প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:      নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) যথাসময়ে উন্নত মানের জাতীয় পরিচয়পত্র (স্মার্ট কার্ড) বুঝিয়ে দিতে পারেনি ওবারথুর টেকনোলজিস। এক বছর সময় বাড়ানোর পরও প্রতিষ্ঠানটি ব্যর্থ হয়েছে। সেই ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানকেই ২০০ কোটির বেশি টাকা দিয়ে বিরোধ মীমাংসা করতে সম্মত হয়েছে ইসি।

 

 

 

আর এই টাকা পরিশোধের জন্য ইসির কাছে ওবারথুরের জামানত বাজেয়াপ্ত করা বাবদ ১১২ কোটি টাকার মতো আছে। বাকি টাকার জন্য তাদের সরকারের কাছে বরাদ্দ চাইতে হবে।

 

 

 

ইসি সচিবালয়ে গত বুধবার বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয়ে এই সভা হয়। সভায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা, ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত মেরি অ্যানিক বোঁদিন এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, পররাষ্ট্র ও অর্থমন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

 

 

 

অভিযোগ আছে, স্মার্টকার্ড তৈরির জন্য আবেদনকারী একাধিক যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ না দিয়ে ইসি আন্তর্জাতিকভাবে যথেষ্ট দুর্নাম থাকা ওবারথুরকে কাজ দেয়। এ জন্য ইসি সচিবালয় দরপত্রের শর্ত এমনভাবে তৈরি করে, যাতে ওবারথুর ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান কাজ না পায় বা আবেদন করতে না পারে। ইসির সঙ্গে চুক্তির আগে থেকে ওবারথুর আর্থিক দেনায় জর্জরিত ছিল। স্মার্টকার্ড তৈরির কাজ হাতে নেওয়ার পরপরই প্রতিষ্ঠানটি আর্থিক দায় থেকে রেহাই পেতে মরফো নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এক হয়ে যায়। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানটির নাম আইডিইএমআইএ।

 

 

 

বুধবারের সভায় এই প্রতিষ্ঠানকেই পাওনা বাবদ ২৬ মিলিয়ন ডলার (২০০ কোটি টাকার বেশি) দিতে সম্মত হয়েছে। এ নিয়ে ইসি সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, যথাসময়ের কাজ শেষ না করায় ইসির সময়ের অপচয় এবং মালামালের ক্ষতি হয়েছে। সে বিষয়ে প্রশ্ন না তুলেই ইসি ওবারথুরকে টাকা দিয়ে সম্মত হয়েছে।

 

 

 

সভার সূত্রে জানা গেছে, ৯ কোটি ভোটারের জন্য স্মার্টকার্ড তৈরি, পারসোনালাইজেশন (ভোটারের তথ্য সংরক্ষণ) এবং কার্ড উপজেলা ও থানা পর্যায়ে বিতরণের জন্য ২০১৫ সালের ১৪ জানুয়ারি ফরাসি প্রতিষ্ঠান ওবারথুরের সঙ্গে ইসির চুক্তি হয়। চুক্তিতে ব্যয় ধরা হয় প্রায় সাড়ে ৮০০ কোটি টাকা। এই টাকা বিশ্বব্যাংক ইসিকে ঋণ হিসেবে দিতে সম্মত হয়।

 

 

 

চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০১৬ সালের জুনে। কিন্তু ওই সময়ের মধ্যে ওবারথুর উল্লেখ করার মতো কোনো কাজ করতে পারেনি। নির্ধারিত সময়ে তারা মাত্র ১ কোটি ১৩ লাখ খালি কার্ড (ব্যক্তির তথ্যবিহীন কার্ড) সরবরাহ করতে সক্ষম হয়। এক বছর সময় বাড়ানোর পর ২০১৭ সালের জুনের শেষের হিসাবে দেখা যায়, ওবারথুর মাত্র ১২ দশমিক ৮ শতাংশ কার্ডে ব্যক্তির তথ্য সংরক্ষণ করতে পেরেছে। অবশ্য একই সময়ে তারা ইসিকে ৭ কোটি ৭০ লাখ খালি কার্ড সরবরাহ করে। ওই অবস্থায় ইসি ওবারথুরের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে।

 

 

 

আরও জানা যায়, দরপত্রের শর্তানুযায়ী জামানতের টাকা হিসেবে ওবারথুর ১৪ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ১১৫ কোটি টাকা) জমা দেয়। চুক্তি বাতিলের পর ইসি এই টাকা বাজেয়াপ্ত করে নিজেদের ব্যাংক হিসেবে জমা করে। একই সময়ে ইসি ওবারথুরকে সর্বমোট ৫৪ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৪৩২ কোটি) পরিশোধ করে।

 

 

 

ইসি সচিবালয় থেকে জানা যায়, ওবারথুর ইসির কাছে বকেয়া বাবদ ৪১ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৩২৮ কোটি টাকা) দাবি করেছে। বিনিময়ে ইসি বুধবারের বৈঠকে ২৬ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রস্তাব করে এবং ওবারথুর তাতে রাজি হয়।

 

 

 

এ বিষয়ে ইসির নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘ওবারথুর ব্যর্থ হয়েছে, সেই বিষয়টি তুলে ধরেই দর-কষাকষি হয়েছে। আমরা তাদের ৪১ মিলিয়ন ডলারের বদলে ২৬ মিলিয়ন দিতে রাজি হয়েছি এবং ওবারথুর তাতে রাজি হয়েছে।’

 

 

 

ইসির সময় ও মালামালের অপচয়ের হিসাব এবং অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার বিষয়ে সাইদুর রহমান বলেন, ‘ওই সব পুরোনো প্রসঙ্গ এখন আর না তোলাই ভালো। ক্ষতি যা হওয়ার হয়েছে।’

 

 

 

তবে ওবারথুরকে দেয় টাকা কোত্থেকে আসবে তা নিয়ে এখন চিন্তিত হয়ে পড়েছে ইসি। সংশ্লিষ্ট নথি থেকে জানা যায়, ২৬ মিলিয়ন ডলার পরিশোধের জন্য প্রয়োজনীয় টাকা ইসির কাছে নেই। এ জন্য নিবন্ধন অনুবিভাগ থেকে জরুরি ভিত্তিতে সরকারের কাছে বরাদ্দ চাওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।