প্রথমবার্তা,প্রতিবেদকঃ  বড় বোনকে আমার এখনও মনে আছে। ৬ সন্তানের জননী ৩৯ বছরের এক নারী। চোখের কালশিটে দাগ ঢাকতে তিনি সবসময় গাঢ় রংয়ের চশমা পড়তেন। কেউ কারণ জানতে চাইলে বলতেন তেমন কিছু নয়। মাঝে মাঝে তিনি নিজের ব্যক্তিগত কষ্টের কথা জানাতেন, চাইতেন পরামর্শ!

 

 

 

 

আমি প্যারিসে থাকাকালে একবার সে বেড়াতে এলো। সেবার তিনি একটি পার্টি সম্পর্কে আমাকে কিছু কষ্টের কথা জানালেন। অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি ঘিরে বোন সেবার বেশ ব্যস্ত ছিলেন। একসময় তিনি লক্ষ্য করলেন তার স্বামীর আচার আচরণ বেশ সন্দেহজনক। সেই অনুষ্ঠান চলাকালেই তিনি তার সত্যতাও পান। তিনি দেখেন তার চিকিৎসক স্বামী নিজের পড়ার ঘরে এক নারীকে নিয়ে আপত্তিকর অবস্থায় মাটিতে শুয়ে আছেন।‘শীলা কোহলার, এখন আমার কি করার আছে?’ কাঁদতে কাঁদতে ম্যাক্সিন আমাকে বলছিলেন।

 

 

 

 

 

তার নীল নয়ন দিয়ে অশ্রু ঝড়ছিল। বললাম, ‘এদের লাথি দিয়ে বের করে দেব। তা না হলে পুলিশকে খবর দাও।’ম্যাক্সিন আমার চাইতে দুই বছরের বড়। সে বলল, ‘সেটা সম্ভব নয়, শীলা। সে আমাকে শাসিয়েছে। অন্তরঙ্গ দৃশ্যটি দেখার সঙ্গে সঙ্গেই সে আমার সঙ্গে হিংস্র আচরণ করে। আমি কথা দিয়েছি কাউকে বিষয়টি বলবো না।’

 

 

 

 

 

 

 

 

 

বোনের মৃত্যুর পর ৩৫টি বসন্ত কেটে গেছে। যে বিষয়টি আমাকে এখনও পীড়া দেয় তা হল দুর্বল নারী হওয়ায় তাকে সেসময় অন্যায়টি মেনে নিতে হয়। এখনো বহু নারী যেমনটি মেনে নেয়।

যুক্তরাজ্যে গৃহের অভ্যন্তরে নির্যাতন এখনও কমেনি। বরং পরিস্থিতিটা ভয়াবহ পর্যায়েই বলা যায়। প্রতি ৪ জনের একজন নির্যাতনের শিকার। সাবেক অথবা বর্তমান প্রেমিকের হাতে প্রতি সপ্তাহে এখনও অন্তত ২ জন নারীর মৃত্যু হয়। এরপরও নারীরা সংসার আর সন্তানের কথা চিন্তা করে মুখ খোলেন না। পরিসংখ্যানটি আসলেই ভয়াবহ। অপরাধ হওয়া সত্ত্বেও বিষয়টি সামনে আসে না। যদি না কোনো নারী অভিযোগ করেন কিংবা কোনো ত্রাতা নিজ উদ্যোগে সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এমন অপরাধ আড়ালেই থেকে যায়।

 

 

 

 

 

অসহনীয় হলেও আমার বোন অবশ্য স্বামীর কুকীর্তি আড়ালে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। স্বামীর সম্মান বজায় রাখতে তার দুর্ব্যবহারও মেনে নেয়ার চেষ্টা করেন। ভেবেছিলেন একসময় হয়তো সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে। কিন্তু তা হচ্ছিল না। বোনের স্বামী তার সন্তানদেরও প্রহার করতেন। কিন্তু ম্যাক্সিন আমাকে সব বিষয় জানতে দিত না। যেমন, বোনের স্মার্ট স্বামী সন্তানদের এমন প্রহারই করতেন যে মাঝে মাঝে তারা জ্ঞানও হারাতো।     আমাদের বেড়ে ওঠা দক্ষিণ আফ্রিকায়। বড় হওয়ার পরে একবার সেখানে আমরা বেড়াতে যাই।

 

 

 

 

 

সেবারই বোন তার স্বামীর সহিংস আচরণের কথা আমাকে জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, স্বামীর আচরণের কারণ জানতে গোয়েন্দাদের সহায়তা নেবেন তিনি। কিন্তু আমি সেবারই তাকে বিবাহ বিচ্ছেদের পরামর্শ দিয়েছিলাম।  কিন্তু সে বলেছিল, ‘আমি তা করতে পারব না। যদি আমি আইনজীবীর কাছে যাই তবে সে আমাকে অনুসরণ করবে এবং মারবে।’ এরপর আমাকে বলে যদি আমি তার হয়ে উকিলের কাছে যাই তাহলে কোনো সমস্যা থাকে না। আমি তাই করি। উকিল আমাকে বললেন, “যদি সে আমার সঙ্গে দেখা করতে এখানে আসতে না পারে তাহলে ডিভোর্স নেবে কিভাবে?”

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মাঝে মাঝে আমি তাকে দেশ ছাড়ার পরামর্শ দিতাম। বলতাম, পালাও! কিন্তু বোনের স্বামী সন্তানদের পাসপোর্ট নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলেন। বোন সন্তানদের ফেলে যেতে চাইতেন না। আমিও তেমন পরামর্শ কখনও তাকে দেইনি। কিন্তু ভাবতেও পারিনি, একপর্যায়ে তাকে প্রাণও দিতে হবে। আমার এখনও বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, কি ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে বোনকে সংসার করতে হয়েছে। আমার মা অবশ্য সাবধান করেছিলেন। বলেছিলেন, বোনকে হত্যা না করে সেই লোক থামবে না।  বোনের সঙ্গে আমার শেষ সাক্ষাৎ হয় ইউরোপে। এক সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে তিনি বেড়াতে এসেছিলেন। সেবার বোন বলেছিল, “আমি বাড়ি ফিরতে চাই না। আমার ভয় করছে।” গভীর সমবেদনা জানিয়ে তখন বলেছিলাম, ‘তাহলে সন্তানদের কী হবে?’

তার ভয় অমুলক ছিল না। কিছুদিন পরই এক সড়ক দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়। আমার বোন আর তার স্বামী গাড়িতে করে যাওয়ার সময় সেটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার ধারে একটি ল্যাম্প পোষ্টকে আঘাত করে। সেই ঘটনায় বোনের মৃত্যু হলেও তার স্বামী সুস্থই ছিলেন। কেউ বিশ্বাস করতে চাইবে না যে এটা দুর্ঘটনা নয়। কিন্তু আমি জানি, এটা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। আমার বোনের বয়স তখন মাত্র ৩৯ বছর।

 

 

 

 

 

 

 

বোনের মৃত্যুর পর একজন গোয়েন্দার কাছে গিয়েছিলাম। সে আমাকে কথা দিয়েছিল, সত্যটা সে বের করে আনবে। এবং নিশ্চিত করবে, ম্যাক্সিনের স্বামী যেন আর কখনোই কাউকে আঘাত করতে না পারে। কিন্তু মায়ের কথায় তাকে আমি থামাই।মা সেবার বলেছিলেন, সন্তানদের কথা একবার চিন্তা কর। তার কর্মফল সে ঠিকই পাবে। ‘একজন ব্যক্তি তার সন্তানকে পিটিয়ে হত্যা করেছে’, মৃত্যুর আগেও নিশ্চয়ই মা সেই কষ্ট বুকে নিয়েই পৃথিবী ছেড়েছিলেন।

 

 

 

 

 

দীর্ঘ ৩৫ বছর পর গোপন থাকা সেই বিষয়টি নিয়ে আজ লিখতে বসেছি। সব মিলিয়ে কিছু প্রশ্ন এখনও আমাকে তাড়া করে। আমাদের করণীয় কী? নারীদের প্রতি এমন সহিংসতা বন্ধে সমাজের কী করার আছে? আমার বোন আজ থেকে ৩৫ বছর আগে মারা গেছেন। কিন্তু এখনও সমাজের চিত্র এতটুকু বদলায়নি। শুধু যুক্তরাজ্যেই নয়, সমগ্র বিশ্বের অসংখ্য নারী তার নিজের সংসারে প্রতিনিয়ত এমন সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। তারা হয়তো সাহায্যও চাইছেন! কিন্তু বলতে কি পারছেন?

সুত্রঃ টেলিগ্রাফ