প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:      প্রায় তিন বছর পেরিয়ে গেল। সমুদ্র পাড়ে ঘুমন্ত শিশু ভেবেই এগিয়ে গিয়েছিলেন তুরস্কের ওই চিত্র সাংবাদিক। ২০১৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর। সকালের আলোতে তিন বছরের আয়লান কুর্দির মরদেহটি যে কেউই ঘুমন্ত শিশু ভেবেই তো ভুল করতেন। বালির মধ্যে নিথর মুখ গোঁজা দেহটির ছবি তারপরেই ইতিহাস হয়ে যায়। কখনও কখনও শব্দের চেয়ে দৃশ্য প্রবল ও প্রখর হয়ে ওঠে।লাখ লাখ সিরিয়ান শিশুর উপর ঘটে চলা নিষ্ঠুরতার নীরব অথচ তীব্র বহিঃপ্রকাশ ছিল আয়লানের নিথর দেহ। একটি মৃত্যুর দৃশ্য কীভাবে নাড়িয়ে দিতে পারে বিশ্বজগতের চেতনাকে, কীভাবে সামনে আনতে পারে উদ্বাস্তু সংকটের বৃহত্তর সমস্যাকে তার নজির আয়লানের লাল জামা, তার মুখ থুবড়ে পড়া। তবে আমরা সকলেই আত্মবিস্মৃত।

 

 

 

 

 

তাই লাখ লাখ বার শেয়ার হওয়া, রিটুইটেড হওয়া, প্রকাশিত এবং সারা বিশ্বে আলোচনা হওয়ার পর, সময়ের নিয়মেই আমরা ভুলেই গেছি এই ছবির কথা। ভুলে যাওয়াই নিয়ম।টিমা কুর্দি আয়লানের চাচি ভোলেননি, লিখেছেন ব্যক্তিগত স্মৃতিকথা, ‘দ্য বয় অন দ্য বিচ’। এক পরিবারের সব হারানোর গল্পের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে শরণার্থীদের অধিকারের জন্য আবেদন। তিন বছর আগে সারা বিশ্বের খবরের কাগজের প্রথম পাতায় প্রকাশিত হয় আয়লানের ছবি।২০১৮ সালে এসেও পাশ্চাত্য সমাজ শরণার্থীদের গ্রহণ করার জন্য রাজনৈতিক স্বদিচ্ছা দেখায়নি না তো সাধারণ মানুষ জোর গলায় একজোট হয়েছেন শরণার্থী ইস্যুতে।ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞাকে সফল করে দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মূলত সিরিয়ার শরণার্থীদের জন্য দেশের সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে। এতসবের মাঝে পারিবারিক গল্প কি পাঠককের গহনে সহানুভূতির কোনও ছাপ আবারও রেখে যাবে? বিশ্বজোড়া শরণার্থী সমস্যা নিয়ে ভাবাবে আবার মানুষকে? টিমা কুর্দির গভীর এক চলমান যত্রণার স্মৃতিকথা আসলে সেই বিষয়েই আবারও নাড়া দিতে চায়।কুর্দির লেখা শুরু হয় কানাডায়। যেখানে তার পরিবার নিরাপদে সমুদ্র পার হয়ে যেতে পেরেছে কিনা সেই খবর ছোট ভাই আবদুল্লাহর কাছ থেকে শোনার অপেক্ষায় আছে কুর্দি। কোনও খবর আসে না।

 

 

 

 

 

চিন্তায় বেশ কয়েকদিন কাটার পর নিজের স্মার্টফোনে ভেসে ওঠে খবরের কাগজে ছাপা মৃত শিশুর ছবি। লাল টি-শার্ট এবং জিন শর্টস দেখে নিজেই আয়লানকে চিনতে অসুবিধা হয়নি টিমার। ‘ব্রেকিং নিউজ’- এই একটা শব্দই আমাদের পরিবারের জীবন ছারখার করে ফেলে।সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় কাহিনী। যুদ্ধের আগে দামাস্কাসের জেসমিন-সুগন্ধি স্মৃতি, যুদ্ধ থেকে বাঁচতে বিয়ে করে কানাডায় নিজের অভিবাসন- সব কথাই রয়েছে এই লেখায়।মাঝে মাঝে নিজের ফেলে আসা পরিবারের জন্য সিরিয়ায় যখনই পৌঁছেছেন টিমা- ধংসস্তূপ ছাড়া তখন বেঁচে নেই কিছুই, এমন পরিস্থিতিতে পালানো ছাড়া আর কিই উপায় বেঁচে থাকে মানুষের?দখলকৃত সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলের গ্রামের থেকে শরণার্থী ঘেটো- রোজের ঘটে চলা ধ্বংস আর অনিশ্চিত জীবন এই লেখার ছত্রে ছত্রে আসলে শরণার্থীর দৃষ্টিভঙ্গিই প্রবল।

 

 

 

 

 

সিরিয়ায় এই সংকটের কারণে আব্দুল্লাহর পরিবারকে কীভাবে উচ্ছেদ করা হয়েছে, তার ওপর নজর রেখে কুর্দি সিরিয়ার বিভ্রান্ত রাজনীতি ও ইতিহাসকেও ছুঁয়ে গিয়েছেন বারেবারে।অসহায় অবস্থাতে, টিমা ইউরোপের অবৈধ সীমান্ত পারাপারের জন্য চোরাচালকদের টাকা দেওয়ার জন্য জন্য ভাইকে ৫০০০ ডলার পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন টিমা।আবদুল্লাহ, তার স্ত্রী এবং দুই ছেলে রাতের অন্ধকারে একটি ভিড়ঠাসা নৌকায় তুর্কি উপকূলে পৌঁছান। ওই সীমান্ত পারাপারের ঘটনায় একমাত্র জীবিত ব্যক্তি তার ভাই। বাকি সকলেই ডুবে মারা যান ভূমধ্যসাগরে।ভূমধ্যসাগরে নিজের মা রেহানা এবং বড় ভাই গালিবের সাথেই তলিয়ে গিয়েছিল আলান কুর্দি। পেরিয়ে গেছে তিন বছর। এই বইটি ছোট্ট আয়লানের মুখ থুবড়ে পড়ার দৃশ্যের বাইরে গিয়েও অনেক কথা জানান দেয়। আসলে কিছু ছবি স্রেফ ছবি নয়, কিছু ছবি যন্ত্রণার পর্নোগ্রাফিও।কুর্দি লিখেছেন যে, বহু সাংবাদিক ও সংবাদ মাধ্যমের উপরেই বিতশ্রদ্ধ তিনি। প্রচারের স্বার্থে কুর্দি পরিবারের বহুল ঘটনার ভুল ব্যখ্যা করেছেন তারা এমনকি তাই নামও।উদ্বাস্তুদের জন্য বাকি পৃথিবীর বড় অংশের মানুষদের ক্রমবর্ধমান ঘৃণা এবং অবিশ্বাসই কুর্দির পরিবারের গল্পের পুনঃলিপির মূল অনুপ্রেরণা। সিরিয়ার বহু শরণার্থীদের জন্য এখনও নতুন আশা, নতুন বাসার স্বপ্ন দেখে এই বইটি।লেখিকার কথায়, আরবিতে একটা কথা আছে, ‘গাছকে বারবার প্রতিস্থাপিত করলে সে বাড়ে না’ আমি আশা করি যে এ কথা মানুষের জন্য সত্য নয়।