প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক: ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর ওই এলাকায় আঁখ কাটার কথা বলে সাঁওতালদের বসতি উচ্ছেদ করতে যায় রংপুর চিনিকল কর্তৃপক্ষ। একপর্যায়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হন তিন সাঁওতাল শ্যামল হেমব্রম, মঙ্গল মার্ডি ও রমেশ টুডু। চোখ হারান দ্বিজেন টুডু; আহত হয় অসংখ্য সাঁওতাল। অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে ওই দিন। পৌর শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ, মোমবাতি প্রজ্বালন ও এক মিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে হতাহত সাঁওতালদের স্মরণ করা হলো গতকাল মঙ্গলবার। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাহেবগঞ্জ বাগদা ফার্মে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল। তিনি অনুষ্ঠানে বলেন, ‘সাঁওতালপল্লীর সেই হত্যাকাণ্ড, অগ্নিসংযোগ ও লুটের ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করছি। এ রকম একটি নিষ্ঠুর, অমানবিক ও মানবাধিকার লঙ্ঘন করার মতো ঘটনা স্বাধীন বাংলাদেশে ঘটা আমাদের জাতির জন্য লজ্জাজনক।’

 

 

 

 

সুলতানা কামাল বলেন, ‘এই মানুষেরা ঠিক যে অবস্থায় ছিল, সেই জায়গায় তাদের ফিরিয়ে আনা হোক। তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হোক, যাতে তারা যেভাবে জীবন চালাচ্ছিল, অন্তত সেই জায়গায় পৌঁছতে পারে।’ দীর্ঘদিন ধরে সাঁওতাল-বাঙালিরা পৌর এলাকায় সমাবেশ করতে চাইলেও অনুমতি দেয়নি প্রশাসন। এবার সেই কাঙ্ক্ষিত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। বিশাল শোভাযাত্রা মাদারপুর জয়পুর গ্রাম থেকে বের হয়ে দীর্ঘ ১২ কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করে গোবিন্দগঞ্জ পৌর শহীদ মিনারে গিয়ে সমাবেশস্থলে গিয়ে শেষ হয়। সাহেবগঞ্জ বাগদা ফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটি, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, বাংলাদেশ আদিবাসী ইউনিয়ন, জন-উদ্যোগ, আদিবাসী-বাঙালি সংহতি পরিষদ গোবিন্দগঞ্জ পৌর শহীদ মিনারে এই আদিবাসী-বাঙালি এ সমাবেশের আয়োজন করে।

 

 

 

 

সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির সভাপতি ফিলিমন বাসকের সভাপতিত্বে ওই সমাবেশে আরো বক্তব্য দেন ঐক্য ন্যাপ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম, মানবাধিকার ও ভূমি অধিকার কর্মী শামসুল হুদা, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও জেলা সভাপতি মিহির ঘোষ, জাতীয় আদিবাসী পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন, আদিবাসী-বাঙালি সংহতি পরিষদ গাইবান্ধার আহ্বায়ক সিরাজুল ইসলাম বাবু, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদ নওগাঁ জেলা সমন্বয়ক জয়নাল আবেদিন মুকুল, ওয়ার্কার্স পার্টির রংপুর জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য অশোক সরকার, জেএসডি গাইবান্ধার জেলা সভাপতি লাসেন খান রিন্টু, জাসদ রংপুর মহানগর সভাপতি গৌতম রায়, ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাফরুল ইসলাম প্রধান, নারী আদিবাসী নেত্রী প্রিসিলা মুর্মু, আদিবাসী নেতা সুফল হেমব্রম, বার্নাবাস টুডু, দ্বিজেন টুডু, স্বপন শেখ প্রমুখ।

 

 

 

 

 

পঙ্কজ ভট্টাচার্য বলেন, সেদিন পরিকল্পিতভাবে পুলিশ ও সন্ত্রাসী বাহিনী ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষ ও বাঙালি কৃষকদের ওপর আক্রমণ চালায়। পুলিশের উপস্থিতিতে চিনিকল মালিকের সন্ত্রাসীরা তাদের বাড়িঘরে আগুন দেয়। পুলিশের গুলিতেই তিনজন সাঁওতাল নিহত হন। অন্য বক্তারা বলেন, তিন সাঁওতাল হত্যাকাণ্ড ঘটনার পর থমাস হেমব্রম বাদী হয়ে ৩৩ জনের নাম দিয়ে ও ৫০০-৬০০ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেন। কিন্তু দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সাঁওতাল হত্যার আসামি গাইবান্ধা-৪ (গোবিন্দগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ, সাপমারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বুলবুল আকন্দসহ মূল আসামিদের কেউই গ্রেপ্তার হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত আদিবাসী পরিবারগুলোর ক্ষতিপূরণ, শহীদ তিন ব্যক্তির পরিবারে আর্থিক সহায়তা এবং বাপ-দাদার সম্পত্তি ফেরত দেওয়ার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর কাজে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তাঁরা।