মুঈদ রহমান:  সামন্ত সমাজে আমজনতার অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ছিল কিন্তু ‘রাজা’ বদলের ক্ষেত্রে তাদের কোনো রকম ভূমিকাই ছিল না। এমনকি তারা রাজার নামও জানতেন না। আশপাশের রাজায় রাজায় যখন ঘোর যুদ্ধ চলেছে তখনো গ্রামবাসীরা সে-সম্মন্ধে সম্পূর্ণ নির্লিপ্তভাবেই গ্রাম্য জীবনযাপন করছে।হেগেল এবং মার্কসও বলেছেন, এ দেশের কৃষকের জীবনের সঙ্গে বড়ো বড়ো সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনের কোনো সম্পর্ক ছিলোনা। (দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, ‘লোকায়ত দর্শন’; পৃষ্ঠা-২৯৮)।এই যে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা যাকে আমরা স্বাধীন বাংলার শেষ নবাব বলে থাকি তার সঙ্গেও বাংলার খেটে খাওয়া মানুষের কোনো সম্পর্ক ছিলো না। আলীবর্দী খাঁ মরার আগে বলে গেলেন যে আমার নাতিছেলে পরবর্তী সময়ে বাংলার নবাব হবে, ব্যস, তাই হলো। ১৭৫৬ সালে নবাব হলেন এবং এক বছরের মাথায় ১৭৫৭ সালে ইংরেজরা তাকে নির্মমভাবে হত্যা করলো-নবাবের বয়স তখন মাত্র চব্বিশ।এ নির্মমতা সাধারণ মানুষকে বিক্ষুব্ধ করতে পারেনি, কেন না সার্বিক ঘটনাবলীর সঙ্গে আমজনতার কোনো সম্পর্কই ছিল না।ঐতিহাসিকরা বলছেন, সিরাজের লাশ যখন মুর্শিদাবাদের রাজপথ দিয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হয় তখন ওই শহরে যত লোক ছিল তারা যদি অন্যকিছু নয় একটি করে ঢিলও ছুড়তো এবং শুধু লঠিসোটা নিয়ে ধাওয়া করতো তবে ইংরেজ বাহিনীর পক্ষে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকতো না। কিন্তু স্থানীয়রা তা করেনি। উৎসাহ ছিল না। সত্য ছিল বিচ্ছিন্নতা। (সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী; ‘বাঙালীর জাতীয়তাবাদ’; পৃষ্ঠা: ১৪০-১৪১)। ওসব ছিলো ‘কুলিন’ আর ‘অভিজাত’ শ্রেণির কায়-কারবার।

 

 

 

 

 

দুই. এখন আর সামন্ত ব্যবস্থা নেই- গণতান্ত্রিক বুর্জোয়া ব্যবস্থা। এখন কোনো নানা এসে বললেই হবে না যে,‘আমার নাতি- ছেলে পরর্বতী সময়ে রাজা হবে’। এখন ‘রাজা’ বদলে আমজনতার সমর্থন লাগে। সরকার পরিবর্তনে মহামান্য রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের ক্ষমতা সাড়ে ১০ কোটি ভাগের এক ভাগ (আমাদের মোট ভোটার ১০.৪১ কোটি)! মাননীয় প্রধানমন্ত্রীরও তাই। অন্যদিকে একজন দিনমজুর বলেন আর শ্রমিক বলেন, তাদের প্রত্যেকের ক্ষমতাও রাষ্ট্রপতির সমানই- প্রায় সাড়ে ১০ কোটি ভাগের এক ভাগ!পাকিস্তানে ইয়াহহিয়ার আমলে ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে এদেশের মানুষ প্রাণ খুলে আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়। কিন্তু পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠি তার স্বীকৃতি দেয়নি, বাঁধিয়ে দিল যুদ্ধ। শেষতক অনেক আত্মত্যাগের বিনিময়ে সেই আমজনতারই জয় হলো। স্বাধীন বাংলাদেশে জনগণের রায়ের আয়ু মাত্র তিনবছর।১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার মধ্য দিয়ে সূচিত হলো সামরিক শাসন, জনগনের মতামত হলো উপেক্ষিত। সেই থেকে দীর্ঘ ১৫ বছর বাংলাদেশের ‘রাজা’ বদলের-বহালের কাজটি করেছে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে সামরিক শক্তি। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারী এরশাদের পতনের পর থেকে নতুনভাবে ‘রাজা’ বানানোর ক্ষমতা জনগণ হাতে পেলো। অবশ্য সমালোচকরা বলে থকেন যে, ১৯৯১ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশে দ্বি-দলীয় শাসন ব্যবস্থা চালু হলো।‘গণতান্ত্রিক সরকারের প্রথমপর্বে (১৯৯১-১৯৯৬) হরতাল হয় ৪১৬দিন। আওয়ামী সরকারের প্রথম তিন বছরে (১৯৯৬-১৯৯৯) ২৪৪ দিন হরতাল হয়। ১৯৯৯-২০০০ সালে বছরে গড়ে ১০০ দিনের বেশি হরতাল হয়েছিলো।হিসাব করে দেখা গেছে, ১৯৯১-৯৬ পর্বে সংসদ অধিবেশন বসেছিলো ২৯৫ দিন। সংসদ নেতা খালেদা জিয়া উপস্থিত ছিলেন ২৫৬ দিন এবং বিরোধী দলের নেতা শেখ হাসিনা উপস্থিত ছিলেন ১১১ দিন। ১৯৯৬-২০০১ পর্বে সংসদ অধিবেশন বসেছে ৩৮৩দিন। সংসদ নেতা শেখ হাসিনা ২৯৮ দিন উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে বিরোধী দলের নেতা খালেদা জিয়া উপস্থিত ছিলেন মাত্র ২৮ দিন।দেখা গেছে, বিরোধী দলের সংসদ বর্জনের আগ্রহ দিন দিন বেড়েই চলেছে।’(মহিউদ্দিন আহমদ; ‘নতুনদিগন্ত’; ২০১৮; পৃষ্ঠা: ১২৭)। দিনে দিনে বিরোধও বাড়তে লাগলো। আজকে দুই দলের সম্পর্ক শত্রুতার সমার্থক।

 

 

 

 

তিন. দ্বি-দলীয় রাজনীতির কথাএসেছিলো। আমরা জানি বহু-দলীয় গণতন্ত্রে ‘দ্বি-দলীয়’ কথাটি বেমানান। কিন্তু ভোটারদের মন-মনন থেকে আওয়ামী-বিএনপির প্রভাবকে মুক্ত করা যায়নি।। আমাদের ভোটাররা এখনো মনে করেন যে, নৌকা কিংবা ধানের শীষের বাইরে ভোট দেয়া মানে ‘ভোট নষ্ট করা’। যদিও আমরা স্বীকার করতে বাধ্য যে, বিগত সময়ে যত নির্বাচন হয়েছে, তাতে আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি হারেনি- হেরেছে এদেশের মেহনতি মানুষ।১৯৪২ সালে ব্রিটিশ আমলে যে কৃষক খালি গায়ে ঘাড়ে গামছা নিয়ে জীবন অতিবাহিত করতো, ১৯৬৫ সালের পাকিস্তানেও তার উত্তরসূরীর একই অবস্থা এবং আজকের বাংলাদেশেও তাই। মধ্যবিত্তের কিছু মানুষ সুবিধা নিয়ে উচ্চ বিত্তের ‘মর্যাদা’য় অভিষিক্ত হয়েছে।এই যে এতো আয়োজনের নির্বাচন, সেটা যে বড় আকারের সুবিধা-বঞ্চিত মানুষদের দ্বারা গুটিকতেক সুবিধাভুগী মানুষদের মহোৎসব-তা আমরা আমজনতাকে বোঝাতে সামান্যতমও সক্ষম হইনি। শ্রেণি-শোষনের এই প্রক্রিয়ার বিপক্ষে আপনি হয়তো দু’একটি দল পাবেন কিন্তু তাকে বঞ্চণা-মোকাবিলার ‘শক্তি’ বলে বিবেচনা করা যাবে না।অন্যদিকে বুর্জোয়া মতাদর্শেরও কোনো দল বা জোট আওয়ামী-বিএনপির বলয়মুক্ত হতে পারেনি। হালে ড. কামাল হোসেন-মাহমুদুর রহমান মান্নার জোট প্রক্রিয়ার কথা শোনা যাচ্ছে। ড. হোসেন এবং মান্নার একটা পরিচিতি অবশ্যই রাজনৈতিক মহলে আছে। তাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি- ভোটের রাজনীতিতে স্বকীয় অস্তিত্ব বজায় রেখে, ‘দুই দলে’র আশির্বাদের বাইরে থেকে দেখার মতো তেমন কিছু একটা করা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। ভোটের পরে আমার কথা মিলিয়ে নেবেন।

 

 

 

 

 

 

চার. অর্থনৈতিক লুটপাট ছাড়াও বিএনপির সামনে দুইটি প্রশ্নের একটি হলো- জামাত সংশ্লিষ্টতা। খোদ বিএনপির ভেতরেও এ প্রশ্নের সমাধান হয়নি, প্রগতিশীল মহলে তো নয়ই। বদরুদ্দিন উমরের কথায়, ‘বাংলাদেশে প্রগতিশীল রাজনীতির বিকাশের ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামী একটি বিরুদ্ধ শক্তি। শুধু তাই নয়, এ দলটিও দেশের দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক দলসমুহের মধ্যে সব থেকে বেশি প্রতিক্রিয়াশীল। এ দেশে যে সব রাজনৈতিক দল ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার করে থাকে তার মধ্যে নিকৃষ্টতম হলো জামায়াতে ইসলামী।’(‘ধর্ম রাজনীতি ও সাম্প্রদায়িকতা’;পৃষ্ঠা: ১৪৬)।দ্বিতীয় প্রশ্নটি অনেক দিন চাপা থাকার পর সাম্প্রতিক সময়ে জেগে উঠেছে- ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা। ২০০৪ সালের ওই নারকীয় বোমা হামলার বিচারের রায়ে দলের প্রধান তারেক রহমান অভিযুক্ত হয়েছেন। আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার যে ঘৃন্যতম পথ তারা বেছে নিয়েছিলেন- তার একটা সুষ্পষ্ট জবাব সাধারণ মানুষ চাইবেই।বিএনপি নেতৃবৃন্দ একটা দায়সারা গোছের জবাব দিয়েছেন- এটি একটি ‘ফরমায়েসি’ রায়। এ উত্তর অনেকখানিই মলিন এবং প্রথাগত। অতো বড় একটি সস্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কোনো রকম দায় যদি বিএনপি না নেয় তাহলে নোয়াম চমস্কির সংজ্ঞায় আমরা ধরে নেব যে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বাংলাদেশ একটি ‘ব্যর্থ-রাষ্ট্র’ ছিল।আমেরিকার প্রখ্যাত আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক নোয়াম চমস্কি তাঁর ‘ফেইল্ড স্টেটস্’ বইয়ের প্রারম্ভিক বক্তব্যেই বলেছেন,‘ব্যর্থ রাষ্ট্রের প্রাথমিক কিছু বৈশিষ্ট সহজেই চিহ্নিত করা যায়। একটি হলো সহিংসতা ও ধ্বংস থেকে জনগণকে রক্ষা করার অক্ষমতা বা অনিচ্ছা।’আওয়মী লীগও প্রশ্নের বাইরে নয়। গত ১০ বছরে অর্থনৈতিক এবং সামাজিক উন্নয়ন সূচকের অনেকগুলোতেই সন্তোষজনক অবস্থায় পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তা দক্ষিণ এশিয়াতেও উদাহরণযোগ্য। কিন্তু ‘অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন’র ক্ষেত্রে তা মোটেই সন্তোষজনক বেড়েছে ‘রেন্ট সীকার্স’দের দৌরাত্ম। আরেকটি হলো ‘পরমত সইবা’র ক্ষমতা আশংকাজনকভাবে কমে যাওয়া,যা গণতন্ত্র বিকাশের প্রধান অন্তরায়।আওয়ামী লীগ এখন আকার- অবয়বে যতটা সংহত, তার স্থায়ীত্ব বৃদ্ধিতে তোষামোদকারীর বিপরীতে গঠণমূলক সমালোচকের প্রয়োজন বেশি। কারণ, তোষামোদকারীদের যথাযথ মূল্যায়ন-ক্ষমতা আপনা থেকেই হারিয়ে যায় কিন্তু সমালোচকদের সেটা থাকে।

 

 

 

 

প্রাসঙ্গিকভাবেই আমি খ্যাতিমান সাহিত্যিক-সমালোচক আহমদ ছফার নাম স্মরণে আনতে পারি। ভদ্রলোক তার জীবদ্দশায় কথনো ‘শেখ মুজিবুর রহমান’ নামের আগে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিটি ব্যবহার করেছেন বলে আমার জানা নাই। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে মূল্যায়ন করার বেলায় তার ক’টি লাইন পড়ুন- ‘আজ থেকে অনেক দিন পর হয়তো কোন পিতা তার শিশু পুত্রকে বলবেন জানো, খোকা! আমাদের দেশে একজন মানুষ জন্ম নিয়েছিলেন যার দৃঢ়তা ছিল, তেজ ছিল আর ছিল অসংখ্য দুর্বলতা। কিন্তু মানুষটির হৃদয় ছিল, ভালোবাসতে জানতো। দিবসের উজ্জ্বল সূর্যালোকে যে বস্তু চিক চিক করে জ্বলে তা হলো মানুষটির সাহস। আর জ্যোৎস্নারাতে রূপালী কিরণ ধারায় মায়ের স্নেহের মত যে বস্তু আমাদের অন্তরে শান্তি এবং নিশ্চয়তার বোধ জাগিয়ে তুলে তাহলো তার ভালোবাসা। জানো খোকা তার নাম? শেখ মুজিবুর রহমান।’(‘শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য প্রবন্ধ’; পৃষ্ঠা ৩৩)। কী অপূর্ব মূল্যায়ন আর কী অপূর্ব তার ভাষা!

 

 

 

 

 

শেষ. ‘খেলার মাঠ সমান’কি সমান না তা মূলত প্রার্থীর বেলায় অধিকতর কার্যকরী- মানুষের কাছে যাবার, কথা বলার সমান সুযোগ পাবেন কিনা তা। কিন্তু সাধারণ ভোটারদের সবচেয়ে বড় দাবি হলো ভোটাধিকার প্রয়োগ করার নিশ্চয়তা। মাঠে-ঘাটে যে যত কথাই বলুন না কেনো নিরাপদ ও নিশ্চিন্তে ভোট দেয়ার সুযোগ পেলে জনমতের প্রতিফলন ঘটবেই। আর সেটা আমাদেরকে মেনে নিতেই হবে। কেন না এখন আমজনতার কথাই শেষ কথা। সকলের শুভবুদ্ধির উদয় হোক। লেখক: মুঈদ রহমান, অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।