আমি একজন শিক্ষার্থী। তবে আমার ভূমিকা শিক্ষার্থী হিসেবে তুলনায় নিয়ে আসলে তা ভুল হতে পারে; সত্যিকার অর্থে আমি একজন কুলি। কুলি, কারণ অনেক কিছু আমাকে বয়ে বেড়াতে হয়। ‘শিক্ষা’ নামক এক ভয়াবহ বোঝা আমার কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা আমি চোখে দেখতে পাই না বিধায় আমাকে পরিবার, সমাজ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আমাকে প্রতিনিয়ত সেই ওজনের অস্তিত্ব মনে করিয়ে দেয়। যে শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের মত শিক্ষার্থীদের জীবনের সহায়ক অংশ হবার কথা, এখন তা আমাদের জীবনীশক্তি ধ্বংসের কারণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।

 

 

প্রতিবছর আমাদের শিক্ষানীতি বদলানো হয়। প্রশ্ন হচ্ছে শিক্ষানীতির এই পরিবর্তনটা আসলে কাদের জন্য? সেই শিক্ষানীতির অধিবেশনে না উপস্থিত থাকে কোনো শিক্ষার্থী, না কোনো শিক্ষক; সেখানে কেবল উপস্থিত থাকে কিছু গবেষক। যাদের উদ্দেশ্য শিক্ষানীতির উন্নতি নয়, বরং তাদের একমাত্র কাজ হচ্ছে আমাদের মত কুলিদের উপর আর কতটা চাপ প্রয়োগ করা যায় তা হিসেব-নিকেশ করে বের করা, আর বছরে বছর সেই চাপ প্রয়োগ করে ধীরে ধীরে আমাদের মৃত্যুকূপের দিকে ধাবিত করা।

 

আচ্ছা, এমন একটা অধিবেশন কি হতে পারে না যেখানে শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং অভিভাবকের মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে সিদ্ধান্ত প্রণয়ন করা যাবে? অথবা পরিবর্তিত শিক্ষানীতি নিয়ে একজন শিক্ষার্থীর চিন্তা-ভাবনাটা কেমন তা বুঝে তারপর তার উপর ভিত্তি করে পরবর্তী ধাপের দিকে এগিয়ে যাওয়া? দুঃখজনক হলেও সত্য যে আমরা এখনো এমনটি ঘটতে দেখিনি। দেখিনি একজন অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এবং শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করে যাওয়া কোন শিক্ষাবিদকে এই ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে। আর এই ব্যাপারটা এতই অদ্ভুত এবং বিপজ্জনক যে, ছোট একটি ভুল সিদ্ধান্তেও এখানে কোটি কোটি শিশুকে বিপদের মুখে পড়তে হয়। আর তার উপর বিপদটি হুট-হাট করেও নজরে আসে না, কিন্তু যতক্ষণে দৃষ্টিগোচর হয় ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়। প্রজন্মের পর প্রজন্মকে সেই ভুল সিদ্ধান্তের ফলাফল ভোগ করে যেতে হয়।

 

 

আমাদের দেশে পরীক্ষার আগের রাতে প্রশ্ন ফাঁস হওয়া এখন অনেকটা নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এর ফলে এখন ‘জিপিএ-৫’ এর সংখ্যাও যে বাঁধছাড়া অবস্থায় পৌঁছেছে তা এখন সকলের চোখের সামনে দৃশ্যমান। কিন্তু কথা হলো- প্রশ্ন ফাঁসের কারণে সৎ মেধাবী শিক্ষার্থীরা যেমন পিছিয়ে পড়ছে, তেমনি ‘অপরাধীরা’ সহজেই বোর্ড পরীক্ষাগুলোতে ভালো নাম্বারের বাগিয়ে অনেকদূর এগিয়ে যাচ্ছে। আর এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় প্রেক্ষিতে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মানদণ্ড নিয়ন্ত্রণকর্তাদের যতটা বিচলিত হবার কথা ছিল, উল্টো তারাই যেন এসব দেখে তৃপ্তির ঢেকুর তুলছে। বছর কয়েক আগেও যেখানে নকল করে পাশ করার একটা হিড়িক চলছিল, এখন সেটা ‘জিপিএ-৫’ এর রূপে রূপান্তরিত হয়েছে। নকলের এমন আধুনিকতার কথা আগে থেকে কে ভাবতে পেরেছিল বলুন তো!

 

 

আর কয়েকটা বছর পেরুলে পরে হয়তো ব্যাপারটা এতই বিব্রতকর অবস্থায় পৌঁছবে যে, তা আঁচ করে নতুন শিক্ষানীতিতে নির্ধারিত সংখ্যক জিপিএ-৫ দেবার প্রস্তাবনা চলে এসেছে। এখন ভাববার মত ব্যাপার হল, সেই নির্দিষ্ট আর নির্ধারিত সংখ্যায় কারা এই জিপিএ-৫ পাবে? আর এই প্রশ্নের উত্তরটা প্রশ্ন থেকেও অনেক সহজ। যারা পরীক্ষার আগের রাতে প্রশ্ন পেয়ে ধারাবাহিক জিপিএ-৫ পাচ্ছিল, তারাই এই সংখ্যায় আবদ্ধ থাকবে, কারণ যোগ্যতায় যারা জিপিএ-৫ পাবার কথা ছিল, তারা তো বরাবরই এদের থেকে পিছিয়ে থাকবে। আর তার ফলে এবারেও তারা জিপিএ-৫ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েই থাকবে। সুতরাং, চোখ বুজেই বলা যায় যে, নতুন এই শিক্ষানীতি আসলে ‘অপরাধকে সনাক্ত না করে’ উল্টো সৎ এবং আদর্শ শিক্ষার্থীর ফলাফলকে আরও বেশি হুমকির মুখে ফেলে দেবে।

এর উপর আবার নতুন করে যুক্ত হয়েছে পাঠ্যবইয়ের ত্রুটি। নির্ভুলভাবে শেখার জন্যে যে মাধ্যমটি এতদিন একমাত্র মাধ্যম হয়ে শিক্ষার্থীদের আগলে রেখেছিল, সেটিও এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। শুধুমাত্র ভুল দিয়েই যে তারা ক্ষান্ত হচ্ছে তাই নয়, বরং বিষয়বস্তু সম্পর্কে ধারণা না দিয়েই তা অনুশীলনীর অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। মূল তত্ত্বটা শেখার আগেই আমরা জোর করে এর ব্যবহার আর ফলাফল নিয়ে শিক্ষার্থীকে চিন্তা করতে বাধ্য করছি। আর এইসব ভুলগুলো আমরা দেখেও না দেখার মত করে এড়িয়ে যাচ্ছি। কিন্তু এই এড়িয়ে যাবার ফলাফল যে কতটা ভয়ঙ্কর রূপে আবারও আমাদের সামনেই দৃশ্যমান হবে তার বিন্দুমাত্র ধারণাও এখন আমাদের নেই।

 

 

এসব তো গেল শুধু শেখা আর শেখানোর পেছনের কথা, এবারে আসি মূল্যায়নের দিকে। কিছুদিন আগেই সদ্য সমাপ্ত হওয়া এইচএসসি পরীক্ষার খাতা হুট করে অনেকগুলো হলে দেখা গেল। আর এই হুট করে খাতাগুলোর উপস্থিতির কথা একজন মানসিকবিকারগ্রস্থ মানুষও বুঝতে পারে যে এরা এমনি এমনি সেখানে উদয় হয়নি। কোন ব্যক্তি-মাধ্যমেই সেসব সেখানে উপস্থিত হয়েছে। আর এমনটি যে এবারই প্রথম ঘটেছে সে নিশ্চয়তাও কিন্তু নেই, বরং এতে ভালো করেই বোঝা যায় যে, এই ব্যাপারটি অনেক আগে থেকেই প্রচলিত। যে খাতাগুলো একজন শিক্ষকের নিরীক্ষণ করার কথা তা এখন করছে কিছু তথাকথিত শিক্ষিত(!) ব্যক্তিবর্গ! তবে কি একজন শিক্ষকের মূল্যায়ন আর দশজন সাধারণের মূল্যায়নের মাঝে কোনো তফাত নেই? অথচ আমার দৃষ্টিতে এই দুই শ্রেণীর ব্যক্তির মাঝে বিশাল একটা তফাত রয়েছে। একজন বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক ওই বিষয়ের উপর পূর্ণ জ্ঞান রাখেন বলেই আমার ধারণা। তাই একজন শিক্ষার্থী যখন কোনো একটি বিষয়ের উপর পাঠ্যপুস্তকের বাইরে হতেও কোন তথ্য যুক্ত করবে যা তার উত্তরপত্রের মূল্যায়নকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারতো, তা এখন একজন সাধারণ কেউ দেখার দরুন ভুল হিসেবে চিহ্নিত হবে।

 

যে বাড়তি অংশটার জন্যে তার মূল্যায়ন অনেক ভালো কিছু হবার কথা ছিল, শুধুমাত্র অজ্ঞতার কারণে তা তার পেছনে পড়ে যাবার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। আর এইসব বিড়ম্বনা যে আমার কল্পনা প্রসূত তা নয়, বরং এমন হওয়াটাই খুব বেশি স্বাভাবিক ব্যাপার, বরং এমনটা না হলেই ব্যাপারটা অস্বাভাবিক ঠেকবে। আর এইসব যদি আমলেই না নিতে হবে তবে এই ‘শিক্ষক’ কিংবা ‘পরীক্ষক’ টার্মগুলোকে সরাসরি বিলুপ্তই করা হোক, তারচেয়ে বরং আমরা নিজেরাই আমাদের জ্ঞান আর মেধাকে মূল্যায়ন করে নেই, তাতে অন্তত কষ্টলব্ধ জ্ঞানকে তাচ্ছিল্য করা বাদ দিয়ে কিছুটা হলেও সম্মান দেখাতে পারবো।

 

 

কোচিং সেন্টার প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বললে যদি বলা হয় আমি আমার বিদ্যালয়ের সাফাই গাইছি, তবে সেটি অনেক বড় ভুল হবে। কারণ বর্তমানে স্কুলের শিক্ষকদের কাছে কোচিং করা যাবে না এমন একটি নিয়ম আমরা সবাই মানি, আসলে মানতে বাধ্য হচ্ছি। আমিও এর ব্যতিক্রম না। এতে কি আদৌ আমার মত শিক্ষার্থীদের কোনো উপকার হচ্ছে? একটা বিদ্যালয়ের প্রতিটা ক্লাস হয় ৪০ মিনিট করে। ৪০ মিনিটের একটা ক্লাসে যেমন একটা পাঠ শেষ করা সম্ভব না তাই পাঠ শেষ হতে কমপক্ষে তিনটি ক্লাস লাগে। যেহেতু সময়ের স্বল্পতা থাকে কোনো শিক্ষকই কখনো হাতে ধরিয়ে পূর্ববর্তী পাঠের বিষয় পুনরায় আলোচনা করতে পারে না। আবার যদি এমন হয় কোনো একটা বিষয়ের দুইজন শিক্ষক আছে এবং নিয়ম অনুসারে একজন শিক্ষক একটি শাখায় এবং অপরজন শিক্ষক অপর একটি শাখায় সেই বিষয়ের ক্লাস নিবেন- এমনটিই হয়। কিন্তু এই ক্ষেত্রে দেখা যেতে পারে সবাই সন্তুষ্ট হতে পারে না।

 

 

আর আমি এও জানি যে সবাইকে এক সঙ্গে সন্তুষ্ট করা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব না। যেমন আমার যদি কোনো পছন্দের শিক্ষক থাকে কিংবা আমি যার পড়ানোর ধরন বেশি পছন্দ করি অথবা যার পড়ানো সহজেই আমার মাথায় ঢুকে তার ক্লাস যদি আমি না পাই তখন অবশ্যই আমার ক্ষতি হবে। এই ক্ষতিকে পোষানোর জন্য হয়তো আমার বাবা-মা আমাকে একটি কোচিং সেন্টারে ভর্তি করাবেন, যেখানে মাত্র ৪/৫ বছর আগে আমার ক্লাস পাস করা একজন ভাইয়া বা আপু আমাকে সেই বিষয়টি পড়াবেন। এখন ভাবুন, সেই আপু বা ভাইয়া কি আমার সকল প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে যে প্রশ্নগুলো যারা কখনোই তাদের শিক্ষকদের করেননি? একজন শিক্ষক সবসময়ই একজন ছাত্রের চেয়ে তুলনায় ভালো জানেন। তা যদি একবিন্দু পরিমাণও হয়, তবুও তিনি বেশি জানেন।

 

তাছাড়া এমনো তো হতে পারে যে একজন শিক্ষক ক্লাসে যেটা বলতে ভুলে গেছেন পুনরালোচনা করলে হয়ত আরও কিছু কথা যোগ করে সেটা বলতে পারতেন। তাই আমি একদম সরাসরিই বলতে পারি যে এই শিক্ষানীতির ধারাটিও আমাদের সাথে হওয়া ক্ষতিকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যাচ্ছে। তবে এটাও সত্যি যে অনেক বিদ্যালয়ে এই শিক্ষানীতিটাই শপে বড় হয়ে এসেছে; কারণ অনেক শিক্ষকই এখন ক্লাসেই তার সেরাটুকু দিচ্ছেন, যা আগে দিতেন না। তবে সবক্ষেত্রে চিত্র যে এক তা নয়, বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমাদের কিছু অযোগ্য, সামান্য জ্ঞানের অধিকারী শিক্ষকদের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করতে হচ্ছে। তাই আমি আশা করি এই ব্যাপারটিকেও গুরুত্বের সাথে দেখা হবে। কারণ আমি যা জানবো, আমি শিখবো, আর আমি যত ব্যাপ্তি নিয়ে জানবো এবং শিখবো ঠিক ততোটুকুই আমি ভবিষ্যতে কাজে লাগাতে পারবো।

 

 

নিজেকে কুলি বলে পরিচয় দেওয়ার পেছনের কারণটা নিশ্চয় এখন পরিষ্কার। এই চাপটা আমি কিছুটা সহ্য করে যাচ্ছি বলেই এই কথাগুলো বলার সুযোগ হয়েছে। কিন্তু যারা চাপটা নিতে পারে না লেখাটা তাদের সুইসাইড নোটে প্রকাশ পেয়ে থাকে, কিন্তু তা থাকে অস্পষ্টভাবে। জীবনের একটা বিষয় অনেক সময় আমাদের জীবনকেই কেড়ে নেয় আমাদের কাছ থেকে, ব্যাপারটা অনেক বেশি ভয়াবহ। একটা শিক্ষাব্যবস্থা, একটা বোর্ড পরীক্ষা, একটা ফলাফল- একটা জীবন শেষ করে ফেলতে যথেষ্ট হয়ে গেছে আজ।

 

একবিংশ শতাব্দীতে এসেও আমরা সাহসী হয়ে উঠতে পারিনি, লড়াইও করতে পারছি না; কারণ দিনশেষে লড়াইটা ভালো থাকার না, বেঁচে থাকার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আশা করি আমার প্রতিটা বাক্য মিলিয়ে দেখা হবে এবং আমার ভুলগুলো শুধরানোর সুযোগ দেওয়া হবে। হয়তো আজ আমি শিখলে কাল আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাও ভুলকে স্বীকার করে শুধরে যাওয়া শিখে যাবে। তখন হয়তো লেখাপড়াকে আর চাপ বলে মনে হবেনা, নিজেকেও কুলি না ভেবে শিক্ষার্থী ভাবতে পারবো।

সুমাইয়া হোসেন লিয়া

ক্লাস: নাইন

ভিকারুন্নিসা নুন স্কুল এন্ড কলেজ