প্রথমবার্তা, নিজস্ব প্রতিবেদন :     বাংলাদেশে বেড়ে চলেছে আত্মহত্যার হার। বর্তমান সময়টাতে আত্মহত্যা ক্যান্সারের চেয়েও মহামারি আকারে দেখা দিয়েছে।সুখ-দুঃখের মিশেলেই মানুষের জীবন। প্রতিনিয়ত আমরা যুদ্ধ করে চলেছি পরিবেশের সাথে, পরিস্থিতির সাথে। এভাবে বেঁচে থাকাটার মাঝেই রয়েছে সুখ। বারবার হার মানলেও মানুষ বারবারই উঠে দাঁড়ায়, কারণ জীবনে যে অমূল্য! অথচ কখনো কখনো দেখা যায়, অমূল্য এই জীবনটাকেই বিসর্জন দিয়ে ফেলে মানুষ।ছেলেদের আত্মহত্যার চেষ্টাগুলো একটু বেশি মারাত্মক হয়, তাই তারা সফলও হয় বেশি। অন্যদিকে মেয়েরা আত্মহত্যার চেষ্টা করে বেশি, কিন্তু সফল হয় কম। তারা অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ।

 

 

 

 

 

 

আত্মহত্যার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে- হতাশা, যৌতুক ও পারিবারিক নির্যাতন, ইভটিজিং, শ্লীলতা হানি, ধর্ষণ, প্রতারণা, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, দাম্পত্যকলহ, নারীর অপ্রত্যাশিত গর্ভবতী হওয়া, দারিদ্র ও বেকারত্ব, প্রেম ও পরীক্ষায় ব্যর্থতা, আত্মহত্যার উপকরণের সহজপ্রাপ্যতা, মানসিক অসুস্থতা, জটিল শারীরিক রোগ- যন্ত্রণা, নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক অস্থিরতা। পরিবারের সঙ্গে তাদের একটি অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হয়। মা-বাবা অনেক সময় ‘না’ বলেন। কিন্তু যুক্তিটা বলেন না বা বুঝিয়ে বলেন না। এ সময় তাদের মধ্যে একটি আবেগীয় পরিবর্তন কাজ করে। দিনকে দিন বিষয়টি দানা বাধতে থাকে। এক সময় এটি খারাপের দিকে মোড় নেয়।

 

 

 

 

রাজধানীর মিরপুরের রূপনগর এলাকা থেকে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় এক নারী মডেলের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তাঁর নাম সাবিরা হোসাইন (২১)।জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিহত তরুণীর প্রেমিক নির্ঝর সিনহা রওনককে গ্রেপ্তার করা হয়। মিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘সম্ভবত মেয়েটির সঙ্গে কয়েকটি ছেলের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। আমরা জানতে পেরেছি, সোমবার রাতে নির্ঝরের বাসায় যান সাবিরা। চিৎকার করার কারণে তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দেন নির্ঝরের ছোট ভাই। এ কারণে মেয়েটি আত্মহত্যা করতে পারেন।’সাবিরার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল বলে নির্ঝর জানিয়েছেন। নির্ঝরের ফেসবুক টাইমলাইনে নির্ঝরের সঙ্গে সাবিরার অন্তরঙ্গ ছবি আছে। সাবিরার ফেসবুক প্রোফাইল ঘেঁটে দেখা যায়, কয়েকটি পণ্যের মডেল হয়েছেন তিনি। এদিকে নিহত সাবিরার ফেসবুকে গিয়ে দেখা যায়, মৃত্যুর আগে তিনি এখানে কিছু কথা এবং একটি ভিডিও পোস্ট করেন। এতে তিনি তাঁর মৃত্যুর জন্য নির্ঝরকে দায়ী করে ট্যাগ করে দেন। অবশ্য লেখার শুরুতেই নির্ঝরের ছোট ভাইকে দায়ী করেন সাবিরা।

 

 

 

 

 

আত্মহত্যার ঝুঁকিতে কারা আছে? যে ব্যক্তি কথাচ্ছলে মৃত্যুর ইচ্ছা ব্যক্ত করে, ধরে নিতে হবে তার মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা রয়েছে।সে কারণে কারও মৃত্যুসংক্রান্ত কথাকে হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। আত্মহত্যার পিছনে শুধুমাত্র একটি কারণ থাকে না। মানুষের ব্যক্তিত্ব, পরিবার, আত্মীয়তা ও পরিবেশের উপরেও নির্ভর করে মানসিক ভারসাম্য। কারণ একাকী নিঃসঙ্গ জীবনে ভালো-মন্দ বোঝার ক্ষমতা হারিয়ে যায় ও মানুষের আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরে।১. যেসব তরুণ-তরুণীরা ইতিমধ্যেই এক বা একাধিকবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে।২. কোন মানসিক সমস্যা বা রোগ বিশেষ করে ডিপ্রেশন, সিজোফ্রেনিয়া ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত কেউ।৩. অ্যালকোহল বা অন্যান্য মাদকে আসক্ত ব্যক্তি।৪. পারিবারিক বা অন্য কোন ভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার হলে।৫. ভালোবাসার সম্পর্কে টানাপোড়ন ঘটলে।

 

 

 

 

আত্মহত্যা প্রতিরোধে করনীয়: ১. আত্মহত্যা করার চিন্তা এলে দেরী না করে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞর শরণাপন্ন হন। ডাক্তারের সাথে মন খুলে কথা বলুন, পরামর্শ নিন। ২. পরিবারের কেউ কিংবা কোন বন্ধু-বান্ধবী আত্মহত্যার কথা শেয়ার করলে বা হুমকি দিলে কখনোই তা হালকা ভাবে নিবেন না। যত দ্রুত সম্ভব তার মনের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করুন। তার সাথে কথা বলুন এবং দ্রুত মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হন। ৩. পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কগুলো আরো শক্তিশালী করে তুলুন। ধর্মীয় অনুশাসনগুলো মেনে চলতে আগ্রহী হন।

 

 

 

 

 

আত্মহত্যার চেষ্টাকে হত্যার মতো অপরাধের সাথে সংযুক্ত করে রাখা হয়েছে। এরকম চেষ্টাকারীদের কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয় দণ্ডই হতে পারে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরণের ঘটনা এড়াতে এবং আত্মহত্যা ঠেকাতে সমাজের অন্যান্য ব্যক্তিদের এগিয়ে আনতে হলে এই আইন বদলানো দরকার। বাংলাদেশের মানুষ অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ হওয়ায় এটি অসাধারণভাবে কাজ করবে। মসজিদের ইমাম ও ধর্মীয় বক্তাগণ এক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেন।

 

 

 

 

 

সমাজের প্রত্যেকটি ব্যক্তি যদি প্রকৃতভাবে সচেতন ও সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠেন তাহলে মানসিক অবসাদ এবং বিষাদে আক্রান্ত মানুষেরা আবার নতুন ভাবে বেঁচে উঠতে পারে। সর্বোপরি আত্মহত্যার প্রবণতাকে অচিরেই রোধ করা সম্ভব হবে।পারতপক্ষে আত্মহত্যার সংবাদ প্রচার না করাই ভালো। মানুষের মধ্যে ধর্মীয় অনুভূতি জাগিয়ে তোলার মাধ্যমেও আত্মহত্যা প্রতিরোধ সম্ভব। আত্মহত্যার ভয়াবহতা সম্পর্কে সরকারি এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে। বছরের বিভিন্ন সময়ে আত্মহত্যার প্রতিরোধ শীর্ষক সেমিনার করার পাশাপাশি অন্যান্য কর্মসূচি পালন করা যেতে পারে।