প্রথমবার্তা ডেস্ক রিপোর্ট : তাঁতে বোনা মসলিন বাংলাদেশের ঐতিহ্য হলেও হারিয়ে গেছে প্রায় চার শ বছর আগে। অতীত এই ঐতিহ্য ফেরাতে সরকারকে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে। আর নমুনা সংগ্রহ ও গবেষণার মাধ্যমে ফিরিতে আনতে হবে মসলিনকে। মসলিনের ঐতিহ্যকে আবারো ফিরিয়ে আনা সম্ভব, প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ ও সমন্বিত পরিকল্পনা। আর এতে মসলিন বাংলাদেশে জিআই পণ্য হিসাবে স্বীকৃতি পেতে সহজ হবে।

আজ মঙ্গলবার সকালে জাতীয় জাদুঘরের আয়োজনের প্রতিষ্ঠানটির কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে ‘মসলিন পুনরুজ্জীবন : সমস্যা ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক লুৎফর রহমানের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের চেয়্যারম্যান মুশতাক হাসান মুহা. ইফতিখার, বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের সদস্য মিজানুর রহমান, লোকশিল্প গবেষক শ্রী চন্দ্র শেখর সাহা, তুলা উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী পরিচালক ড. ফরিদ উদ্দিন আহমদ ও হস্তশিল্প গবেষক ও লেখক রুবী গজনবী। মসলিনের পুনরুজ্জীবন নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন দৃক পিকচার (বেঙ্গল মসলিন) লাইব্রেরি লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক সাইফুল ইসলাম। প্রবন্ধে তিনি মসলিনকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব ও মসলিনের নানা দিক তুলে ধরেন।

বক্তারা বলেন, মসলিন আমাদের পণ্য হলেও বই, পুস্তক কিংবা লেখনীতেও উদহারণ খুবই কম। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ মসলিনের বিকাশে নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারের পড়্গ থেকে বরাদ্দ পাচ্ছে। কিন্তু আমাদের পক্ষ থেকে তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। এই মসলিন শিল্পকে ফেরাতে না পারলে বড় ক্ষতি হবে আর স্বীকৃতি অন্যরা নিয়ে যাবে। এই ইতিহাস ও ঐতিহ্য ফেরাতে সকলকেই এগিয়ে আসতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকেই যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক লুৎফর রহমান বলেন, ‘৪০০ বছর আগের মসলিন হারিয়ে গেছে। আগের ঐতিহ্য মসলিন ফেরাতে কেউ কেউ বলছেন কাজ চলছে, প্রয়োজন পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ। কিন্তু অর্থ বরাদ্দ বাড়ালেই কি মসলিন উদ্ধার সম্ভব? মসলিন ফেরাতে আগে অনেক নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে কিন্তু কার্যত কোনো ফল আসেনি। ফলাফল কি এসেছে সেটিও জানানো হয়নি। এটি ফেরানো সম্ভব তবে প্রয়োজন সদিচ্ছা ও সমন্বয়। সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়ে কাজ করলে দুই বছরেই হারানো ঐতিহ্য ফেরানো সম্ভব। যার জন্য গবেষণা ও উন্নয়ন বজায় রাখতে হবে। আর এই কাজটি করতে সকলকেই এগিয়ে আসতে হবে।’

তিন বছর আগে প্রধানমন্ত্রী মসলিন ফেরাতে উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশ দিলেও এখনো হয়নি। একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছিল কিন্তু কার্যত ফল আসেনি। কেন আসেনি সেটি আমরা জানি না। এসব তথ্য জানিয়ে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের সদস্য মিজানুর রহমান বলেন, ‘মসলিন আমাদের সাধারণ নয়, গর্বের ইতিহাস। ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানীর বিমাতাসূলভ আচরণে এটা হারিয়ে গেছে।

পুরনো ঐতিহ্য ফেরাতে ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিলেও এখনো হয়নি। সমন্বয়হীনতায় মসলিন ফেরানো উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি। হয়নি পর্যাপ্ত গবেষণাও। মসলিন হারালেও এ অঞ্চলের মাটি হারায়নি। যেসব অঞ্চলে মসলিন পাওয়া যেত ওইসব অঞ্চলে খুঁজে দেখলেই পাওয়া যাবে। কোনো বিচ্ছিন্নতা নয়, সকলে সমন্বিতভাবে কাজ করলে আগামী ৫ বছরের মধ্যে মসলিনের অস্তিত্ব ফিরিয়ে আনা সম্ভব।’

তুলা উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী পরিচালক ড. ফরিদ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘মসলিন একটি ব্রান্ড। যা বহুবছর আগে হারিয়ে গেছে। ওই মসসিন আর এখনকার মসলিনের মধ্যে অনেক পার্থক্য। আমরা মসলিনের আদি উৎস উদঘাটনে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। দেশে এখনো মসলিনের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। দাম বেশি হলেও ক্রেতা রয়েছে। মসলিন ফেরাতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তবে সেটাকে আরো সক্রিয় হতে হবে। সংশ্লিষ্টদের মধ্য সমন্বয় থাকতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে বড় সহায়তা প্রয়োজন। একইসঙ্গে প্রয়োজন দক্ষ জনবলও। এটি করতে পারলে আমরা মসলিনের সুদিন ফেরাতে পারব।’

লোকশিল্প গবেষক শ্রী চন্দশেখর সাহা বলেন, মসলিন আমাদের ঐতিহ্য হলেও কারুশিল্পীরা কেউ এই ইতিহাস লিখে যায়নি। বিদেশি পর্যটক কিংবা তাদের লেখা বইয়ে আমরা এটি জানতে পারছি। আমরা হয়তো ৪০০ বছর পেছনে যেতে পারবো না তবে উদ্যোগ নিলে মসলিন ফেরানো সম্ভব। সরকারি, বেসরকারি ও কারুশিল্পীদের সঙ্গে আমরা এটি ফেরাতে কাজ করতে পারি।’

হস্তশিল্প গবেষক ও লেখক রুবী গজনবী বলেন, ‘আমাদের ঐতিহ্য মসলিন ফেরাতে সরকারের পক্ষ থেকে বড় ধরনের সাপোর্ট প্রয়োজন। মসলিন নিয়ে আমাদের লেখা তেমন কোনো বই নেই। মসলিন নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ গত ১০ বছরে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। বিশেষজ্ঞ নিয়ে এসে কাজ করছে। কিন্তু আমরা সেই তুলনায় কিছুই করতে পারছি না। মসলিন নিয়ে যতটা কাজ এগিয়েছে, সেটিকে আরো এগিয়ে নিতে হবে।’