প্রথমবার্তা,প্রতিবেদকঃ   আইনের কাছে এবং সমাজে মৃত হিসেবে স্বীকৃত হলেও লোকটি আসলে জীবিত। এখন আইনগতভাবে নিজেকে জীবিত প্রমাণ করার জন্য চার বছর ধরে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ভারতের সন্তোষ কুমার সিংহ। নিজেকে জীবিত প্রমাণ করার জন্য ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে থাকাসহ আজব আজব কাজ করেছেন তিনি।

 

 

 

 

একবার এক পুলিশের আঙুল কামড়ে তিহাড় জেলে কাটিয়েছেন দিন পনেরো। মরেই যদি গিয়ে থাকেন, তাহলে পুলিশকে কামড়ালেন কী করে?  ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী সুষমা স্বরাজের অসুস্থ্যতার খবরে তাকে কিডনি দিতে ছুটে গিয়েছিলেন এইমস হাসপাতালে। মরা লোকের কিডনি হয় কি?চার বছর ধরে এভাবেই নিজেকে ‘জীবিত’ প্রমাণ করার জন্য মরিয়া লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন সন্তোষ কুমার সিংহ। নতুন বছরে নরেন্দ্র মোদীর বারাণসী থেকে বিধানসভা ভোট লড়তে চান।

 

 

 

 

 

ভোটে লড়ে বলতে চান, তিনি ‘মৃত’ নন, জীবিত।বাড়ি বারাণসীর ছিতাওনি গ্রামের চৌবেপুর থানায়। কিন্তু উত্তরপ্রদেশের রাজস্ব বিভাগের খাতায় মানুষটি ‘মৃত’। চোদ্দো বছর আগে ‘আঁচ’ সিনেমার শ্যুটিং করতে ছিতাওনি এসেছিলেন নানা পাটেকর। সন্তোষের হাতের রান্না খেয়ে এতই মুগ্ধ হন যে তাঁকে মুম্বাই নিয়ে গিয়ে নিজের বাড়িতে রাখেন। দশ বছর সেখানেই ছিলেন সন্তোষ। উত্তরপ্রদেশের রাজপুত ছেলেটি মুম্বাইতেই বিয়ে করেন এক দলিত মেয়েকে।

 

 

 

 

তারপরই জীবনে এক নতুন মোড়। দলিত মেয়েকে বিয়ে করার ‘অপরাধে’ উত্তরপ্রদেশে তাকে সামাজিকভাবে বহিষ্কার করে গ্রামবাসী। তারা জেলা প্রশাসনকে জানিয়ে দেন, মুম্বাই ট্রেন বিস্ফোরণে মারা গিয়েছেন সন্তোষ। তিনি ‘মৃত’। ঘটা করে গ্রামে শ্রাদ্ধও হয়। বাবার থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সাড়ে ১২ একর জমিও দখল করেন পরিবারের লোকেরা। মুম্বাইয়ে সন্তোষের কাছে যখন এ খবর পৌঁছায়, তখন তিনি পাকাপাকিভাবে ‘মৃত’।

 

 

 

 

তারপর থেকে শুধু বেঁচে থাকার লড়াই নয়, বেঁচে ওঠারও লড়াই চালাচ্ছেন সন্তোষ। দিল্লির যন্তর-মন্তরে বসে ধর্না দিচ্ছেন বছর চারেক হয়ে গেল। প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখেছেন, মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদবের কাছে দরবার করেছেন, পুলিশকে কামড়েছেন, সুষমাকে কিডনি দিতে চেয়েছেন— তাও ‘বেঁচে’ ওঠেননি এখনও। পরিচালক সতীশ কৌশিক একটি ছবিও বানাতে চেয়েছিলেন সন্তোষকে নিয়ে।

 

 

 

 

নানা পাটেকরের বদৌলতে ফোন এসেছিল রাখি সাওয়ান্তের কাছ থেকেও। তার অনুষ্ঠান ‘রাখি ইন খাকি’-তে সন্তোষকে নিয়ে গিয়েছিলেন। একবার ‘বিগ বস’-এ যাওয়ার কথাও মনে হয়েছিল, যাতে লোকে দেখে কঙ্কাল নয়, হেঁটে বেড়াচ্ছেন পুরোদস্তুর জীবন্ত লোক। কিন্তু বারণ করেন নানা। আপাতত: ‘ম্যায় জিন্দা হুঁ’- প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে শীতের দিল্লিতে খোলা রাস্তায় বেঁচে ওঠার স্বপ্ন দেখে যাচ্ছেন সন্তোষ। বললেন, ‘বেঁচেও মরে থাকাটা যে কী যন্ত্রণার, সেটি অন্য কারও পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। সামনের গুরুদ্বারে দু’বেলা দু’মুঠো ভাত জোটে। তাই নিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছি পাকস্থলীকে। কীভাবে সরকারের টনক নড়বে জানি না।’

 

 

 

 

 

শুধু উত্তরপ্রদেশেই এমন ‘মৃত’র সংখ্যা কয়েক হাজার। যা নিয়ে একটি সংগঠনও তৈরি হয়ে গিয়েছে সেখানে। নাম ‘উত্তরপ্রদেশ মৃতক সঙ্ঘ’। সন্তোষের মতো খাতায়-কলমে ‘মৃত’ লোকেরাই সংঘের সদস্য। এই সংগঠনের হোতা লালবিহারী। প্রশাসনকে ঘুষ দিয়ে তার কাকা ১৯৭৬ সালে লালবিহারীকে ‘মৃত’ ঘোষণা করে দিয়েছিলেন। তার পর থেকে ১৮ বছর লড়াই করে তিনি ‘জীবিত’ হয়েছেন। নিজেকে ‘জীবিত’ প্রমাণের জন্য রাজীব গান্ধী, বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংহের বিরুদ্ধে ভোটে লড়েছেন। আইনি লড়াই লড়েছেন।

 

 

 

 

নিজের নাম বদলে রেখেছিলেন ‘লালবিহারী মৃতক’। সেই রকম খাতায় কলমে আরও যারা এখনও ‘মৃতক’, তাঁদের জন্য লড়াই জারি রেখেছেন তিনি। উত্তরপ্রদেশ সরকার কিছু করবে না? প্রশাসনের এক কর্তার আশ্বাস, এমন ভূরি ভূরি অভিযোগ সরকারের কাছে আছে। আইনি পদ্ধতিতেই তার সমাধান হবে।কবে হবে? চোদ্দো বছর তো কেটে গেল। লালবিহারীর পরামর্শে এখন বারাণসী থেকে ভোটে লড়তে চাইছেন সন্তোষ। নতুন বছরে পুনর্জন্ম হবে কি?

সূত্র: আনন্দবাজার