প্রথমবার্তা ডেস্ক রিপোর্ট :      দেশে ১৪ লাখ নারীসহ প্রায় দুই কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করছে। এ খাতে প্রতিবছর ছয় লক্ষাধিক লোকের নতুন কর্মসংস্থান হচ্ছে।

 

অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি রপ্তানির লক্ষ্যে নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়ার ফলে বাংলাদেশ এরই মধ্যে মাছ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। আর চলতি অর্থবছরে মৎস্য খাতের আয় দেশের মোট কৃষিজ আয়ের ২৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সংসদীয় কমিটিতে মন্ত্রণালয়ের পাঠানো এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ২০০৯-১০ অর্থবছরে মৎস্য উৎপাদন ছিল ২৮ দশমিক ৯৯ লাখ মেট্রিক টন, ২০১০-১১ অর্থবছরে ৩০ দশমিক ৬২ লাখ টন, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৩৬ দশমিক ৮৪ লাখ টন, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ৩৮ দশমিক ৭৮ লাখ টন এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ৪১ দশমিক ৩৪ লাখ টন। আর চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম আট মাসেই মাছের উৎপাদন ৪২ লাখ টন ছাড়িয়েছে।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০১৭-এর তথ্যানুযায়ী, দেশের মোট কৃষিজ আয়ের ২৩.৮১ শতাংশ মৎস্য খাত থেকে আসে। দেশের মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যে প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৬০ শতাংশ জোগান দেয় মাছ। আর মৎস্য খাত থেকে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৩.৬১ শতাংশ আসে। এই খাতে সার্বিকভাবে বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ৫ শতাংশের ওপর, যা আগামীতে আরো বাড়বে। দৈনন্দিন খাদ্যে প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে সরকার গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়ন ও উদ্ভাবিত প্রযুক্তিগুলো মৎস্য অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারণের ফলে এটা সম্ভব হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমিষের চাহিদা পূরণে ১৯৭৩ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মাছের উৎপাদন বাড়াতে বহুমাত্রিক কার্যক্রম গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়া পর ওই সব কার্যক্রম বাস্তবায়নে বিশেষ পদক্ষেপ নেন। যে কারণে এরই মধ্যে আমরা মাছের চাহিদা মেটাতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছি।’

তিনি আরো বলেন, মাছের উৎপাদন বাড়াতে বেসরকারি খাতকেও উৎসাহিত করা হচ্ছে। আর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় চলতি অর্থবছরে মৎস্য খাতের আয় মোট কৃষিজ আয়ের ২৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বর্তমান সরকার মাছের উৎপাদন বাড়াতে সমাজভিত্তিক মৎস্য চাষ কার্যক্রম সম্প্রসারণ, খাস জলাশয়ে মৎস্যজীবীদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত, বিল নার্সারি কার্যক্রম গ্রহণ ও মুক্ত জলাশয়ে মাছের পোনা অবমুক্ত, মৎস্য অভয়াশ্রম সৃষ্টি, ঘের ও খাচায় মাছ চাষ কার্যক্রম সম্প্রসারণ, ভরাট হয়ে যাওয়া নদী পুনঃখনন করে মাছের আবাসস্থল পুনরুদ্ধার এবং গবেষণার মাধ্যমে উন্নত প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণে কাজ করছে।

সূত্র আরো জানায়, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে বিপন্ন প্রজাতির মহাশোল, চিতল, ফলি, টেংরা ও গুতুম মাছের পোনা উৎপাদন ও চাষ, কই মাছের রোগ নিরাময়ে ভ্যাকসিন তৈরি, অ্যাকোয়াপনিক পদ্ধতিতে স্বাস্থ্যসম্মত মাছ উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নোনাপানির টেংরা ও পারশে মাছের পোনা উৎপাদন, অপ্রচলিত মৎস্য সম্পদ—যেমন কুচিয়া ও কাঁকড়ার পোনা উৎপাদন ও চাষ, মিঠা পানির ঝিনুকে ইমেজ মুক্তা উৎপাদন, সাগর উপকূলে সি-উইড চাষ ও এর ব্যবহার, বিএফআরআই মেকানিক্যাল ফিশ ড্রায়ার ব্যবহারের মাধ্যমে গুণগতমানসম্পন্ন শুঁটকি মাছ উৎপাদন এবং ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি ও সংরক্ষণে অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠাবিষয়ক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে। এ সব কারণেও মাছের উৎপাদন বাড়ছে।

মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, জাতীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে এই ইনস্টিটিউট মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রযুক্তি উদ্ভাবনে কাজ করে যাচ্ছে। ইনস্টিটিউট থেকে এরই মধ্যে মৎস্য চাষ ও ব্যবস্থাপনাবিষয়ক ৫৭টি লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে।

ফলে সাম্প্রতিকালে দেশে মাছের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। তিনি আরো বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিপন্ন প্রজাতির মাছের পোনাসহ স্বাস্থ্যসম্মত মাছ উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়ার কারণেও উৎপাদন বড়েছে। এ ছাড়া ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত উন্নত জাতের তেলাপিয়া ও রুই মাছ উৎপাদন বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে।