প্রথমবার্তা ডেস্ক রিপোর্ট :     এত ধর্ষণ ঘটছে দেশে, এত ধর্ষণ, তার পরও সবাই চুপ হয়ে আছে। কোথাও কোনও প্রতিবাদ নেই। ধর্ষণ করে তরুণীকে রেলের তলায় ফেলে টুকরো টুকরো করেছে ধর্ষকের দল, ধর্ষণ করে গলা কেটে ধানক্ষেতে ফেলে রেখেছে কিশোরী মেয়েকে। চার বছর পাঁচ বছর বয়সী মেয়েদের তো ধর্ষকরা রেহাই দিচ্ছে না, এক বছর ১১ মাসের বাচ্চাদেরও রেহাই দিচ্ছে না। প্রায় প্রতিদিনই শিশু কিশোরী তরুণী যুবতী রমণী মহিলা— কেউ না কেউ ধর্ষকের শিকার হচ্ছে। আমরা তো স্বামীদের ধর্ষণের কথা ধরিই না। ওই ধর্ষণকে বৈধ বলেই ধরে নিই। কত স্বামী যে স্ত্রীদের অনিচ্ছে সত্ত্বেও জোর খাটিয়ে যৌন সম্পর্ক করছে। এর নামই তো ধর্ষণ। প্রতিদিন মেয়েরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে তো বটেই, প্রায় প্রতিদিনই কোনও না কোনও মেয়েকে খুন করা হচ্ছে। তার পরও, অবাক হই, কোথাও কোনও প্রতিবাদ নেই। যে দেশের যুবশক্তি শাসক-শক্তির অনাচার আর অত্যাচারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে একটি দেশকে স্বাধীন করে ফেলেছে বলে আজও গর্ব করে, সে দেশের যুবশক্তি ধর্ষক-শক্তির অনাচার আর অত্যাচারের বিরুদ্ধে চুপ হয়ে বসে থাকে কী করে?

 

সেদিন আফসানা কিশোয়ার লোচন নামের একটি মেয়ে কাউকে সংগে না পেয়ে একাই হাতে লেখা একটি কাগজ নিয়ে ঢাকার একটি ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়েছিল। তার ওই বড় কাগজটিতে লেখা ছিল ‘একজন পুরুষই পারে আগামীকালের একটি সম্ভাব্য ধর্ষণ বন্ধ করতে’। হাজার হাজার নারী-পুরুষের তো লোচনের মতো পোস্টার হাতে দাঁড়ানোর কথা, কেন দাঁড়ায়নি? ঘাটে মাঠে হাটে, ব্রিজে, বাজারে, রাস্তায়, গলিতে, ইস্কুলে কলেজে মানুষ পোস্টার হাতে, প্ল্যাকার্ড হাতে, ব্যানার হাতে দাঁড়াচ্ছে না কেন? কেন চিৎকার করে ধর্ষণবিরোধী স্লোগান দিয়ে মানুষকে সচেতন করছে না? এসব করলে ধর্ষণ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে না তা ঠিক, কিন্তু একটি পুরুষও যদি পোস্টারগুলো পড়ে, স্লোগানগুলো শুনে ধর্ষণ বন্ধ করে, তাহলেই তো অনেক। একটি পুরুষ তো একশটি অথবা তারো বেশি ধর্ষণের ক্ষমতা রাখে। তাহলে একটি পুরুষের ধর্ষণ বন্ধ করা মানে একশটি অথবা তারো বেশি ধর্ষণ বন্ধ হওয়া। আমি আজও অপেক্ষা করছি, বাংলাদেশের শহরে শহরে পুরুষের বিশাল মিছিল দেখার, শুভবুদ্ধিসম্পন্ন পুরুষেরা দেশের তাবৎ পুরুষকে বলবে ধর্ষণ বন্ধ করতে। ওরা তো ‘ম্যান টু ম্যান’ ব্যাপারটাকে বেশ গুরুত্ব দেয়।

এত ধর্ষণ ঘটে, এত ধর্ষণ! সে কারণে অভিভাবকরা বলছেন মেয়েরা যেন রাস্তায় না বেরোয়। বাংলাদেশে রাস্তাটা মেয়েদের জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠছে। কিন্তু রাস্তায় না বেরোলে মেয়েদের সমস্যা ঘুচে যাবে তা তো নয়। পুরুষেরা যেমন রাস্তায় বেরোয়, মেয়েদেরও একই সংখ্যায় রাস্তায় বেরোনো উচিত। ঘরই মেয়েদের স্থান, এবং ঘর এবং বাহির— দুটোই পুরুষের, এগুলো পুরনো পুরুষতান্ত্রিক বাণী। এসব নারীবিরোধী ষড়যন্ত্র থেকে নারীর মুক্তি পাওয়ার কথা অনেক আগেই।

দু’দিন আগে পাকিস্তানের মেয়েরা এক অভিনব র‌্যালি করেছে। সেটি হলো বাহিরকে, যে বাহির দীর্ঘ বছর যাবৎ পুরুষের দখলে, মেয়েরা আবার ফিরে পেতে চায়। এ কথা তো ঠিকই, পাশ্চাত্যের দেশগুলো ছাড়া অন্য দেশগুলোর রাস্তাঘাটে মেয়েদের সংখ্যা অতি কম। আসলে, যে দেশ যত সভ্য, সে দেশের রাস্তায় মেয়েদের সংখ্যা তত বেশি। রাস্তায় মেয়েদের সংখ্যা বেশি, কারণ মেয়েরাও পুরুষের মতো অফিস আদালতে যায়, ইস্কুল কলেজে যায়, মেয়েরাও ব্যবসা বাণিজ্য করে। সে কারণেই পুরুষের মতো মেয়েদেরও ঘরের বাইরে বেরোতে হয়। মেয়েদের তাই সর্বত্র দেখতে পাওয়া যায়। পাকিস্তান, বাংলাদেশ, এবং আরও সব মুসলিম দেশের রাস্তায় পুরুষের চেয়ে মেয়ের সংখ্যা অত্যন্ত কম। সংখ্যা কম হলে যৌন হেনস্থা কম হবে, এই ভাবনাটা ভুল। সংখ্যা যত বেশি হবে মেয়েদের, তত ধর্ষণের পরিমাণ কমবে। মেয়েরা যদি পুরুষের মতোই সর্বত্র বিরাজ করে, কর্মক্ষেত্রে মেয়েদের সংখ্যা পুরুষের চেয়ে যদি কিছু কম না হয়, তবেই মেয়েদের শক্তিশালী, প্রভাবশালী, সমৃদ্ধশালী হিসেবে ভাবতে শিখবে যৌনহেনস্থাকারীরা, সমাজের অগুনতি ধর্ষকরা, মেয়েদের যৌনবস্তু হিসেবে যে পুরুষেরা দেখে, তারাও।

পাকিস্তানের ইসলামাবাদ, করাচি, লাহোরের মেয়েরা রাস্তায় দল বেঁধে সাইকেল চালিয়েছে। সাইকেলে বাঁধা পোস্টারে লেখা, ‘সাইকেল চালাও, পেট্রিয়ার্কি দাবাও’। সাইকেল চালিয়ে পুরুষতন্ত্রকে কবর দিয়ে দাও। মেয়েরা সাইকেল চালালেই কিন্তু পুরুষতন্ত্রের কবর হয়ে যায় না, কিন্তু আঁচড় তো পড়ে পুরুষতন্ত্রের গায়ে, সেটিরই দরকার এখন। করাচি, লাহোর, আর ইসলামাবাদের মেয়েরা যারা সাইকেল চালিয়ে রাস্তাঘাটে স্বাধীনভাবে চলার অধিকার ফেরত চেয়েছে, তারাও ওই আঁচড়টাই দিয়েছে। পুরুষেরা হাঁ করে দেখেছে দলে দলে মেয়েরা, কারো শরীরে পুরুষতন্ত্রের বোরখা নেই, হিজাব নেই, পরনে জিন্স, পরনে টিশার্ট, পরনে শুধু সালোয়ার আর কামিজ— সাইকেল চালাচ্ছে একঝাঁক শিক্ষিত সচেতন, উচ্ছল উজ্জ্বল বুদ্ধিদীপ্ত মেয়ে।

পুরুষ ভেবে নিয়েছে দুনিয়াটা তাদেরই, যেহেতু দুনিয়ার সর্বত্র তারাই চলাচল করে। মেয়েদের দেখা যায় না, যেহেতু তারা ঘরের চার দেয়ালের আড়ালে থাকে, নয়তো রাস্তায় বেরোলেও বোরখা হিজাবের আড়ালে থাকে। মূলত মেয়েদের লুকিয়ে থাকার অথবা দৃশ্যমান না হওয়ার পুরুষতান্ত্রিক ষড়যন্ত্রটা বেশ চমৎকার কাজে লেগেছে। মেয়েরাও এই ফাঁদে পড়ে নিজেদের আড়াল করতে শিখেছে। নিজেদের জন্মগত স্বাধীনতাকে মূর্খের মতো বিসর্জন দিতে শিখেছে।

পাকিস্তানের সচেতন সাহসী মেয়েরা যেভাবে সাইকেল চালিয়ে প্রতিবাদ করেছে, জানিনা বাংলাদেশের মেয়েদের পক্ষে এরকম প্রতিবাদ সম্ভব কিনা। বাংলাদেশের শহরের মেয়েরা কি সাইকেল চালাতে পারে? আমার জন্ম এবং বড় হওয়া ময়মনসিংহ শহরে। আমি আজও জানি না কী করে সাইকেল চালাতে হয়। কারণ শৈশব কৈশোরে আমাদের সাইকেল চালানো বারণ ছিল। আইনের বারণ হয়তো ছিল না, কিন্তু সমাজের বারণ ছিল। আমি তো সাঁতার কাটতেও জানতাম না দেশে থাকাকালীন। জার্মানিতে শিখেছি সাঁতার। বাংলাদেশের মেয়েদের থেকে, মাঝে মাঝেই মনে হয়, এগিয়ে আছে পাকিস্তানের মেয়েরা। পাকিস্তানেও ধর্ষণ-নির্যাতনের শিকার হচ্ছে মেয়েরা। পাকিস্তানেও মৌলবাদ আর সন্ত্রাসবাদীদের উৎপাত প্রচণ্ড। কিন্তু এসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ পাকিস্তানে বেশি হয়। মনে আছে মুক্তারমাইয়ের কথা? গণধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন ২০০২ সালে। তারপর বিশ্বজুড়ে সেই ধর্ষণের প্রতিবাদ তিনি করেছেন। ক্ষমতাশালী বিত্তশালী সব ধর্ষকদের জেলে পাঠিয়েছেন। নিজে এখন ‘মুক্তারমাই ওয়েলফেয়ার কেন্দ্র’ খুলেছেন, যে কেন্দ্র থেকে মেয়েদের তিনি শিক্ষিত করেন, সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন। মুক্তারমাইয়ের প্রতিবাদ নিঃসন্দেহে বিশাল প্রতিবাদ। এরকম প্রতিবাদ বাংলাদেশের মেয়েরা এখনও করে উঠতে পারেনি। এখনও বাংলাদেশের মেয়েরা ধর্ষণের পর মুখ লুকিয়ে রাখে, এখনও লজ্জায় ঘৃণায় আত্মহত্যা করে।

কিছুদিন আগে তো ইরানেও হলো বাধ্যতামূলক হিজাবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। মাথার হিজাব খুলে লাঠির মাথায় বেঁধে পতাকার মতো উড়িয়েছে মেয়েরা। মেয়েদের বিরুদ্ধে সারা পৃথিবীতেই অন্যায় অত্যাচার হচ্ছে। কোথাও কোথাও এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ হচ্ছে, কোথাও মৃদু প্রতিবাদ, কোথাও নামকাওয়াস্তে, কোথাও কোনও প্রতিবাদই হচ্ছে না। মনে রাখতে হবে, দেশ যত সভ্য, প্রতিবাদ তত বেশি।

বাংলাদেশ কি তবে কোনও অর্থেই সভ্য দেশের আওতায় পড়ে? না, পড়ে না। কিন্তু দেশকে সভ্য দেশ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য তো চেষ্টা চালাতে হবে। শুধু মেয়েরা একা চেষ্টা করলে কোনও লাভ হবে না। পুরুষকেও চেষ্টা করতে হবে। মেয়েরা কোনও আলাদা প্রজাতি নয় যে পুরুষেরা এই প্রজাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছে। এই পৃথিবীর নারী পুরুষ একই প্রজাতির অংশ। এই প্রজাতি নিজেদের মধ্যে যুদ্ধে না নেমে বরং মিলে মিশে নিজেদের যতটা সভ্য করা যায়, করুক। ধর্ষণ খুন বন্ধ হোক, নারীবিদ্বেষ নিপাত যাক, ঘৃণা নিপাত যাক। ভালোবাসাই সত্য হোক। সত্য হোক ভালোবাসাই।