প্রথমবার্তা ডেস্ক রিপোর্ট :       এখনও খেলাপি ঋণের শীর্ষে বহুল আলোচিত সেই পাঁচটি ব্যাংক। ঋণ কেলেঙ্কারির মাধ্যমে পরিচিত পাওয়া ওই ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ এখন ৩০ হাজার ৪৩৯ কোটি টাকা।

 

ব্যাংকগুলো হলো— সোনালী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক, বেসরকারি খাতের ইসলামী ব্যাংক ও রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন পাওয়া ফারমার্স ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে।

জানা গেছে, ঋণের টাকা আদায় করতে না পেরে বহুল আলোচিত এই পাঁচটির মতো বাকি ব্যাংকগুলোও খেলাপির পরিমাণ কমাতে পুনঃতফসিল প্রক্রিয়াকে বেছে নিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের শেষ দুই কার্যদিবসে রাত পর্যন্ত বিশেষ ব্যবস্থায় অফিস চালু রেখে বাংলাদেশ ব্যাংক পুনঃতফসিলের আবেদন অনুমোদন দিয়েছে। এরপরও ২০১৭ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৪ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা।

সোনালী ব্যাংকঃ
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৫৭টি ব্যাংকের মধ্যে খেলাপি ঋণে সবার শীর্ষে আছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক। ১৩ হাজার ৭৭১ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ সৃষ্টি হওয়ায় ৫৬টি ব্যাংককে পেছনে ফেলে এই প্রতিষ্ঠান উঠে গেছে এক নম্বরে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনু্যায়ী, ২০১৭ সাল শেষে সোনালী ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৬ হাজার ১৩১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩৮ দশমিক ১১ শতাংশ ঋণই এখন খেলাপি। এর মধ্যে ১২ হাজার ১৩৬ কোটি টাকাই মন্দ ঋণ। অর্থাৎ এই পরিমাণ অর্থ হয়তো আর ফেরত পাওয়া যাবে না।

তবে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ বলেন, সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ সবার চেয়ে বেশি হলেও এই ব্যাংকটি আগের চেয়ে অনেক ভালো করছে। বর্তমান ব্যাংকের প্রশাসন সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছে খেলাপি আদায়ে। এর সুফল আগামীতে পাওয়া যাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ২০১০-১২ সালের মধ্যে হলমার্ক ঋণ কেলেঙ্কারির মাধ্যমে সোনালী ব্যাংক থেকে ৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি পরিমাণ অর্থ বের করে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে শুধু সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখা থেকেই জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয় ৩ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৬ সাল শেষে সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ১০ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। ২০১৭ সাল শেষে খেলাপির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৭৭১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে এই ব্যাংকটিতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। সোনালী ব্যাংকের শাখা ১ হাজার ২১১টি। এর মধ্যে লোকসানে রয়েছে ১৮১টি শাখা।

বেসিক ব্যাংকঃ
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের শীর্ষে থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বেসিক ব্যাংক। এই ব্যাংকটিতে এখন খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৭ হাজার ৫৯৯ কোটি টাকা। যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৫২ দশমিক ৭৩ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সাল শেষে বেসিক ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৪১২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৭ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকাই মন্দ ঋণ। অর্থাৎ এই পরিমাণ অর্থ হয়তো আর ফিরে পাওয়া যাবে না।

ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুর আমলে মাত্র ১১ মাসে (২০১২ সালের এপ্রিল থেকে ২০১৩ সালের মার্চ পর্যন্ত) নজিরবিহীন অনিয়মের মাধ্যমে ঋণের নামে বের হয়ে যায় প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা।

জনতা ব্যাংকঃ
খেলাপি ঋণের শীর্ষে থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে তৃতীয় স্থানে আছে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের আরেক আলোচিত নাম জনতা ব্যাংক। এই ব্যাংকে এখন খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ হাজার ৮১৮ কোটি টাকা। যা মোট বিতরণ করা ঋণের ১৪ দশমিক ১০ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সাল শেষে জনতা ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪১ হাজার ২৬৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৪ হাজার ৯৮০ কোটি টাকাই মন্দ ঋণ। অর্থাৎ এই পরিমাণ অর্থ হয়তো আর ফিরে আসবে না।

রাষ্ট্রায়ত্ত এই ব্যাংকে একক ব্যক্তির ঋণে সবচেয়ে বড় ধরনের ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। এননটেক্স নামে একটি গ্রুপকে মাত্র ছয় বছরে ব্যাংকটি ঋণ দিয়েছে ৫ হাজার ৫০৪ কোটি টাকার ঋণ ও ঋণ সুবিধা। নিয়মনীতি না মেনে এভাবে ঋণ দেওয়ায় এখন বিপদে পড়েছে ব্যাংকটি।

জনতা ব্যাংকের মোট মূলধন ২ হাজার ৯৭৯ কোটি টাকা। ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, মূলধনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ একজন গ্রাহক ৭৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিতে পারবেন না। অথচ তাকে দেওয়া হয়েছে মোট মূলধনের প্রায় দ্বিগুণ।

ইসলামী ব্যাংকঃ
খেলাপি ঋণের শীর্ষে থাকা বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ এখন আলোচিত ইসলামী ব্যাংকের। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সাল শেষে ইসলামী ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫২৯ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকটি বিতরণ করেছে ৬৭ হাজার ৮৩১ কোটি টাকার ঋণ।

এ ব্যাপারে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান আরাস্তু খান বলেন, বেসরকারি ব্যাংকগুলোর তুলনায় পরিমাণের দিক থেকে বেশি দেখালেও শতাংশের হিসাবে ইসলামী ব্যাংকে খেলাপি ঋণ খুবই সামান্য। খেলাপির হিসাব যেভাবে করা হয়, তাতে ইসলামী ব্যাংক অন্য যে কোনও ব্যাংকের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। তবে ইসলামী ব্যাংক খেলাপি ঋণ আদায়ে আগের চেয়ে আরও বেশি সর্তক।

ফারমার্স ব্যাংকঃ
২০১৭ সাল জুড়ে ব্যাংকিং খাতে আলোচনায় উঠে আসে রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন পাওয়া ফারমার্স ব্যাংকের নাম। সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ সৃষ্টি হয়েছে ফারমার্স ব্যাংকে। শুধু তাই নয়, নতুন অনুমোদন পাওয়া বাকি আটটি ব্যাংকের সম্মিলিত খেলাপি ঋণের চেয়েও প্রায় দ্বিগুণ খেলাপি হয়েছে ফারমার্স ব্যাংকেই।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বরের শেষে নতুন আট ব্যাংকের খেলাপি ঋণ (ফারমার্স ব্যাংক ছাড়া) ৪২৪ কোটি টাকা। অথচ একই সময়ে কেবল ফারমার্স ব্যাংকে খেলাপির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭২৩ কোটি টাকা, যা ঋণের ১৪ শতাংশ।

আগের বছরের ডিসেম্বরে ব্যাংকটির খেলাপি ছিল ১৭১ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকটিতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৬ গুণ। এই ব্যাংক গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিতরণ করেছে ৫ হাজার ১৩০ কোটি টাকার ঋণ। এর মধ্যে ৩৩৯ কোটি টাকাই মন্দ ঋণ। অর্থাৎ এই পরিমাণ অর্থ ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই।

এ প্রসঙ্গে ফারমার্স ব্যাংকের উপদেষ্টা প্রদীপ কুমার দত্ত বলেন, আগের সমস্যার কারণে ফারমার্স ব্যাংকে খেলাপির পরিমাণ এখন বেশি। তবে ধীরে ধীরে সব সমস্যা কেটে যাচ্ছে। গ্রাহকদের টাকার সমস্যাও প্রায় সমাধানের পর্যায়ে চলে এসেছে।

সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীরের প্রতিষ্ঠিত ফারমার্স ব্যাংক ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে বর্তমানে দেউলিয়া পর্যায়ে রয়েছে। আর্থিক সংকটের কারণে গ্রাহকরা তাদের আমানতও তুলতে পারছেন না মাসের পর মাস।

ব্যাংকটি থেকে ছোট-বড় সব ধরনের গ্রাহক নিজেদের টাকা ওঠানোর জন্য আবেদন করে রেখেছেন। কিন্তু ব্যাংকটি প্রতিবারই তাদের ফেরত পাঠাচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, সরকারের জমা রাখা জলবায়ু তহবিলের টাকাও ফেরত দিতে অপারগতা প্রকাশ করেছে ফারমার্স ব্যাংক।