প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:    শুরুটা করি সুনামগঞ্জের পাঁচটি আসন দিয়েই, যদিও একই চিত্র বৃহত্তর সিলেটসহ সারাদেশে। সম্ভবত গত পরশুদিন সুনামগঞ্জের পাঁচটি আসন নিয়ে দৈনিক জনকন্ঠ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির নির্বাচনী হালচাল তুলে ধরেছে। বিষয়টি নতুন তা কিন্তু নয় পুরনো ব‍্যাধি। এবং জননেত্রী শেখ হাসিনাসহ কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ ভালোই অবগত আছেন।

 

 

 

 

 

গত ফেব্রুয়ারিতে বিলেত সফরকালে আমাদের সাথে একান্ত বৈঠকে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ডাঃ দীপু মনি ক্ষোভ ও আক্ষেপের সাথে বলেছিলেন, “সবাই চিন্তা করে ৩০০ আসনের মধ্যে সরকার গঠনের জন্য দেড় শতাধিক আসনে জিতলেই হবে। সুতরাং আমাদের আসনে নৌকা হেরে গেলে কিচ্ছু হবে না। আর এই চিন্তাটি ৩০০ আসনের অধিকাংশ নেতাকর্মীদের, যারা ভাই-দাদা লীগে বিভক্ত। এই যে অসুস্থ, অশুভ ও ব‍্যক্তিস্বার্থ কেন্দ্রিক চিন্তা এটাই হলো সবচেয়ে মাথাব্যথা, ভয়াবহ ও আওয়ামী লীগের জন্য মারাত্মক অশনি সংকেত।”

 

 

 

 

 

 

ফিরে আসি মূল বিষয়ে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সন্নিকটে। আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির জন্য কঠিন পরীক্ষা। প্রতিপক্ষ হয়ে মাঠে নামেবে বিএনপিসহ অন্যান্য দল, যারা ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করেছিল। এবার আর তারা বর্জন করবে না বরং অত‍্যন্ত শক্ত অবস্থান নিয়ে মাঠে নামবে। শিখন্ডি হিসেবে সামনে রাখবে কামাল হোসেনসহ কিছু মানুষ যাদের দেশীয় রাজনীতিতে বাতিল বলে গণ্য করা হলেও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে কিছু কিছু পরাশক্তিগুলোর নিকট গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।

 

 

 

 

 

সাথে আছে অর্ধ নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূস ও বিএনপি-জামাতের লবিস্ট গ্রুপ। সুতরাং এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের কঠিন ও জটিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আসতে হবে নতুবা গত দশ বছরের যে অর্জন তা তো থাকবেই না বরং এমন অবস্থা হতে পারে, পাকিস্তানি বুদ্ধিজীবীদের মতো বলতে হতে পারে, ‘স্বনির্ভর ও উন্নত বাংলাদেশ চাই না, আল্লাহর ওয়াস্তে পাকিস্তান বানা দেও।’

 

 

 

 

 

আরেকটি বিষয় যারা ভাবছেন এবং স্বপ্ন দেখছেন এবারেও ৫ই জানুয়ারির মতো হবে নির্বাচন হবে । আর খুব সহজেই পার্লামেন্টে ঢুকে যাবেন তাদেরকে অনুরোধ করবো এখনো সময় আছে স্বপ্নের জগত থেকে বাস্তবে ফিরে আসুন। এবারের নির্বাচন হবে অতীতের সকল নির্বাচনের চেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। সরকার, বিশেষ করে শেখ হাসিনা অধিকতর নিরপেক্ষ ও জনগণের অংশগ্রহনে নির্বাচন যাতে অনুষ্ঠিত হয় তা নিশ্চিত করবেন।

 

 

 

 

 

বলা যায় না এই নির্বাচনই তাঁর শেষ নির্বাচন হতে পারে। তিনি ইতিমধ্যে কয়েকবারই আওয়ামী লীগ নেতাদের বলেছেন নতুন নেতৃত্ব বেছে নেবার জন্য। তিনি চাইবেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরেকটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে। ইতোমধ্যেই তিনি অনেক ইতিবাচক, প্রশংসনীয়, ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি কিন্তু বারবারই বলছেন এবারের নির্বাচনে কারো দায়িত্ব নিতে পারবেন না। সুতরাং যিনি প্রার্থী হবেন তাকে নিজের যোগ্যতা বলেই জিতে আসতে হবে।

 

 

 

 

 

কিন্তু সারাদেশে নির্বাচনী মাঠে আওয়ামী লীগের হালহকিকত কি, আমরা সবাই কিন্তু কমবেশি জানি। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বহুধা বিভক্ত ভাই-দাদা শিবিরে। তাদের নিকট আওয়ামী লীগ নয়, ভাই-দাদাই শ্রেষ্ঠ, ফেরেস্তাতুল‍্য। বাকি সবাই বিশেষ করে বর্তমান এমপি-মন্ত্রীরা ফরমালিনযুক্ত। সুতরাং তাদের ভাই-দাদাকে যদি প্রার্থী না করে, তাদের ভাষায় ফরমালিন যুক্ত এমপি-মন্ত্রীদের প্রার্থী করা হয় তাহলে সংশ্লিষ্ট আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের নিশ্চিত ভরাডুবি কেউ ঠেকাতে পারবে না। মন্ত্রী-এমপিরা ধোঁয়া তুলসিপাতা তা বলার সুযোগ নেই।

 

 

 

 

 

এবং বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় একেবারে ফেরেস্তা হয়ে যাবার সুযোগ নেই। তবে ভালো মানুষ হবার যথেষ্ট সুযোগ আছে। কেউ কেউ যে সে সুযোগ নিচ্ছেন না, ভালো হবার চেষ্টা করছেন না তা কিন্তু নয়। অন‍্যদিকে, যিনি বা যারা ভবিষ্যতে এমপি-মন্ত্রী হবার স্বপ্ন দেখছেন, বাস্তবতার নিরিখে তাদের ফেরেস্তা সাজার সুযোগ আছে কি না বা কতটুকু পারবেন তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। কথায় আছে সুযোগের অভাবে আমরা সবাই চরিত্রবান।

 

 

 

 

 

গত পাঁচ বছরে মনোনয়ন প্রত্যাশীরা মাঠ পর্যায়ে দলকে এমনভাবে বিভক্ত করে রেখেছে যে, আগামী নির্বাচনে তার কুফল পাওয়া যাবে। আর তা করা হয়েছে শুধুমাত্র প্রতিপক্ষকে পঁচিয়ে নিজের পার্লামেন্টে যাবার পথকে মসৃণ করার জন্য। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ে একে অন্যের বিরুদ্ধে, বিশেষ করে বর্তমান এমপিদের বিরুদ্ধে এত কুৎসা রটনা করা হয়েছে যা প্রকারান্তরে দল ও সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল একটি মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ পাবে।

 

 

 

 

 

নিজেদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনায় যত অর্থ, সময় ও শক্তি খরচ করেছে তার সিকি ভাগও যদি উন্নয়ন প্রচারে ব‍্যয় করতো তাহলে শেখ হাসিনাকে আক্ষেপ করে বলতে হতো না, এত উন্নয়ন করলাম, প্রচার নেই কেন? কেন তৃণমূলের মানুষ জানতে পারলো না। এ দায় যেমন এমপিদের আছে, তেমনি জেলা ও স্থানীয় নেতৃত্ব এবং মনোনয়ন প্রত্যাশীরা এড়াতে পারবেন না। এর খেসারত আগামীতে দিতে হবে।

 

 

 

 

 

বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম প্রচার-প্রসারে অত‍্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। একটি বিষয় মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করলেই দেখা যাবে ভাই-দাদাদের কোন পোস্ট হলে হাজারে হাজারে লাইক আর কমেন্ট হয়। কিন্তু সরকারের উন্নয়ন নিয়ে কোন পোস্ট হলে লাইক কমেন্টের বেলায় অতি নগ্নভাবে কৃপণতা পরিলক্ষিত হয়। ইচ্ছে করেই লাইক কমেন্ট করে না, ভাবে লাইক কমেন্ট দিলে যদি ঐ ব্যক্তি বা ব‍্যক্তি সমষ্টির উপকার হয়ে যায়। যদি হাইকমান্ডের সুনজরে পরে যায়। এই যে ব‍্যক্তিকেন্দ্রিক স্বার্থপরতা সেটাই কাল হয়েছে সবসময়, আগামীতেও হবে।

 

 

 

 

 

এতো দলের অভ্যন্তরীণ হলো গুঁতোগুতির বিষয়। আরেকটি আছে জোটাগত গুঁতোগুতি। পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ এককভাবে নির্বাচন করে সংখ‍্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়লাভ করে ছিয়ানব্বই সালে। কিন্তু সরকার গঠন করতে গিয়ে জোট করতে হয় জাতীয় পার্টি ও আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন জাসদের সাথে। এরপরের দুটো নির্বাচনেই জোট করেই নির্বাচন করে সরকার গঠন করেছে। বর্তমান বাস্তবতায় একক নির্বাচন করে আওয়ামী লীগ হয়তো সরকার গঠন করতে পারবে, কিন্তু রাজনীতি মার খাবে।

 

 

 

 

আমাদের এতদিনে নিশ্চয়ই উপলব্ধি করা উচিত শেখ হাসিনা শুধু ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করছেন না। তিনি একটি স্বপ্ন নিয়ে, ভীষণ নিয়ে রাজনীতি করছেন। সে স্বপ্ন আর ভীষণ হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার মাধ্যমে একটি পরিপূর্ণ মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা। সেজন্য তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী দলগুলোকে নিয়েই অগ্রসর হতে চান। যে উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু জাতীয় প্লাটফর্ম গড়ে তুলেছিলেন। আগামী নির্বাচন তিনি জোটগতভাবে করবেন সেটা নিশ্চিত। সুতরাং ধরেই নেয়া যায়, যে আসনগুলোতে এখন জোটের এমপিরা আছেন তা বহাল থাকবে। বরং আরো বাড়তে পারে। এই এমপিদের বিরুদ্ধেও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অভিযোগের অন্ত নেই।

 

 

 

 

 

 

উদাহরণ হিসেবে সুনামগঞ্জ-৪ এর কথাই যদি ধরি। সেখানে এখন এমপি আছেন জাতীয় পার্টির পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ। তার অতীত রাজনৈতিক পরিচয় কি ছিল কিংবা কেনই বা জাতীয় পার্টি থেকে এমপি হতে গেল সে ব‍্যাখা নাইবা করলাম। শুধু একটা কথা বলি পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে যাকে দেখেছি একটি সাইকেল নিয়ে ঘুরে ঘুরে সেই বৈরী পরিবেশে সুনামগঞ্জে ছাত্রলীগকে পুনর্গঠিত করে আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের ভিত্তি রচনা করতে, সেই মতিউর রহমান পীর যখন জেলা আওয়ামী লীগের কমিটিতে স্থান পায় না তখন মিসবাহদের কিইবা করার থাকে?

 

 

 

 

বর্তমান বাস্তবতায় ধরেই নেয়া যায় সুনামগঞ্জ-৪ আসনে মিসবাহ আবার জোটের প্রার্থী হবে। এই আসনে বর্তমানে আওয়ামী লীগের চারজন মনোনয়ন প্রত্যাশী। সুতরাং প্রত‍্যেকে নিজেদের প্রার্থীতা নিশ্চিত করার জন্য জোটের প্রার্থী ও দলীয় প্রার্থীদের বিরুদ্ধে বলবেন বা বলছেন সেটাই স্বাভাবিক।আপাততঃ বলা যায় তাদের কারোই নমিনেশন পাবার সম্ভাবনা নেই।

 

 

 

 

কিন্তু এই যে দলের ও জোটের সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিরুদ্ধে প্রচারণা বিপদ ও কুফল বোঝা যাবে আগামী নির্বাচনে। যারাই প্রার্থী হতে চান তাদের মধ্যে যে কোন একজনকেই বেছে নেবেন দলীয় হাইকমান্ড। তখন বাকিরা কি করবেন? দলের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখা ও দলকে জিতিয়ে আনার জন্য দলীয় বা জোটের প্রার্থীর পক্ষে মাঠে থাকতে হবে। শুধু নিজে মাঠে থাকলেই হবে না, অনুসারীদেরও সক্রিয় রাখতে হবে নতুবা শুধু ঐ প্রার্থী পরাজিত হবেন না আওয়ামী লীগেরও ক্ষমতায় ফিরে আসা কঠিন হবে। আর নিজেদের ভবিষৎ রাজনৈতিক পরিণতি কি হতে পারে সম্প্রতি সিলেটসহ চারটি জেলার নেতাদের নোটিশ প্রাপ্তি থেকে অনুমান করে নিতে পারেন।

 

 

 

 

 

 

ব‍্যক্তিস্বার্থে মাঠ পর্যায়ে যে বিভক্তি রেখা একে দেয়া হয়েছে তা না হয় পুরোপুরি মিটিয়ে ফেলা না গেলেও সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা যেতে পারে। কিন্তু সাধারণ ভোটারদের সামনে হাজির হয়ে ভোট চাইবেন কি করে? যে লোকটিকে পঁচানোর জন্য যারপর নাই চেষ্টা করেছেন তার পক্ষে কি বলে ভোট প্রার্থনা করবেন? ভোটাররা যদি আপনাদের কথিত বাক‍্যগুলোই আপনাদের উদ্দেশ্যে ছুড়ে দেয় কি উত্তর দেবেন তখন? যিনি প্রার্থী হবেন জয় বা পরাজয়ে মাধ্যমে তাঁর ভাগ‍্য নির্ধারিত হয়ে যাবে। কিন্তু আপনাদের ভাগ‍্য নির্ধারণের বিষয়টি অনিশ্চিত। বিপদটা এইখানেই। সামনে কঠিন পরীক্ষা।