প্রথমবার্তা ডেস্ক রিপোর্ট :     ‘রহিম সাহেব’ বিয়ে করেছেন তিনটি। দুই স্ত্রী বর্তমান, থাকেন আলাদা বাড়িতে। নারায়ণগঞ্জের নিউ চাষাঢ়া এলাকার যে বাড়িটি বন্ধক রেখে তিনি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিলেন, সেই বাড়িতে কনিষ্ঠ স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করছেন। তবে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তিনি বাসায় থাকেন না। ব্যাংকের ঋণের টাকা পরিশোধের ভয়ে পালিয়ে বেড়ান। পাঁচ-ছয়টি মোবাইল ফোন সিম ব্যবহার করেন। একেক সময় একেকটি সংযোগ খোলা পাওয়া যায়।

 

এলাকাবাসীর কাছে রহিম সাহেব হিসেবে পরিচিত এই ব্যক্তিকে একজন স্বভাবজাত ঋণখেলাপি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন পাওনাদার ব্যাংকটির ঋণ কর্মকর্তারা। একের পর এক অজুহাত দেখিয়ে ব্যাংকের টাকা পরিশোধে টালবাহানা করে যাওয়া এই ঋণখেলাপির কাছে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের পাওনা সুদে-আসলে সাত কোটি ৭৬ লাখ টাকা। চার বছর ধরে ঋণটি ‘ব্লক অ্যাকাউন্টে’ না রাখলে ঋণের টাকার অঙ্ক সুদে-আসলে ১১ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেত বলে জানিয়েছেন ব্যাংকটির কর্মকর্তারা।

গত মঙ্গলবার ৬৭/৩ নিউ চাষাঢ়া, দক্ষিণ জামতলা, ফতুল্লার বাড়িটিতে গিয়ে আব্দুর রহিমকে পাওয়া যায়নি। বাড়ির তৃতীয় তলায় থাকেন তিনি। অনেকবার কলিং বেল বাজানোর পরও দরজা খোলেনি কেউ। প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আব্দুর রহিমের স্ত্রী সব সময় বাসায়ই থাকেন। আব্দুর রহিম খুব ভোরে বাসা থেকে বের হন এবং গভীর রাতে ফেরেন। বাড়িটিতে বড় করে সাইনবোর্ডে লেখা, ‘এই সম্পত্তি স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ শাখার কাছে দায়বদ্ধ।’ পাওনাদার অর্থাৎ ব্যাংকের কর্মকর্তারা তাঁর খোঁজে প্রায়ই আসেন এ বাড়িতে। তাই এ প্রতিবেদককে দেখেও স্থানীয় লোকজন জানতে চাইল ব্যাংকের লোক কি না।

দুই দাগে বাড়িটির জমির পরিমাণ মোট ১৫ শতক। ছয়তলা বাড়িটির প্রতি তলায় চারটি করে ইউনিট। ব্যাংকের দাবি, ওই বাড়ির ভাড়া বাবদ মাসে অন্তত এক লাখ ৮০ হাজার টাকা পান আব্দুর রহিম। বাড়িসহ বন্ধকি এই জমি নিলামের জন্য স্থানীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক। নিলামে অংশ নেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ এপ্রিল। এরপর জমিটি নিলাম করে টাকা আদায়ের চেষ্টা করবেন বলে জানিয়েছেন ব্যাংকটির নারায়ণগঞ্জ শাখার ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপক মো. একরামুল হক।

২০০৭ সালে আব্দুর রহিমের প্রতিষ্ঠান মেসার্স রুপু এন্টারপ্রাইজকে ৩০ লাখ টাকা সি.সি. ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে এই গ্রাহকের সম্পর্ক গড়ে ওঠে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের সঙ্গে। এরপর ব্যবসার ধারাবাহিকতা বিবেচনায় কয়েক ধাপে ঋণটি তিন কোটি ৫০ লাখ টাকায় বর্ধিত করে ব্যাংক। আব্দুর রহিমের মূলত একটি রিরোলিং মিল ছিল, যেটা থেকে উৎপাদিত রড নিজের প্রতিষ্ঠান থেকেই বিক্রি করতেন তিনি।

তবে মোটা অঙ্কের ঋণ নেওয়ার পর পরিশোধে গড়িমসি শুরু করেন তিনি। ব্যবসায় মন্দা এবং বাকি পড়ে যাওয়ার কথা বলে কিস্তি পরিশোধ বন্ধ করে দেন। একসময় ঋণটি মন্দ ঋণে পরিণত হয়। ২০১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ব্যবসায় মার খাওয়ার কথা বলে ঋণটি প্রথমবারের মতো পুনঃ তফসিল (নবায়ন) করিয়ে নেন তিনি। শর্ত ছিল প্রতি মাসে ২৫ লাখ ৩৭ হাজার টাকা কিস্তিতে তিন বছর ধরে ঋণটি পরিশোধ করবেন। কিন্তু একটি কিস্তিও দেননি তিনি। ফলে ঋণটি আবারও খেলাপি হয়ে পড়ায় দ্বিতীয়বারের মতো পুনঃ তফসিল করার আবেদন করেন আব্দুর রহিম। এই দফায় ৩২ লাখ ৩১ হাজার টাকার ২৪টি কিস্তিতে ঋণটি পরিশোধের জন্য সুযোগ দেওয়া হয় ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এবার তিনি একসঙ্গে ৩৯ লাখ ৫৩ হাজার ৮০০ টাকা দেন; কিন্তু এর পর থেকে কিস্তি পরিশোধ বন্ধ করে দেন। এরপর আর ব্যাংকমুখো হননি তিনি। গত দুই বছরে এই গ্রাহকের কাছ থেকে একটি টাকাও আদায় করতে না পেরে গত ২৯ মার্চ নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় পত্রিকায় বন্ধকি সম্পত্তি নিলামের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ শাখা।

ওই শাখার ব্যবস্থাপক একরামুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, এই গ্রাহক চাইলে টাকা পরিশোধ করে দিতে পারতেন। আসলে তাঁর খাসলত খারাপ। কিছুদিন আগেও তিনি পঞ্চবটীর ৮ শতক জমি বিক্রি করেছেন বলে আমরা জানতে পেরেছি। পাঁচ কোটি থেকে ছয় কোটি টাকায় ওই সম্পত্তি বিক্রি করলেও ব্যাংকের একটি টাকাও পরিশোধ করেননি। এদিকে সম্পত্তি নিলামে বিক্রির তোড়জোড় শুরু হওয়ায় অবস্থা বেগতিক দেখে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে মানবিক কারণে সুদ মওকুফসহ ১০ বছরে ১২০ কিস্তিতে কেবল মূল তিন কোটি ৫০ লাখ টাকা পরিশোধের সুযোগ চেয়ে আবেদন করেছেন আব্দুর রহিম। আবেদনে তিনি বলেছেন, ‘মূলত আমি এই প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী হলেও আমার অন্য দুই ভাইকে সঙ্গে নিয়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানটি চালাতাম। কিন্তু দেশের এবং আন্তর্জাতিক বাজারের উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে অন্যান্য ব্যবসার মতো লোহাশিল্পের ব্যবসায়ও ধস নামে। আমার ব্যবসায়ও অস্বাভাবিক মন্দা অবস্থা দেখা দেয় এবং মার্কেটের পাইকারদের কাছে অনেক টাকা বাকি পড়ে যায়। টাকা ফেরত না পাওয়ায় দিন দিন ব্যবসায় অবনতি ঘটে এবং ব্যাংকঋণ পরিশোধ করতে না পারার চিন্তায় আমার দুই ভাই তাদের স্ত্রীসহ সাত সন্তানের ভার আমার ওপর রেখে স্ট্রোক করে মারা যায়। আমিও দীর্ঘদিন অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে থাকি।’

এলাকাবাসী ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, এ কথাগুলো একেবারেই সত্য নয়। অন্য দুই ভাইয়ের পরিবারের সঙ্গে বলতে গেলে আব্দুর রহিমের কোনো সম্পর্কই নেই। এক প্রতিবেশী এ প্রতিবেদকে বলেন, ভাইয়ের ছেলে-মেয়েদের ওনার কোনো খোঁজখবর নেওয়ার দরকারই হয় না। তারা তাদের মতো ভালোই আছে। বরং রহিম সাহেবই অল্পবয়সী একটি মেয়েকে বিয়ে করায় এ নিয়ে আগের স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর সদ্ভাব নেই।

ব্যাংকের ব্যবস্থাপক ইকরামুল হক বলেন, ‘আমাদের শাখায় কোনো দিনও ওই গ্রাহকের ভাই বা ভাইদের পক্ষ থেকে কেউ আসেনি। আব্দুর রহিম তাঁর ভাইদের মৃত্যুকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে তিনি যে আবেদন করেছেন, সেই আবেদন আমাদের কাছেও করেছেন। আবেদনে ভাইদের মৃত্যুর সনদের যে কপি দেওয়া হয়েছে, সেটা নিয়েও আমাদের সন্দেহ আছে।’

সার্বিক বিষয়ে কথা বলার জন্য মো. আব্দুর রহিমের পাঁচটি মোবাইল ফোন নম্বরে একাধিকবার চেষ্টা করে একটি নম্বর খোলা পাওয়া যায়। তবে তিনি ফোন না ধরে বারবার কেটে দিয়েছেন।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) এক সম্মেলনে জানানো হয়, নেপালে ঋণখেলাপিদের সামাজিকভাবে হেয় করা হয় বলে কেউই ইচ্ছাকৃতভাবে খেলাপি হতে চায় না। ওই দেশে ঋণ খেলাপিরা যাতে দেশ ছেড়ে চলে যেতে না পারে সে জন্য পাসপোর্ট জব্দ করে রাখা হয়। দেশটির ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের হার ৩ শতাংশের ঘরে; যেখানে বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের হার বিতরণ করা ঋণের ৯.৩১ শতাংশ। গত ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৭৪ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা।