিকুর রহিম। তিনি যখন ১২৩ বলে ৭ চার ১ ছক্কায় তিন অংকে পৌঁছলেন, তখন শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে তাকে সঙ্গ দিয়ে যাচ্ছেন মুস্তাফিজুর রহমান। মুস্তাফিজ ১০ রান করে রান-আউট হওয়ার পর বাংলাদেশের ইনিংস শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভাঙা আঙুলে ব্যান্ডেজ নিয়ে আবারও মাঠে নামেন তামিম।

 

 

 

 

দেশসেরা ওপেনারকে পেয়ে আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠেন মুশফিক। বাউন্ডারির ফুলঝুরি ছুটতে থাকে। থিসারা পেরেরার করা শেষ ওভারের তৃতীয় বলে কুসল মেন্ডিসের হাতে ধরা পড়ার আগে মুশফিকের সংগ্রহ ১৫০ বলে ১১ বাউন্ডারি এবং ৪ ওভার বাউন্ডারিতে ১৪৪ রান। এটা তার ক্যারিয়ারসেরা ইনিংস। তাকে সঙ্গ দিতে আসা তামিম অপরাজিত থাকেন ২ রানে। ২৬১ রানে অল-আউট হয় বাংলাদেশ।