কথায় বলে শেষ ভালো যার, সব ভালো তার। সারা দেশের মানুষ এখন সেই শেষ ভালোটি দেখারই অপেক্ষায় আছেন। অর্থাৎ ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে মানুষ চেয়ে আছেন। এবারের নির্বাচনকে জনগণ মনেপ্রাণে উপভোগ করতে চান। কারণ দীর্ঘদিন পর তারা ভোট দিতে যাচ্ছেন।২০১৪ সালের নির্বাচনকে ভোটারবিহীন নির্বাচন হিসেবে বিবেচনা করলে বিষয়টি অনেকটা এরকমই দাঁড়ায় যে, দেশের ১০ কোটি ভোটার ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে ক্ষুধার্ত! আর গত ১০ বছরে দেশে দুই কোটিরও বেশি ভোটার নতুনভাবে তালিকাভুক্ত হওয়ায় তারা এবার জীবনে প্রথমবার ভোট দিতে যাচ্ছেন।

 

 

 

 

এসব দৃষ্টিকোণ থেকে তাই একটি ভিন্নমাত্রায় এবার জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আর সে কাজটির গুরুদায়িত্ব এখন নির্বাচন কমিশনের কাঁধে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ইতিমধ্যেই বলেছেন, ‘বর্তমানে তাদের কথামতোই সবকিছু হচ্ছে।’ অথাৎ পুলিশ প্রশাসনসহ মাঠপর্যায়ের সব কার্যক্রম এখন নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণাধীন।নির্বাচন কমিশনের উপরোক্ত বক্তব্য বা তথ্যটি দেশের মানুষের জন্য একটি সুখকর সংবাদই বটে। আমি নিজেও এবারে সপরিবারে দেশের বাড়িতে গিয়ে ভোট প্রদান করব। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কয়েকদিন আগে আমাকে সপ্তাহখানেকের জন্য দেশের বাইরে যেতে হয়েছিল।ফেরার পথে সিঙ্গাপুর এয়ারপোর্টের বোর্ডিং লাউঞ্জে আমার পাশেই বসা ছিলেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের এক কর্তাব্যক্তি। আমাদের বিমানের ফ্লাইটে কিছুটা বিলম্ব থাকায় সেখানে ঘণ্টাখানেক সময় আমরা আলাপচারিতায় কাটিয়ে দিলাম। প্রথমে তার এবং আমার পরিবার নিয়ে আলোচনা হলেও পরে তিনি আমাদের দেশের নির্বাচন প্রসঙ্গে আলাপচারিতা শুরু করে নদীতে একজন প্রার্থীর লাশপ্রাপ্তি সংক্রান্ত বিষয়ে প্রশ্ন তুললেন।

 

 

 

 

 

জবাবে আমি বললাম, আমাদের এতদাঞ্চলে (ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ) এমন কিছু ঘটনা ঘটেই থাকে। রাজনৈতিক ডামাডোলের সময় অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে।তিনি তখন অন্য প্রসঙ্গ টেনে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘নির্বাচন কতটা ফ্রি ও ফেয়ার হবে?’ আমিও তাকে পাল্টা প্রশ্ন করলাম, ‘তুমি বা তোমরাও তো এ ব্যাপারে বলতে পার। তোমাদের ধারণা কী?’ তিনি জানালেন, ফ্রি ও ফেয়ার ইলেকশন বলতে আক্ষরিক অর্থে যা বোঝায় তা হয়তো সম্ভব হবে না।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

কারণ নির্বাচনে প্রভাব-প্রতিপত্তি, আধিপত্য, কালো টাকার ব্যবহার থাকবেই। তাই এ ধরনের পরিবেশে সম্পূর্ণ সুষ্ঠু ও সুন্দর নির্বাচন অনুষ্ঠান কতটা সম্ভব হবে তা এখনও বলা যাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়েও তিনি প্রশ্ন উত্থাপন করলেন।আলোচনাকে ভিন্ন খাতে নিতে আমি অন্য প্রসঙ্গ টেনে তার কয়টি ছেলেমেয়ে জিজ্ঞেস করায় তিনি জানালেন, তার এক ছেলে এবং এক মেয়ে। ছেলে জার্মানিতে কাজ করে এবং পড়ে। মেয়েটিও ইংল্যান্ডে একইভাবে পড়ালেখা করে। মাঝে মধ্যে তিনি তার সন্তান দুটিকে কিছু আর্থিক সহায়তা করলেও তার সন্তানরা নিজেরাই নিজেদের জন্য সবকিছু ব্যবস্থা করতে সক্ষম। তারা বাবার সাহায্যের প্রত্যাশায় থাকে না।উল্লেখ্য, ভদ্রলোকের সন্তান দুটি যথাক্রমে ১৭ ও ১৯ বছর বয়সী। পশ্চিমা দেশের এমন সংস্কৃতি আমার পছন্দের নয় জানিয়ে তাকে বললাম, ‘আমাদের দেশে পড়াশোনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত সন্তানরা পিতামাতার ওপর নির্ভরশীল এবং পিতামাতার তত্ত্বাবধানে থাকে।’

 

 

 

 

 

বস্তুত আমি তার সঙ্গে দেশের নির্বাচন ও রাজনীতি নিয়ে কথা বাড়াতে চাচ্ছিলাম না বলে আলাপচারিতা অন্যদিকে নিয়ে তার ইতি টেনে উঠে দাঁড়িয়ে একটু হাঁটাহাঁটি শুরু করলাম; কিন্তু দেশের কথা, রাজনীতির কথা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারলাম না। কারণ আর ৪-৫ ঘণ্টা পরই আমাকে দেশের মাটি স্পর্শ করতে হবে এবং সেইসঙ্গে দেশের ভালোমন্দ সবকিছুও আমাকে স্পর্শ করবে। আর হলও তাই।যদিও বিদেশে থাকা অবস্থায় অনলাইনে সবকিছু জেনে নিতাম, আবার মাঝে মধ্যে টেলিফোনেও দেশের খোঁজখবর নিতাম; কিন্তু তারপরও ঘরে ঢুকেই টেলিভিশন খুলে আবার নতুন করে সবকিছু গেলার চেষ্টা করার পর এ ক’দিনে যা বুঝলাম তা হল, দেশে একটি নির্বাচন হতে যাচ্ছে, বর্তমানে সেটাই বড় কথা। যদিও ব্যবসা-বাণিজ্য, পুঁজিবাজার ইত্যাদি কিছুটা থমকে গেছে। তবুও আসন্ন নির্বাচন ঘিরে দেশের মানুষের উদ্যম, উদ্দীপনা, আয়োজনের কমতি নেই।

 

 

 

 

 

ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বড় দুটি দল ও জোট তাদের প্রার্থীদের তালিকা ঘোষণা করেছে এবং তদনুযায়ী প্রার্থীরা মনোনয়নপত্রও দাখিল করেছেন। আর সে তালিকা ও মনোনয়নপত্রে পুরনোদেরই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের ক্ষেত্রে গত ১০ বছরে যিনি বা যারা এমপি-মন্ত্রী ছিলেন, ৯০ ভাগ ক্ষেত্রে আবারও তাদেরই মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। বিএনপির ক্ষেত্রেও খুব বেশি নতুন মুখ দেখা যাচ্ছে না।যা হোক, দেশের বড় দুটি দল ও জোট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় ২০১৯ সালের নতুন বছরে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করবে, তেমনটি ভাবতে পারাটাই দেশের মানুষের জন্য একটি সুখবর বলে বিবেচিত হচ্ছে। এখন নির্বাচন কমিশন যদি কাজটি সুষ্ঠুভাবে করতে পারে, তাহলেই তারা দেশের মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করে সাধুবাদ পাবে।

 

 

 

 

আর নির্বাচন কমিশন যদি যথাযথ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তাহলে আবারও একটি ‘কিন্তু’ থেকে যাবে এবং দেশের মানুষের সুখ-শান্তির ওপরও তার প্রভাব পড়বে। তাই এবারের নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনকে অতন্দ্র প্রহরীর মতো সতর্ক থেকে নির্বাচন পরিচালনা করতে হবে। কোনো ধরনের ঢিলেঢালা মনোভাব প্রদর্শন করা উচিত হবে না।মুক্তিযোদ্ধারা গণতন্ত্রের জন্য পাকিস্তানিদের সঙ্গে প্রাণপণ লড়াই করে স্বাধীনতার লাল সূর্য দেশ ও জাতিকে উপহার দিয়েছেন, আর বঙ্গবন্ধুর নিজ হাতে গড়া বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে দেশে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এবং বিরোধী দল ও জোটও সেই নির্বাচনে অংশগ্রহণে প্রবৃত্ত হয়েছে- এ সুখানুভূতি মনে ধারণ করেই যেন একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দেশ ও জাতিকে উপহার দেয়া যায়, সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে সেদিকেই সবিশেষ গুরুত্ব দেয়া উচিত।

 

 

 

 

 

অন্যথায় গণতন্ত্রের প্রতি বঙ্গবন্ধুর অবদান, অঙ্গীকারকেই অস্বীকার করা হবে এবং দেশ ও জাতির কাছে সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে দায়ী থাকতে হবে।এ ক্ষেত্রে এবারে যদি এ কথাও ধরে নেয়া যায় যে, আওয়ামী লীগ সরকারে থাকায় এবং তাদের সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীরা নিজ নিজ পদে বহাল থাকায় তারা কিছুটা হলেও সুবিধা আদায় করতে চাইবেন, তাহলেও সে কথাটি মনে রেখে নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অন্য যেসব দল বা প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তাদের অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে।অর্থাৎ বিরোধী দলের প্রার্থীদের ওপর যেন সরকারি দল বা তাদের প্রার্থীরা কোনোরূপ অন্যায়-অবিচার করতে না পারেন, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে সংশ্লিষ্ট সবার নির্বাচনী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হবে।অন্যথায় একটানা ১০ বছর ক্ষমতায় থেকে সরকারদলীয় সংসদ সদস্যরা দেশের মানুষের জন্য কাজ করে তাদের নিজ নিজ এলাকার উন্নয়ন সাধনের পরও যদি জনপ্রিয় ব্যক্তি হিসেবে সোজা পথে অর্থাৎ কারচুপি না করে সঠিক ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হতে না পারেন, তাহলে সেসব প্রার্থীর বঙ্গবন্ধুর দল থেকে মনোনয়ন দেয়া যেমন সঠিক বলে বিবেচিত হবে না, তেমন নির্বাচন কমিশন তথা নির্বাচনী কর্মকর্তাদেরও ওই শ্রেণীর প্রার্থীদের প্রতি কোনো পক্ষপাতমূলক আচরণ করা ঠিক হবে না।

 

 

 

 

 

কারণ তা করা হলে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে এবং তাতে করে বিরোধী দল, জোট বা শক্তিগুলো আন্দোলন-সংগ্রামের অজুহাত পেয়ে গেলে দেশে অশান্তি সৃষ্টি হবে।এসব বলার উদ্দেশ্য হল, এবারের নির্বাচন অবশ্যই নিরপেক্ষ, অবাধ ও সুষ্ঠু হতে হবে। কারণ বিরোধী দল বা জোট যেহেতু একটি দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছে, তাই তাদের প্রতি সুবিচার করার দায়িত্বও এখন সরকার ও নির্বাচন কমিশনের। কিন্তু তাই বলে সরকারি দলের কোনো প্রার্থীর ভোট অন্য কেউ জোর করে নিয়ে যাবেন, আর সে ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন চুপ করে বসে থাকবে সে কথাও কিন্তু বলা হচ্ছে না।সরকারদলীয় প্রার্থীদের পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বী বিরোধী দলের প্রার্থীরাও যেন নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের সুরক্ষা পান, সে বিষয়টির নিশ্চয়তা বিধানই হবে এখন সময়ের কাজ। আর এখন থেকেই নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনকে সে বিষয়ে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে।

 

 

 

 

পরিশেষে দেশের একজন সাধারণ ভোটার হিসেবে বলতে চাই, আমরা যেন নির্বিঘ্নে আমাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারি। সে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে না পারলে কিন্তু প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনকেই জবাবদিহি করতে হবে। আর সে ক্ষেত্রে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন সেই আগের মতোই প্রশ্নবিদ্ধ হবে এবং বারবার নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবি উঠবে।যদিও আমাদের মনে হয় না যে সরকার, প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন এবার সে ঝুঁকি নেবে। কারণ আগেই বলা হয়েছে, সরকারের তরফ থেকে দেশে অনেক উন্নয়নমূলক কাজ করা হয়েছে এবং সরকারও কথায় কথায় সব কাজের দাবি করে প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছে। সর্বোপরি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা তার ব্যক্তিত্বের কারিশমায় দেশ-বিদেশে সমুজ্জ্বল হয়েছেন।সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও তাদের কাক্সিক্ষত বেতন স্কেলে বেতন-ভাতা প্রাপ্তিসহ দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে শরিক হয়েছেন। আবার নির্বাচন কমিশনে যারা আছেন, তারাও নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে তাদের চাকরির মেয়াদকাল পূর্ণ করে অবসর নিয়ে পেনশন ভোগরত অবস্থায় পুনরায় রাষ্ট্রীয় সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন।

 

 

 

 

 

সুতরাং উপরোক্ত সব শ্রেণী-গোষ্ঠী বা ব্যক্তির কারও কিছু চাওয়া-পাওয়া এবং হারানোর আছে বলে মনে হয় না। তাই তারা সবাই মিলে একটি অবাধ, সুন্দর ও সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেবেন, দেশ ও জাতি সেটাই প্রত্যাশা করে। আর শুধু দেশ ও জাতি নয়, আমার মনে হয়, সারা বিশ্বও তা দেখার জন্য চেয়ে আছে। কারণ বহির্বিশ্বও জানে, বাংলাদেশ আর সেই আগের বাংলাদেশ নেই।বাংলাদেশ এখন সব ক্ষেত্রেই অনুকরণীয়। সুতরাং নির্বাচনের ক্ষেত্রেই বা তা হবে না কেন? এখন দেখা যাক, নির্বাচন কমিশনের ক্ষেত্রে ‘শেষ ভালো যার, সব ভালো তার’ কথাটির প্রতিফলন ঘটে কিনা।মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট । –