প্রথমবার্তা ডেস্ক রিপোর্ট :     বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী এ কে এম শাহজাহান কামাল। তিনি বলেছেন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কাউন্টারে গেলে টিকিট পাওয়া যায় না, বিমানের লোকজন টিকিট চুরি করেন বলে যাত্রীদের অভিযোগ। এই টিকিট চোরদের ধরা হবে। গতকাল বুধবার মহাখালীর হোটেল অবকাশে এভিয়েশন অ্যান্ড ট্যুরিজম জার্নালিস্টস ফোরাম অব বাংলাদেশ-এটিজেএফবি আয়োজিত ‘ফ্লাইট সেফটি : দ্য ওয়ে ফরোয়ার্ড’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।

 

শাহজাহান কামাল আরো বলেন, ‘২০০৭ সালে বিমান বাংলাদেশকে কম্পানিতে রূপান্তর করা হয়। এর পর থেকে আজকে ২০১৮ সাল, এখন পর্যন্ত শুধুই লসই দিচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত এই প্রতিষ্ঠান।’

বিমানের টিকিট চুরি প্রসঙ্গে উপস্থিত বিমানের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনাদের কাছে টিকিট আছে, আপনারা প্যাসেঞ্জারকে বলেন যে টিকিট নেই। এই যে চুরি, এই যে ডাকাতি, এটা কেন হচ্ছে। এর জন্য কারা দায়ী? আমার কাছে মঙ্গলবার একজন যাত্রী বলেছেন, তিনি লন্ডনে যাবেন। তিনি টিকিট চেয়েছেন, কিন্তু টিকিট নেই। পরে আকাশে ওড়ার আগে একজন প্যাসেঞ্জার বললেন, বিজনেস ক্লাসের ছয়টি সিট খালি আছে। এটা বিশ্বাসঘাতকতা জাতির জন্য। এটা মোনাফিকি, এই দুষ্কৃতকারী কেন হচ্ছে?’

শাহজাহান কামাল বলেন, ‘আমাকে বিমানমন্ত্রী বলা হয়। অথচ আমি দুঃখের সঙ্গে বলি, বিমান বাংলাদেশের এমডিকে এক বছরের জন্য পুনর্বহাল করা হয়েছে, এটা কি আমি জানি? আমাকে কি জিজ্ঞেস করা হয়েছে? হ্যাঁ, অন্তত একজন জিজ্ঞাসা করলে ন্যূনতম আত্মতৃপ্তি হতো।’ তিনি বলেন, ‘আমি তো বাংলাদেশ বিমানের মন্ত্রী না! আমি হচ্ছি, বেসরকারি যারা আছে যেমন—রিজেন্ট, ইউএস-বাংলা, নভো এয়ারের মন্ত্রী।’

এটিজেএফবি সভাপতি নাদিরা কিরণের সঞ্চালনায় গোলটেবিল আলোচনায় বক্তব্য দেন এয়ারক্রাফট অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন গ্রুপ অব বাংলাদেশ (এএআইজি-বিডি) প্রধান ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন এম রহমতুল্লাহ, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ-বেবিচকের ফ্লাইট সেফটি অ্যান্ড রেগুলেশন বিভাগের পরিচালক উইং কমান্ডার চৌধুরী জিয়াউল কবির, অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্ট অব বাংলাদেশ-আটাব সভাপতি মঞ্জুর মোর্শেদ, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা-সিইও ইমরান আসিফ, রিজেন্ট এয়ারওয়েজের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা-সিসিও হানিফ জাকারিয়া, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জনসংযোগ শাখার মহাব্যবস্থাপক শাকিল মেরাজ, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মোমিন প্রমুখ।

আলোচনার শুরুতে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের সিইও ইমরান আসিফ বলেন, ‘আমরা দ্রুততম সময়ে সাধ্যমতো হতাহতদের সহায়তা প্রদানের প্রাথমিক পর্ব শেষ করেছি। এই ঘটনা শুধু ইউএস-বাংলার জন্য নয়, পুরো ইন্ডাস্ট্রির দুর্ঘটনা ছিল। ঘটনা-পরবর্তীতে দেশীয় এয়ারলাইনসের প্রতি যাত্রীদের কনফিডেন্স কমেছে। এটা কাটিয়ে উঠতে গণমাধ্যমকেও আরো দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।’

নেপালে ইউএস-বাংলার দুর্ঘটনা প্রসঙ্গে এএআইজি-বিডি প্রধান ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন এম রহমতুল্লাহ বলেন, ‘উড়োজাহাজে ত্রুটি ছিল না। তবে কী কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে ফ্লাইট ডাটা রেকর্ডারের (ব্ল্যাকবক্স) তথ্য পাওয়া পর্যন্ত। তবে এটি উড্ডয়নের আগ পর্যন্ত ঠিক ছিল। বেবিচক কর্তৃক এয়ারঅর্দি সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। উড়োজাহাজটি তির্যক হয়ে কেন ল্যান্ড করল এবং রানওয়ে থেকে দূরে গিয়ে পড়ল, তা জানা যায়নি এখনো।’ তবে এ নিয়ে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ক্যাপ্টেন সৈয়দ মোজাম্মেল হক বলেন, ‘দুর্ঘটনায় ৮৫ শতাংশই হচ্ছে হিউম্যান ফ্যাক্টের কারণে। বলা হচ্ছে, ফ্লাইট সেফটির জন্য বিভিন্ন নিয়মের কথা। কিন্তু এর সব কি আমরা মানছি। আমার মতে, ইউএস-বাংলার ওই দুর্ঘটনা এড়ানো যেত। এটা চূড়ান্ত তদন্তে হয়তো বেরিয়ে আসবে।’

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এ এফ এম নুরুল আলমের মতে, নেপাল দুর্ঘটনার তদন্ত থেকে শেখার কিছু আছে। প্রথমত, ফার্স্ট অফিসার শেষ তিন মিনিট কোনো কথা বলেননি, কেন? কেনইবা তারা এটিসি (এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল) ককপিটের কথা থেমে ছিল। আর রানওয়ে থেকে পাঁচ হাজার ৬০০ ফুট ছেড়ে এয়ারক্রাফটি কেন ল্যান্ড করল, তা জানার আগ্রহ আছে সবার। এগুলোর উত্তর জানা জরুরি।

রিজেন্ট এয়ারওয়েজের ফ্লাইট সেফটি টিমের প্রধান আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘বেবিচকের উচিত তদারকি করা। আমাদের এভিয়েশন একাডেমি দরকার। অপারেশনাল কার্যক্রম অডিট করে বেবিচক। সিস্টেমের ত্রুটি আছে কি না, দেখার দায়িত্ব তাদের।’

এ নিয়ে বেবিচকের পরিচালক (ফ্লাইট সেফটি) চৌধুরী জিয়াউল কবির বলেন, ‘আমাদের রেটিং ৭৫ হয়েছে, আগে তা ছিল ৫০-এর নিচে। আমরা একটি এভিয়েশন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করব। এখন এসএসপি নিয়ে চিন্তা করছি। আইকাও এর টেকনিক্যাল করপোরেশন বোর্ডের সঙ্গে এ নিয়ে কথাবার্তা চলছে। ফেডারেল এভিয়েশন আমাদের আইন এবং জনশক্তির সমস্যা তুলে ধরেছে। দুটিরই সমাধান করেছি।’

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সাবেক এমডি ড. এম এ মোমেন বলেন, বেসরকারি এয়ারলাইনসের জন্য হ্যাঙ্গারের ব্যবস্থা করা দরকার। ঢাকার বাজারে জেট ফুয়েলের দাম বেশি। সারা বিশ্বে তেলের দাম কমলেও দেশে দাম কমে না। জ্বালানির দাম রেশনালাইজড না করলে এভিয়েশন সেক্টর টিকবে না। তিনি বলেন, বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে সবচেয়ে দুর্বল মন্ত্রীদের দেওয়া হয়। এখানে সরকারের অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে কাজ করার মতো বিচক্ষণ ও প্রভাবশালী মন্ত্রী প্রয়োজন।   প্রায় একই রকম কথা বলেন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ উইং কমান্ডার হাসান মাসুদ। এভিয়েশন খাতকে টেকাতে হলে বেবিচকের সুপারভিশন করতে হবে। সেফটি হ্যাজার্ড কী, তা নিয়ে সূচারুভাবে কাজ করা দরকার। গোলটেবিল বৈঠকে মনিটর সম্পাদক কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, ‘দুর্যোগকালে কী করতে হয়, এ নিয়ে কোনো ব্যবস্থা নেই। হলি আর্টিজানের ঘটনায় চারপাশ আটকে রেখে পর্যটকদের মনে বিরূপ বার্তা দেওয়া হয়। উড়োজাহাজ দুর্ঘটনার ক্ষেত্রেও একই দশা। তাই আমি মনে করি, দেশে ন্যাশনাল ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট কমিটি থাকা দরকার।’