প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:   জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় অভাবী মানুষের কিডনি বেচাকেনা আবারও বেড়েছে। অভাবের তাড়নায় ও নগদ টাকা পাওয়ার লোভে কিডনি বিক্রি করছেন এই উপজেলার ৩০ গ্রামের অভাবী মানুষ। দালালের প্ররোচনায় নিজের শরীরের একটি কিডনি বিক্রি করতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন তারা।

 

 

 

 

সম্প্রতি আবারও বেড়েছে এ কিডনি বাণিজ্য। ঢাকা থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে এই বাণিজ্য। কিডনি বিক্রেতাদের রাজধানী ঢাকাসহ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে নিয়ে গিয়ে শরীর থেকে কিডনি নেওয়া হচ্ছে। কিডনি বিক্রির প্রবণতা বৃদ্ধির খবরে গত বুধবার রাতে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে অভিযান চালায় কালাই থানা পুলিশ।

 

 

 

 

এ সময় এক কিডনি বিক্রেতা নারী ও এক দালালকে গ্রেফতার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কাছ থেকে নতুন তথ্যও পেয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে আরও একটি মামলা দায়ের করেছে। এ পর্যন্ত থানায় কিডনি সংক্রান্ত মামলা হয়েছে পাঁচটি।

 

 

 

 

 

কালাই উপজেলার ৩০ গ্রামে নতুন করে শতাধিক মানুষ নিজেদের কিডনি বিক্রি করে দিয়েছেন। কিডনি বিক্রির জন্য দালালদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছেন অভাবীরা। এতে প্রভাবিতও হচ্ছেন তারা। সম্প্রতি কিডনি ক্রেতা সেজে উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে ব্যাপক অনুসন্ধান চালানো হয়।

 

 

 

 

অনুসন্ধানে জানা যায়, অভাবী মানুষের সংখ্যা বেশি— এমন গ্রামে কিডনি কেনাবেচার শক্ত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে স্থানীয় দালালরা। বিভিন্ন সময় তাদের কিডনি সংক্রান্ত মামলায় আটক করে জেলহাজতে পাঠানো হলেও জামিনে বের হয়ে এসে আবারও জড়িয়ে পড়ছে এ কাজে। গ্রামের মানুষদের অর্থের লোভ আর ‘রাতারাতি ধনী’ হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে কিডনি বিক্রিতে রাজি করানো হচ্ছে— এমন অভিযোগ দালালদের বিরুদ্ধে। এককালীন মোটা অঙ্কের অর্থ পাওয়ার লোভে অভাবী মানুষ কিডনি বিক্রিতে সহজে রাজি হচ্ছে।

 

 

 

 

 

কিডনি কেনাবেচার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা গ্রামগুলো হলো— মাত্রাই ইউনিয়নের ভেরেন্ডি, উলিপুর, সাতার, কুসুমসাড়া, অনিহার, ভাউজাপাতার, শিবসমুদ্র, পাইকশ্বর ও ইন্দাহার, ছত্রগ্রাম, উদয়পুর ইউনিয়নের বহুতি, মোহাইল, থল, বাগইল, মাস্তর, জয়পুর বহুতি, নওয়ানা বহুতি, দুর্গাপুর, উত্তর তেলিহার, ভুষা, কাশিপুর, বিনইল ও পৃর্বকৃষ্টপুর এবং আহম্মেদাবাদ ইউনিয়নের রাঘবপুর, বোড়াই, হারুঞ্জা, নওপাড়া, বালাইট গ্রাম এবং পৌর এলাকার থুপসাড়া মহল্লা।

 

 

 

 

বুধবার রাতে পুলিশ অভিযান চালিয়ে প্রথমে দালাল চক্রের সদস্য উপজেলার বাগইল গ্রামের মুনছুর রহমানের ছেলে জুয়েল রানাকে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে আসে। পরে জিজ্ঞাসাবাদে সে কয়েকজন কিডনি বিক্রেতা ও তার সহযোগী দালালদের নাম জানায়। ওই রাতেই তাদের মধ্যে উপজেলার মোহাইল গ্রামের মিজানুর রহমানের স্ত্রী কিডনি বিক্রেতা হেলেনা বেগমকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

 

 

 

 

 

বোড়াই গ্রামের স্কুলশিক্ষক আবদুল আজিজ বলেন, নতুন করে আবারও শতাধিক অভাবী মানুষ কিডনি বিক্রি করে দিয়েছে। দালালদের মাধ্যমে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ছড়িয়ে পড়ছে কিডনি বিক্রির ভয়ঙ্কর তৎপরতা। ৩০ গ্রামের প্রত্যেকের শরীর পরীক্ষা করলে অর্ধেক মানুষেরই একটি করে কিডনি খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিডনি বিক্রি করে বাড়িতে ফেরার পর তারা নিজেরাই দালাল বনে যাচ্ছে।

 

 

 

 

 

দালাল জুয়েল রানা জানায়, ঢাকায় বসে কিডনি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে তারেক হোসেন ও সাইফুল ইসলাম নামে দু’জন। তাদের হয়ে এলাকায় কিডনি কেনাবেচায় নতুন করে কাজ করছে উপজেলার বিনইল গ্রামের কাইছার রহমান, সাজ্জাদ হোসেন, জাহাঙ্গীর হোসেন, বড়পুকুর গ্রামের দুলাল মিয়া ও এসমেদ আলীসহ বেশ কয়েকজন দালাল। জুয়েল আরও জানায়, অভাবে পড়ে সে নিজে কিডনি বিক্রি করেছে। এখন কিডনি কেনাবেচায় অন্যদের সহযোগিতা করছে।

 

 

 

 

কিডনি বিক্রেতা হেলেনা বেগম সংসারে অভাবের কারণে জুয়েলের সঙ্গে প্রথমে ঢাকায় যান। পরে আড়াই লাখ টাকায় কিডনি দিতে রাজি হন। ভারতে গিয়ে ঢাকার এক লোককে কিডনি দেন। কয়েক দিন আগে বাড়িতে ফেরেন।

 

 

 

 

বোড়াই গ্রামের আরেক কিডনি বিক্রেতা মোকারম হোসেন বলেন, তিনিও জুয়েলের সঙ্গে গিয়ে কিডনি দিয়েছেন। এখন তিনি খুবই অসুস্থ। কাজকর্ম কিছুই করতে পারেন না।

 

 

 

 

মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন-১৯৯৯-এর ৯ ধারায় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্রয়-বিক্রয় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই আইনের ১০(১) ধারা অনুযায়ী কেউ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি বা ক্রয় কিংবা সহায়তা করলে সর্বনিম্ন তিন বছর থেকে সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড এবং কমপক্ষে তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে। শাস্তির বিধান অক্ষুণ্ণ রেখে ২০০৯ সালে ভ্রাম্যমাণ আদালত আইনেও এটি সংযোজন করা হয়েছে।

 

 

 

 

কালাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল লতিফ খান বলেন, প্রচলিত ফৌজদারি আইনে মানব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেনাবেচা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিডনি বিক্রি বন্ধে যা যা করা দরকার, সবই করা হচ্ছে। দালাল ও বিক্রেতাদের গ্রেফতার অব্যাহত রাখা হয়েছে।

 

 

 

 

 

কালাই উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মিনফুজুর রহমান মিলন বলেন, অভাবী মানুষ কিডনি বিক্রির ভয়ঙ্কর এ কাজে জড়াচ্ছে। দালালদের খপ্পরে পড়ে স্বেচ্ছায় অঙ্গহানি ঘটিয়ে বাড়ি ফিরছে। অভাব তাড়াতে আত্মঘাতী পথ বেছে নিলেও মুক্তি মিলছে না তাদের। উল্টো অল্প বয়সে অসুস্থ-কর্মহীন হয়ে পড়ছে তারা।