প্রথমবার্তা ডেস্ক রিপোর্ট :  সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ নির্ভর করে মানুষের আখলাকের শুদ্ধতার ওপর। মনন জগৎ পরিশুদ্ধ হলে সমাজ হয় হানাহানি ও অনাচারমুক্ত। মানুষের চিন্তা-চেতনা, মেধা-বুদ্ধিকে পরিশীলিত ও অন্তরের কসুর দূর করার মাধ্যমে রাসুল সা. সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার শিক্ষা দিয়েছেন। অশান্তি ও হানাহানিপূর্ণ পৃথিবী মহানবী (সা.) এর আদর্শেই পেতে পারে শান্তি ও সম্প্রীতি। এমনই কয়েকটি শিক্ষা নিম্নরূপ-

সালামের প্রচার প্রসার : সালাম ইসলাম ধর্মের নিদর্শন। মুসলমানের সাক্ষাতের প্রথম সম্বোধন। একে অন্যের তরে আল্লাহর দরবারে করুণা ভিক্ষা চাওয়ার মহান বাণী। সালাম পরস্পরের ভেতর মহাব্বত সৃষ্টি করে। ভালবাসার সৌধ নির্মাণ করে। মান অভিমান ঝগড়া ফাসাদ ভুলিয়ে দেয়। সমাজে বইয়ে দেয় শান্তির হাওয়া। এত সুন্দর সম্বোধন ইসলাম ধর্ম ব্যতিত অন্য কোন ধর্মে নেই। সমাজ সভ্যতার প্রধান বিদ্যা হলো সালামের ব্যাপক প্রচার প্রসার। আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাঃ থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করল ইসলামের কোন কাজ সবচাইতে উত্তম? তিনি বলেন- “তুমি লোকদেরকে আহার করাবে এবং পরিচিত অপরিচিত নির্বিশেষে সকলকে সালাম করবে”। বোখারি ২৭।

মুমূর্ষু ব্যক্তির খবর নেওয়া : মানুষকে কেন্দ্র করে সমাজ গড়ে উঠে। মানুষ একাকী চলতে  পারেনা। মানব্য সংশ্রব মানুষের জন্য অত্যাবশ্যক। সুখ-দুখ, সুস্থ- অসুস্থ মিলিয়েই মানুষের জীবন। বিপদ- আপদে বিপন্ন ও দুর্যোগে পরস্পর সহযোগিতার হাত বাড়াবে, রোগীর খবর নিবে, সেবা দিবে এটাইতো মানবতার ধর্ম। সমাজের মানুষ, প্রতিবেশী, আত্মীয় কুটুম সময়ে অসময়ে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। বিভিন্ন রোগে কাতর হয়ে যায়। তখন তাদের পাশে দাঁড়ানো, ভালবেসে হাত বাড়ানো, স্নেহের পরশ বুলানো আমাদের মহানবীর সুন্নত। কারো অসুস্থতার সংবাদ পেলে আমাদের নবী তাকে দেখতে যেতেন। দোয়া করতেন। সেবা দিতেন। মুমূর্ষ ব্যক্তির খবর নেয়ার ফলে উভয়ের মনে মহাব্বত পয়দা হয়। আন্তরিকতা তৈরি হয়। সামাজিক ভারসম্য ঠিক থাকে। গড়ে উঠে সভ্য সমাজ। বারা ইবনে আ’যিব থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- “রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে সাতটি জিনিস করতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং সাতটি জিনিস থেকে বিরত থাকতে বলেছেন। আমাদেরক নির্দেশ দিয়েছেন রোগীকে দেখতে যাবার ও সালামের ব্যাপক প্রচার করার”। বুখারী ৫১৭৫। রোগীকে দেখতে গেলে যুক্ত হয় তার আমল নামায় অফুরন্ত সওয়াবের ভা-ার। হাদিসে এসেছে, “যে ব্যক্তি কোন রোগীকে দেখতে যায় সে জান্নাতের ফলমূলে অবস্থান করতে থাকে”। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হলো জান্নাতের ফলমূলে অবস্থান করা কি? তিনি বললেন- জান্নাতের ফলমূল সংগ্রহ করা”। বুখারী ২৫৬৮।

ঘরে প্রবেশে অনুমতি : সম্প্রতিকালে আমাদের সমাজে ঘরে প্রবেশের সময় অনুমতি নেওয়ার প্রসঙ্গটি একদম হারিয়ে গেছে। আমরা কারো ঘরে ঢুকার ক্ষেত্রে প্রয়োজন পর্যন্ত  মনে করেনা অনুমতি নেয়ার। যার ফলে সমাজে প্রত্যহ ফ্যাতনা ফাসাদ, অনৈতিক ও অশালিন কর্মকা- তীব্র গতিতে বেড়ে চলছে। অসভ্যতায় ছেয়ে যাচ্ছে সমাজের চারপাশ। অথচ ইসলাম ঘরে প্রবেশের সময় অনুমতি নিতে জোর  তাগিদ করেছেন। আপন মায়ের ঘরে প্রবেশের সময় পর্যন্ত অনুমতি নিতে বলেছেন ইসলামের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। আবূ মুসা আশআরী রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন “অনুমতি তিনবার চাইবে। অনুমতি দিলে প্রবেশ করবে। অন্যথায় ফিরে  যাবে”।  বোখারি ৬২৪৫, মুসলিম ২১৫৩।

অন্যের কাজে হস্তক্ষেপ না করা : অধুনাকালে দেখা যায়, একজন ব্যক্তি মার্কেটে বা কোথাও একটি পণ্যের দরদাম করছে। তার উপর বেশি দাম দিয়ে অন্য ব্যক্তি নিয়ে যায়। যার ফলে পরস্পরের মাঝে দ্বন্দ কলহ সৃষ্টি হয়। মানুষের অধিকার বঞ্চিত হয়। গরীবের আশার কপালে খরা পড়ে। কিন্তু মানবতার নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একজনের দরদামের উপর দাম করাকে নিষেধ করেছেন। মানা করেছেন একজনের বিয়ের প্রস্তাবের উপরও অন্যজন প্রস্তাব করতে। আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “তোমাদের কেউ যেন তার ভাইয়ের ক্রয় বিক্রয়ের উপর ক্রয় বিক্রয় না করে। কেউ যেন তার ভাইয়ের বিয়ের প্রস্তাবের উপর প্রস্তাব না করে”। মুসলিম ২০০৭।

লেনদেনে সময় নির্ধারণ করা : মানুষ জীবন যাপনে অন্যের মুখাপেক্ষী। প্রয়োজনে পরের নিকট ধারস্থ হয়। দরকারে মানুষ টাকা পয়শার ঋণ করে। ‘করযে হাসানা’ দেওয়া ইসলামে অনেক পূণ্যের আমল। কিভাবে মানুষ ঋণ আদান প্রদান করবে সে ব্যাপারে ইসলাম নিখুঁত দিক নির্দেশনা দিয়েছে। ঋণ পরিশোধের নির্ধারিত সময় নির্ধারণ করার কথা বলেছে। এবং নির্ধারিত মেয়াদকাল লিপিবদ্ধ করতে বলেছে। আল্লাহ বলেন- “হে মুমিনগণ- যখন তোমরা কোন নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে ঋণের আদান প্রদান কর, তখন তা লিপিবদ্ধ করে নাও”। সূরা বাকারা ২৮২। হাদিসে ঘোষিত হয়েছে, আবু হুরায়রা রা. নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করে বলেন যে, সে ব্যক্তি জনৈক বানু ঈসরাইলের নিকট এক হাজার স্বর্ণ মুদ্রা ধার চাইলে সে তাকে নির্দিষ্ট সময়ের শর্ত দিল। বোখারি ১৭০২।