সময়টা ২০১১ সাল। তখন আমি ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর ডিগ্রি মহাবিদ্যালয়ের এইচএসসি ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। গান-বাজনা তেমন না শুনলেও, কিছু কিছু সময় গানের মাঝেই ডুবে থাকতাম। আমাদের কলেজ জীবনের শেষের দিকে মিউজিক ভিডিও জনপ্রিয়তা অর্জন করে। আর ব্যান্ড শিল্পী মানে চিনতাম আইয়ুব বাচ্চু আর জেমসকে। তবে টুকটাক জেমসের গানই শুনতাম। আর আইয়ুব বাচ্চুরে সে অর্থে চিনি মান্নার ‘লুটতরাজ’ ছবির গানের মাধ্যমে। তুমুল জনপ্রিয় গান ছিলো ‘অনন্ত প্রেম তুমি দাও আমাকে’ গানটি। এরপর ছিলো ‘আম্মাজান’। সাগরিকা ছবিতেও আইয়ুব বাচ্চুর গাওয়া ‘সাগরিকা’ গানটি বেশ জনপ্রিয় ছিলো। বলতে গেলে তাঁর প্লেব্যাকের সবগুলো গানই হিট ছিলো।

 

 

 

 

যায় হোক, আইয়ুব বাচ্চুকে মূলত ছায়াছবির কারণেই চিনা আমার। তবে উনাকে কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিলো ২০১১ সালে। তখনও বুঝতাম না একটা মানুষ এতো জনপ্রিয় হতে পারে। যখন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা স্টেডিয়ামে কনসার্টের আয়োজন হলো তখন আমরা বন্ধুরা প্ল্যান করলাম একসাথে যাবো। কনসার্ট হওয়ার একমাস পূর্ব থেকেই আলোচনা আইয়ুব বাচ্চু আসছে, আইয়ুব বাচ্চু আসছে। যার কারণে আমারো একটা ভিন্ন আগ্রহ ছিলো মানুষটার জনপ্রিয়তা কাছ থেকে দেখার।

 

 

 

যেদিন কনসার্ট সেদিন সকাল দশটা থেকেই বন্ধুদের নিয়ে স্টেডিয়ামের পূর্ব দিকে বসে অপেক্ষা করা কখন আইয়ুব বাচ্চু আসবে। একটু পর পর আকাশের দিকে তাকাতাম কারণ উনি হেলিকপ্টারে আসবে এজন্য।

 

 

 

 

দুপুরের দিকে কনসার্ট শুরু হলো। দেবাশীষ বিশ্বাসের উপস্থাপনায় প্রথমে মঞ্চে গাইলো কণ্ঠশিল্পী মিলা, তারপর হৃদয় গান। তখনো মাঠে জনসমাগম তেমন একটা নেই। সবাই এদিক দিক-বেদিক হাটাহাটি করছে। যেনো প্রাণহীন আনন্দ উপভোগ করছে।

 

 

 

ঘড়ির কাটা যখন তিনটা পেরুলো তখনই আকাশের পশ্চিম দিকে হেলিকপ্টার দেখা গেলো। আস্তে আস্তে সেটা নিচের দিকে গিয়ে উত্তর পাশ থেকে মোচড় দিয়ে হেলিপ্যাডে অবতরণ করলো। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে চোখে পড়লো আইয়ুব বাচ্চুকে তাঁর দলবলসহ হেলিকপ্টার থেকে নামতে। এই প্রথম আমি তাঁকে সামনাসামনি দেখছি। ভেতরে চাপা আনন্দ কাজ করছে। মাঠের দর্শক হুমড়ি খেয়ে এক জায়জায় জড়ো হয়ে গেলো। তিল ধরার জায়গাটুকও নেই। আমি বিস্ময়ে ভাবছি, যেখানে কিছুক্ষণ আগেও ফাঁকা জায়গার অভাব ছিলোনা সেখানে অল্পসময়ে এতো মানুষ!

 

 

 

 

স্টেজে উঠে আইয়ুব বাচ্চু অভিবাদন জানালেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরকে। তারপর শুরু তার গিটারের মুগ্ধতা। গিটারে যেনো একপ্রকার নেশা ধরিয়ে দিলো। তাঁর গিটারের যাদুতে তখন উত্তাল পুরো স্টেডিয়াম। জাতীয় সঙ্গীত দিয়ে পারফরমেন্স শুরু। ‘মেয়ে’ গানটা তখনই আমি প্রথম শুনি। যখন মেয়ে বলে সুর টান দিলো, তখন দর্শকদের সে কী উচ্ছ্বাস! আমি মুগ্ধ নয়নে তা পরখ করছি। দেখছি পুরো ব্রাহ্মণবাড়িয়া যেনো তাকে শুনছে।
একজন শিল্পীর এতো জনপ্রিয়তা আমি আগে কখনো স্বচক্ষে দেখিনি। আর এলআরবি ব্যান্ডের প্রতি ভালোলাগা তখন থেকেই শুরু, যা আজ অবধি চলছে, চলবে। তাঁর গাওয়া এলআরবি ব্যান্ডের প্রত্যেকটি গানই জনপ্রিয়তার উচ্চ শেখরে পৌঁছেছে। আমি দেখেছি একটি শহরে তাঁকে নিয়ে মেতে থাকতে। যেনো আইয়ুব বাচ্চু ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।

 

 

 

 

সম্প্রতি তিনি সদ্য প্রয়াত হয়েছেন এ পৃথিবী থেকে। তবে তার সৃষ্টি চিরকাল থাকবে ভক্তদের মাঝে। এরকম গিটারের যাদুকরের হয়ত আর জন্ম হবে না এদেশে মাটিতে। তবে তিনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন আমাদের অন্তরে, হৃদয়ের মণিকোঠায়। আইয়ূব বাচ্চু, আপনি আসবেন ফিরে গানে গানে, রুপালি গিটার হাতে।

 

 

 

পরিশেষে একটাই প্রার্থনা, আল্লাহ যেনো আপনাকে জান্নাত দান করেন। যেখানেই থাকুন ভাল থাকুন গুরু আইয়ুব বাচ্চু। আপনার সৃষ্টি গান, গিটারের যাদু কখনো ভোলার নয়।

 

 

লেখক: দৈনিক বাংলাদেশ জার্নাল-এর একজন সাংবাদিক