পারমিতা চৌধুরী:  কাজের মেয়ে রহিমা,ছকিনা জরিনার নাম শুনেছেন সবাই। কাজের মেয়ে ববিতার নাম শুনেছেন কখনও?না, আমি চিত্রনায়িকা ববিতার কথা বলছি না।আমি বলছি ছোট্ট ববিতার কথা। যে ববিতা দুবেলা দুমুঠো ভাতের জন্য অন্যের বাড়িতে কাজ করে। আচ্ছা বলুনতো ববিতার বয়স কত হবে?৬/৭? নাকি ৭/৮? হবে হয়ত ৬/৭।

 

 

 

 

ববিতার উদাস চোখ তাকিয়ে থাকে স্কুলগামী শিশুদের দিকে । সেই শিশুদের পিঠে স্কুল ব্যাগ আর তাদের হাতটা বাবা মা কিংবা কোনো অভিভাবকের হাতের ভিতরে। ছোট ছোট আঙ্গুলগুলো গুজে থাকে বড়দের আঙ্গুলে। ববিতা কিন্তু তাদেরই বয়সী। কিন্তু ববিতার পিঠে নেই কোনো স্কুল ব্যাগ। তার হাতটা ধরেই কেউ নেই। তবে কিছুক্ষণ পরেই তার কাঁধে স্কুল ব্যাগ দেখা গেল।

 

 

 

 

 

কী ভাবছেন ও স্কুলে পড়ে?

আরে না ও যে বাসায় কাজ করে সে বাসার মেয়েটার স্কুল ব্যাগ। এই যে সে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে ছায়ানট স্কুলটার সামনে তা ওই মেয়েটার জন্যই। ববিতার দায়িত্ব প্রতিদিন বাচ্চাটাকে স্কুলে দিয়ে যাওয়া এবং বাসায় নিয়ে আসা । মাঝখানের সময়টাতে ববিতা উদাস চোখে এদিক ওদিক তাকায়, লোকজনের যাওয়া আসা দেখে সেই সাথে যানবাহনের চলাচল দেখে ।

 

 

 

 

 

ববিতার বয়সী মেয়েরা সকালে ঘুম থেকে উঠে ব্রাশ করে, নাস্তা সেরে ব্যাগ ঘাড়ে নিয়ে বাবা মার সাথে স্কুলে যাবে এটাইতো স্বাভাবিক। কিন্তু না ববিতার জন্য এটা হয়ে ওঠে না, তার দারিদ্রতার জন্য। ববিতাকেও সকাল সকাল উঠতে হয় ঘুম থেকে । ঘুম থেকে উঠেই তাকে নাস্তা তৈরী করতে হয়,টিফিন রেডি করতে হয় এবং স্কুলে যাওয়ার জন্য মালিকের মেয়েকে রেডি করে স্কুলে নিয়ে যেতে হয়। ববিতা খেয়েছে কিনা তার খেয়াল কিন্তু কেউ রাখে না । হয়ত বলবেন কাজের মেয়ের খবর কেই বা রাখে।

 

 

 

 

আচ্ছা ওই যে মালিকের মেয়েটা ওর যেমন ক্ষুধা, তৃষ্ণা আছে তা কী ববিতার নেই?ওই বাচ্চা মেয়েটা বিভিন্ন বায়না করে, এটা ওটা খেতে চায়। তা দেখে কী ববিতার বায়না করতে ইচ্ছে করে না? কী বলতে চাচ্ছেন ওই বাচ্চা মেয়েটা অবুঝ? তাহলে ববিতা কী প্রাপ্তবয়স? ওতো ওই বাচ্চা মেয়েটারই বয়সী। তারও তো ইচ্ছে করে, কেউ ওকে আদর করে খাইয়ে দেবে, কেউ ওর খেয়াল রাখবে।

 

 

 

 

 

অথচ দেখেন অন্যের খেয়াল রাখতেই তার দিন চলে যায়। এত কিছুর পরও হয়ত ববিতা তিনবেলা খেতে পারে না । কাজে একটু এদিক ওদিক হলেই মালকিনের কথা এবং নির্যাতন। প্রতিদিন অনলাইন এবং পত্রিকাগুলোতে আপনারা এমন সংবাদ পড়েই থাকেন- গৃহকর্ত্রীর দ্বারা গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার, কিংবা কাজের মেয়ের হাত পুড়িয়ে দিলেন গৃহকর্ত্রী। কখনও চোখে পড়ে কাজের মেয়ে ধর্ষণের খবর।

 

 

 

 

ববিতারা কিন্তু প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার। ববিতাদের স্বপ্নগুলো প্রতি দিন ধুলোয় লুটোপুটি খায়। জন্মই তাদের আজন্ম পাপ। অতচ কথা ছিল সবাই সুখে থাকবে। সুখ কিন্তু ববিতাদের জন্য না। কী মনে মনে হাসছেন? মনে মনে ভাবছেন যে ওদের আবার কিসের স্বপ্ন? বিষয়টা হাস্যকর লাগলেও ভেবে দেখেন আপনার যদি স্বপ্ন দেখার অধিকার থাকতে পারে তবে তার কেন থাকবে না?

 

 

 

 

আপনার যদি ভালো থাকার অধিকার থাকে তবে তার কেন ভালো থাকার অধিকার নেই?আপনি তিনবেলা পেটপুড়ে পোলাও মাংস খান তাতে কোনো সমস্যা নেই।কিন্তু ওরা কেন তিনবেলা ডালভাত পাবে না? হয়ত বলবেন-” তা দেখা তো আমার কাজ না।”

 

 

 

 

অবশ্যই আপনার কাজ। তার জন্য খাবার নিশ্চিত করা আপনারও কাজ। আপনি যদি মানুষ হয়ে থাকেন তাহলে তার প্রতি আপনার মানবিক হওয়া উচিত। তার দুঃখে ব্যথিত হওয়াটাই আপনার জন্য স্বাভাবিক।

 

 

 

 

 

আর তা যদি না করেন তাহলে গলা টিপে মেরে ফেলুন ববিতাকে,ববিতার মতো প্রত্যেকটি শিশু। সেই সাথে আপনার শিশুটিকেও । যেন আপনার শিশুর ভালো থাকা দেখে ববিতারা কষ্ট না পায় ।