প্রথমবার্তা ডেস্ক রিপোর্ট : তোজো গত মাসে পাঁচ বছর পূর্ণ করল। অনেক ধুমধাম করে অনেক বেলুন, কেক, গিফ্ট এবং রিটার্ন গিফ্টের সমারোহে ওর বাবা-মা ছেলের জন্মদিন পালন করেছিলেন। পরের দিন ওর মা ওকে বলেছিলেন জন্মদিনের বিপুল উপহারের স্তূপ থেকে একটি খেলনা কাজের মাসির ছেলেকে দিতে। ব্যস, সেই যে তোজোর গোঁসা হল, তা কমাতে একটা নতুন স্পাইডার ম্যান টি-শার্ট দিতে হয়েছিল ওর মা-কে।

আপনারা যাঁরা ছেলে-মেয়ের এহেন আচরণে ঈষৎ খুশি হয়ে ভাবছেন, এ নিশ্চয়ই বড় হয়ে ‘অন্যদের একটি ভোটও দিলে ভাল হবে না’ বলে পাড়া মাত করবে, তাঁরা ঠিকই ভাবছেন। কিন্তু অন্যরা, যাঁরা সন্তানের মধ্যে জমতে থাকা হিংসার এই বীজকে নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন, তাঁদের বলি আপনার আদরের আত্মজটিকে এক পরোপকারী সহনাগরিক হিসাবে গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্বের কয়েকজন শিশু বিশেষজ্ঞরা। চলতি হাওয়ায় স্নেহ আর শাসনের এই যুগলবন্দিই সন্তানকে করে তুলতে পারে সুনাগরিক। কিন্তু কীভাবে?

 

‘সকলের তরে সকলে আমরা/ প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’, এই মন্ত্রে দীক্ষিত করতে হলে সবার আগে ভাল-মন্দের ফারাকটা বাতলে দিন আপনার খুদেটাকে। বিদ্যাসাগর মশাই বর্ণপরিচয়ে গোপাল-রাখালের চরিত্র বৈষম্যের মধ্যে দিয়ে ভাল-মন্দকে চিনিয়ে দেওয়ার প্রচলন করেছিলেন। কিন্তু আজকের শিশুবিদরা একটু অন্য রকমের শিশুশিক্ষায় বিশ্বাসী। তাঁদের মতে খারাপ-ভালর এমন উদাহরণ তৈরি করার মধ্যে দিয়ে আপনার খুদেটির মনে গোপালের প্রতি শ্রদ্ধার সঙ্গে সঙ্গে রাখালের প্রতি এক তীব্র ঘৃণাও তৈরি হচ্ছে। তাই ভাল কাজের প্রশংসা করার থেকে ভাল কাজের জন্য বাচ্চাটির প্রশংসা করা আখেরে কাজে দেবে। যেমন ধরুন, যখন আপনার ছেলে একটি চকোলেট ওর বোনের সঙ্গে ভাগ করে খাচ্ছে, দুইভাবে ওর প্রশংসা করা যেতে পারে। এক, ‘ভাগ করে খাওয়া ভাল কাজ, সবসময় ভাগ করে খাবে’। দুই, ‘তুমি গুড বয়, শেয়ার করে খেলে সবাই গুড বয় বলে’। বিশেষজ্ঞরা একের থেকে দুই নম্বর বাচ্যটিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। এতে ছোটদের মধ্যে এক আত্মমর্যাদা তৈরি হয়। এই অনুভূতিটাই ওদের আরও ভাল হওয়ার দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

তবে এর উল্টো দিকে খারাপ কাজের জন্য নিন্দা করাটা কিন্তু একই রকম ভাবে না করাটাই ভাল। এক্ষেত্রে প্রকাশিত সমীক্ষাটি বলছে, খারাপ কাজের জন্য শিশুকে নিন্দা করা হলে তাদের মধ্যে হীনমন্যতা এবং অপরাধবোধের জন্ম হয়। এই অপরাধবোধ ভবিষ্যতের জন্য মোটেও ভাল নয়। বরং মন্দ কাজটিকে নিন্দা করুন। খাবার নষ্ট করার জন্য ওকে বকাঝকা করার চেয়ে বলে দিন, খাবার অপচয় করাটা খারাপ। জানান পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ মানুষের অনাহারের কথা। দেখবেন ওর ছোট্ট হৃদয়ে জমে থাকা সমবেদনা উপচে পড়ছে।

 

নতুন এই গবেষকের দল আরও বলেছেন, শিশুদের শেখান অন্যের দুঃখে কাঁদতে, অন্যের আনন্দে আনন্দ পেতে। রাস্তার অভুক্ত কুকুরকে খেতে দিতে চাইলে বুঝবেন, ও অন্যকে ভালবাসতে শিখছে, ওকে বাধা দেবেন না। নয় তো ও কিন্তু কাল কোনও কুকুর ছানাকে অকারণে ঢিল ছুঁড়ে আনন্দ পাবে। ললিপপের লোভ দেখিয়ে কান্না ভোলাবেন না। ওর বাকি জীবনটা ওই ললিপপের পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতেই কেটে যাবে। পড়া না পারলে বকুনি না দিয়ে, আঁকার খাতায় আঁকাবাকা ঘরবাড়ির ছবিগুলি দেখে বুকে তুলে নিন। উপহার, চকোলেট, খেলনার উৎকোচ পরিহার করুন। বদলে কোলে তুলে নিন। সারাদিন অফিসের পর আপনার ওই আদরটুকুই হবে ওর সারাদিনের সেরা প্রাপ্তি। তাতে যতটা স্বতস্ফূর্তভাবে শিখবে, মানুষ হবে- তেমন আর কিছুতে না!