প্রথমবার্তা,প্রতিবেদকঃআপেক্ষিক তত্ত্ব কিংবা বিখ্যাত সমীকরণ E=mc2 এর জন্য যিনি দুনিয়া জুড়ে বিখ্যাত, তিনি আলবার্ট আইনস্টাইন। যারা এই মানুষটি সম্পর্কে ভালোভাবে জানেন, তারা বলতে পারবেন নানা গাণিতিক জটিল তত্ত্ব ছাড়াও যে বিষয়টির প্রতি তিনি দুর্বল ছিলেন তা হল বেহালা। বেহালা ছিল তার প্রেমিকার মতো। এর নাম ছিল লিনা।

 

 

 

 

 

বেহালার প্রতি শুধু দুর্বলই ছিলেন না আইনস্টাইন, চমৎকার বাজাতেও পারতেন। তিনি এত সুন্দর বাজাতে পারতেন যে উপস্থিত সকলে মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় তা শুনতেন। তার জীবনে জটিল গাণিতিক সুত্রের বাইরে যে বস্তুটি প্রশান্তি এনে দিয়েছিল তা হচ্ছে বেহালা।শুধু কী প্রশান্তি! দাম্পত্য জীবন যাকে ঘিরে তার সঙ্গে সম্পর্ক ও পরিণয়ও যে সেই বেহালার কল্যাণেই। দ্বিতীয় স্ত্রী এলসা প্রথম যেদিন তার চাচাতো ভাইকে বেহালা বাজাতে দেখেন, সেদিনই তার প্রেমে পড়ে যান। তবে যতটা না দেখে তার থেকেও ঢের বেশি বেহালার মনোমুগ্ধকর সুর শুনে।

 

 

 

 

 

 

পরবর্তীতেও স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এলসা আইনস্টাইন স্বামীর বেহালা বাজানোর নানা স্মৃতি তুলে ধরেছেন। পদার্থ বিজ্ঞানী হিসেবে পৃথিবী বিখ্যাত হলেও এলসা কিন্তু তাকে একজন বেহালাবাদক হিসেবেই পছন্দ করতেন। বিয়ে করার কারণও ছিল সেটি। এলসা বলতেন, আইনস্টাইন তার বেহালায় মোৎসার্ট’এর সুর এত সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলতেন, যা ছিল অসাধারণ।

মা পলিন আইনস্টাইনের কল্যাণেই মাত্র ৬ বছর বয়সে হাতে বেহালা তুলে নিয়েছিলেন তিনি। জটিল অংকের জীবনে সুরই ছিল তার কাজের প্রেরণা। স্মৃতিচারণে এলসা জানিয়েছিলেন, কাজ করতে গিয়ে আইনস্টাইন যখন হাঁপিয়ে উঠতেন তখন বেহালাই ছিল তার প্রশান্তির মাধ্যম। কখনও কখনও জটিল অংকের সমাধান বের করতে না পারলে বেহালার সাহায্য নিতেন তিনি। বাজিয়ে যেতেন বেহালা। কিছুক্ষণের ভেতরে তা বন্ধও হয়ে যেত। বোঝা যেত, জটিল অংকের সমাধান মিলেছে তার।

 

 

 

 

 

 

 

আইনস্টাইন নিজেও একবার বলেছিলেন, তিনি বিজ্ঞানী না হলে সঙ্গীতকেই বেছে নিতেন। বলতেন, ‘সুর ছাড়া জীবন কল্পনা করা যায়না। আমি জীবনধারণ করি সুরের মধ্যে, জীবনের ছন্দও মেলে এই সুরের ভেতরেই। জীবনে আনন্দই পেয়েছি সুরের মধ্যে।’মাত্র ১৩ বছর বয়সে মোৎসার্ট’এর রচিত সুর শোনার পর আবারো তিনি বেহালা হাতে তোলেন। বলতে গেলে সেদিন থেকেই আইনস্টাইনের জীবনের অংশ যায় বেহালা। একটি টেবিল, একটি চেয়ার, এক পাত্র ফল আর একটি বেহালা—একজন মানুষকে সুখী হতে আর কী চাই?’ – তার বিখ্যাত উক্তিগুলোর মধ্যে অন্যতম।

 

 

 

 

 

 

 

বিখ্যাত মানুষটিকে যারা কাছে থেকে দেখেছেন তারাও আইনস্টাইনের বেহালা বাজানোর প্রশংসা করতেন। একবার এক বন্ধু তার বেহালা বাজানো সম্পর্কে লিখেছিলেন, অনেক বাদকেরই সুর তোলায় নানা কৌশল ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু আমার বিশ্বাস তাদের কেউ আইনস্টাইনের মতো গভীর মন দিয়ে বেহালা বাজাতে পারে না।

আইনস্টাইন নিজেই বলেছিলেন, ‘আমি খুব সুখী। কারণ, কারও কাছে আমার কিছু চাওয়া পাওয়ার নেই। আমার অর্থ, পদক, খেতাব, উপাধির প্রয়োজন নেই। প্রশংসার জন্যও আমি লালায়িত নই। আমার নিজের কাজ ছাড়া যে একটি মাত্র বিষয় আমাকে আনন্দ দেয়, তা হচ্ছে আমার বেহালা।’বিটোফেন শেষ পর্যন্ত আইনস্টাইনকে বেশি টানেনি। তিনি আমৃত্যু মোৎসার্ট’এ মুগ্ধ ছিলেন, তাঁর প্রিয় অন্য সুরস্রষ্টাদের মধ্যে ছিলেন বাখ, শুবার্ট, ভিভালদি ও কোরেল্লি।

 

 

 

 

 

 

 

১৯২৯-এ আইনস্টাইন যখন বেলজিয়াম সফরে এলেন, রানি এলিজাবেথ তাঁর সঙ্গে বেহালা বাজানোর জন্য বিজ্ঞানীকে রাজপ্রাসাদে আমন্ত্রণ জানালেন। রানির নিজেরও বেহালাবাদনের সুখ্যাতি ছিল। সেই অনুরোধ ফেরাননি আইনস্টাইন। তিনি নেদারল্যান্ডসে অক্সফোর্ডে বেহালা বাজিয়েছেন। এমনকি প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে শরণার্থী সহায়তা তহবিল গড়তে গ্যাবি ক্যাসাডেসাসের সঙ্গে যুগলবন্দীও বাজিয়েছেন।জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে একসময় দেখলেন সহজভাবে বাঁ হাত আর তুলতে পারছেন না। ফলে বেহালা রেখে দেন। আর হাতে তুলে নেননি। ১৯৫৫-এর ১৮ এপ্রিল আইনস্টাইনের মৃত্যু হয়।