“ভাদ্র মাসের কোন এক রোদজ্বলা দুপুরে আমার সাদামাটা জীবনে এক পশলা বৃষ্টি নিয়ে এসেছিলো যে মেয়েটি, তার নাম … আচ্ছা, নাম থাকুক … নাম দিয়ে কি এসে যায় !!

আমার ধারণা, প্রেমে পড়লে পৃথিবীর সবচেয়ে বুড়ো কিংবা ম্যাচিউর মানুষটাও অনেক বেশি বাচ্চা হয়ে যায় … আমার জীবনে মেয়েটি আসার পর আমারো মনে হতো, আমার বয়স মনে হয় ১০ বছর কমে গিয়েছে !!

গল্প উপন্যাসের মত আমাদের প্রেম ছিল না … পার্কে বসে বাদাম খাওয়া, রিকশাতে ঘোরা কিংবা সেলফি তোলার স্বপ্ন দেখা আমাদের জন্য বিলাসিতা ছিল … কারণ আমাদের দেখাই হতো না … তার আর আমার মাঝে ছিল বিশাল দূরত্ব !!

সেই দূরত্বও পাড়ি দেয়া যেতো … কিন্তু সেই দূরত্ব পাড়ি দিয়ে মেয়েটির বাড়ির জানালায় গিয়ে তার মুখটা দেখার সৌভাগ্য হবে কিনা – সেই নিশ্চয়তা সে আমাকে দিতে পারতো না … তার একটাই কথাঃ

“যদি মা জেনে যায় ??”

আমি তাকে দোষ দিতাম না … কনজার্ভেটিভ ফ্যামিলির প্রেমগুলো এমনই হয় … রাতের পর রাত ফোনে কথা বলাটাও সেখানে ভীষণ স্পর্ধার ব্যাপার … এক ঈদে প্রথমবারের মত তার কন্ঠস্বর শোনার পর দ্বিতীয়বার তার কন্ঠস্বর শুনতে আমাকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল প্রায় ২ সপ্তাহ !!

ভ্রু কুচকে অনেকেই জিজ্ঞেস করবেঃ

“দেখা হয় না, কথা হয় না, এ আবার কেমন প্রেম ??”

এই প্রশ্নের কোন উত্তর আমাদের জানা ছিল না … আমরা শুধু মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতাম, একদিন আমাদের বিয়ে হবে … বিয়ের পর আমাদের সংসার কেমন হবে, আমরা বাসার জানালাতে কোন রঙের পর্দা লাগাবো, আমাদের বারান্দার ফুলগাছটাতে কবে ফুল ফুটবে – এই কল্পনাতে আমরা বিভোর থাকতাম !!

একদিন আমাদের ভীষণ ঝগড়া হলো … ঝগড়ার বিষয় ছিল, বিয়ের পর মশারি কে টানাবে … আরেকদিনের খুনসুটির বিষয় ছিল, বিয়ের পর অফিস থেকে আসার সময় যদি তার খোপার জন্য ফুল আনতে ভুলে যাই, তাহলে তার শাস্তি হিসেবে সে আমার খাবারে লবণ বেশি দিবে নাকি মরিচ ??

আমাদের পৃথিবীটা সুন্দর ছিল … খুব বেশি চাওয়া-পাওয়া ছিল না … আমাদের ভালোবাসাতে দু’ ফোঁটা কষ্ট ছিল আর এক সমুদ্র ধৈর্য্য ছিল !!

বছর গড়িয়ে সেই দিন এলো … বহু কষ্টে সে এক বিকেল বাইরে থাকার অনুমতি পেলো … আমিও সেই বিকেলের পিছনে ছুটতে গিয়ে খুব ভোরে রওনা দিলাম !!

বেলা ১২ টার দিকে আমি বাসের সিটে আধা ঘুমন্ত অবস্থায় শুধু টের পেলাম, আমার মাথাতে প্রচন্ড ব্যথা করছে … নিজের অজান্তেই মাথায় হাত দিতে টের পেলাম, সেখান থেকে স্রোতের মত রক্ত গড়িয়ে পড়ছে … পকেটে ফোনটা দুইবার কেঁপে উঠলো … মেয়েটা মেসেজ দিয়েছিলঃ

“আমার জন্য মাটির গয়না নিয়ে আইসো মনে করে, কেমন?”

সেই মেসেজের রিপ্লাই সে কখনো পায় নি … আর কোনদিন পাবেও না !!

আমাকে যারা হাসপাতালের মর্গে নিয়ে গিয়েছিলো, শুধু তারাই দেখেছিলো, একটা লাশ বা’হাতে ভীষণ শক্ত করে একটা প্যাকেট ধরে রেখেছে … প্যাকেটের ভেতরে কতগুলো মাটির গয়না ভেঙ্গে গুড়োগুড়ো হয়ে গিয়েছিল !!

দুটো ভালোবাসার মানুষের মাঝে যে মানুষটা মরে যায়, সে আসলে বেঁচে যায় … আর যে মানুষটা বেঁচে থাকে, সে প্রতি মুহূর্তে একটু একটু করে বারবার মরে যায় !!

আমি কয়েক ফোঁটা রক্ত ঝরিয়ে মরে গিয়ে বেঁচে গিয়েছিলাম … কখনো দেখার সুযোগ হয় নি, ঠিক কয় ফোঁটা চোখের জল ঝরিয়ে মেয়েটা বাকি জীবনে বেঁচে থেকে মরে গিয়েছিল !!