প্রথমবার্তা,প্রতিবেদকঃ   পাকেচক্রে প্রাইম মিনিস্টার। এই সিনেমার নামের ভাবানুবাদ করলে তেমনটাই দাঁড়ায়। নামেই সবটা বলা আছে। আর তার পরের ২ ঘণ্টা ধরে সেই পাক আর চক্রের স্বরূপ উদঘাটন হলো! প্রথম থেকে শেষ, এই দুঘণ্টার পুরোটা জুড়ে শুধু রাজনীতিই আছে। সিনেমা কতটা আছে সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। কিন্তু ‘গেম অব থ্রোনস’ নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই।এবার আসল কথায় আসি। সিনেমা শুরু হচ্ছে ২০০৪ থেকে। ক্ষমতায় এসেছে ইউপিএ। সনিয়া গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হবেন কি না সেই নিয়ে তুমুল অশান্তি! সুষমা স্বরাজ, উমা ভারতী, সক্কলে টিভি ক্যামেরায় ছিছিক্কার করছেন। টালবাহানার পর সোনিয়া গান্ধী মনমোহন সিংয়ের নাম প্রস্তাব করলেন।

 

 

 

 

 

যে বইয়ের অনুসরণে এই ছবি, তার রচয়িতার নাম সঞ্জয় বারু। বিশিষ্ট সাংবাদিক। ইউপিএ-ওয়ানে প্রধানমন্ত্রীর মিডিয়া অ্যাডভাইসার। এই ছবিতে তিনিও আছেন। স্বচরিত্রে। অভিনয়ে অক্ষয় খন্না। তিনিই এই গল্পের সূত্রধর। ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে তিনি সরাসরি দর্শকদের সঙ্গে কথা বলেন। না বলা কথাটুকু খোলসা করে বুঝিয়ে দেন। কোনটা রাজনীতি, কোনটা অরাজনৈতিক। সে হিরো, কে ভিলেন, সব তিনিই দর্শকদের ধরিয়ে দেন। (খানিকটা হাউস অফ কার্ডসের ফ্র্যাঙ্ক আন্ডারউডের মতো!)যাইহোক, ইউপিএ টু ক্ষমতায় এলো। তখতে বসলেন মনমোহন সিং। অনুপম খেরের মতো দাপুটে অভিনেতাও মনমোহনের গলা নকল করতে গিয়ে দর্শকদের একটু অস্বস্তিতেই ফেললেন বৈকি!

 

 

 

 

 

 

এবার গল্পটা দুলাইনে বলে ফেলি। মোদী তার প্রায় প্রতিটা জনসভায় যে অভিযোগটা করে এসেছেন, এরপরের দুঘণ্টা ঠিক সেই সুরই বাজবে। মোদ্দা কথাটা হলো– মনমোহন সিং আদ্যন্ত শিক্ষিত, সভ্য একজন অর্থনীতিবিদ। মৃদুভাষী। ভালো মানুষ। কিন্তু ‘মা-ছেলে’র দাপটে জর্জরিত। তিনি প্রেস কনফারেন্স করতে হোঁচট খান। বেশি কথা বলেন না। নাম চান না, মাথা গুঁজে কাজ করেন। কিন্তু ক্রেডিট নিয়ে যায় ‘মা-বেটা’!

পারমাণবিক চুক্তি থেকে কয়লা কেলেঙ্কারি, যন্ত্রণায় জর্জরিত হয়েও গান্ধী পরিবারের বিরুদ্ধে টুঁ-শব্দটি করতে পারলেন না পাকচক্রের প্রাইম মিনিস্টার! সেই ‘হাতের পুতুল’ই রয়ে গেলেন। এই হল গল্প।রাজনৈতিক ছবি। চরিত্ররাও রাজনৈতিক। আহমেদ পটেল থেকে প্রণব মুখোপাধ্যায়, লালকৃষ্ণ আডবাণী থেকে অটলবিহারী বাজপেয়ী, পাক-চক্রের খুলাসায় তাঁদের সক্কলের ভূমিকা আছে। পিএমও বা প্রাইম মিনিস্টারের অফিসেও যে ‘ম্যাডামের’ চরেরা ঘুরঘুর করছে, সেটাও আছে বৈকি! এখানে বলে রাখি, এই যে সব তাবড় তাবড় রাজনীতিকদের কথা বলছি, সিনেমায় এঁরা সকলেই ডামিরূপে ধরা দিয়েছেন। কোনটা কে, বোঝানোর জন্য নেমপ্লেট ব্যবহার করেছেন পরিচালক। (মাঝেমধ্যে অবশ্য একই চরিত্র কখনও ডামিতে, কখনও আসল চেহারা দুটোতেই ধরা দিয়েছেন)

 

 

 

 

 

 

 

এ ছবি যে একটি ধারার রাজনৈতিক মতামত জাহির করতেই তৈরি হয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তা হতেই পারে। বাকস্বাধীনতা সক্কলের আছে। রাজনৈতিক প্রচারের জন্যই না-হয় হলো, কিন্তু সেটাও তো একটা ভালো সিনেমা বানিয়ে দেখানো যেত! তাতে অসুবিধে কী ছিল?চিত্রনাট্যে ফাঁক, পরিচালনার দুর্বলতা, শুধুই রাজনীতি-কা-খেল দেখাতে গিয়ে সিনেমাটাই যে বাদ পড়ে গেল!আর হ্যাঁ, আরও একটা কথা। এ ছবির চার-পাঁচটা দৃশ্যে রাহুল গান্ধীকে দেখা গেছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, তাঁকে বেশ ‘পাপ্পু সুলভ’ হিসেবেই সামনে এনেছেন পরিচালক। সোনিয়া গান্ধীর চরিত্রটিকেও ডার্ক বললে ভুল হবে না বোধহয়।যারা অ্যাক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার বইটা পড়েছেন, তাঁরা এ সিনেমা দেখলে বড্ড হতাশ হবেন। সঞ্জয় বারু মনমোহন সিংয়ের মিডিয়া অ্যাডভাইজার ছিলেন। ব্যক্তিগত সম্পর্কও দারুন ছিল। কিন্তু এই ছবিতে পিএমও-র অন্দরে তাঁর যে ‘ড্রয়িংরুম সুলভ’ চলাফেরা, সেটা একেবারেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। মনমোহনের সঙ্গে সোনিয়ার বৈঠকে বা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দলীয় নেতৃত্বের মিটিংয়ে বারু কখনওই উপস্থিত থাকতেন না।

 

 

 

 

 

 

 

বইয়ের নাম আছে। কিন্তু বইয়ের গল্প সিনেমায় বেশ এদিক ওদিক হয়েছে। নির্মাতারা অবশ্য আগেই বলেছেন, এটা বইয়ের হুবহু গল্প নয়। বেসড অন দ্য বুক।বারুর ভূমিকায় অক্ষয় খান্না বেশ সাবলীল। তবে তার সর্বজ্ঞ-সর্বব্যাপী অবতারটিও ঠিক বিশ্বাসযোগ্য নয়। অভিনয়টা দাপিয়ে করেছেন। কিন্তু চরিত্রের ফাঁক অভিনেতাই বা ঢাকবেন কী করে?এককথায় যদি বলি, তা হলে এই সিনেমাটা খানিকটা সেই স্কুলের উপপাদ্যের মতো। শেষলাইনে যেমন লিখে দিতাম, অতএব প্রমাণিত হলো উপরের সমীকরণটি যথার্থ। এখানেও ঠিক তেমনটাই হয়েছে। ছবি শেষ হলো মোদীর ছবি দেখিয়ে। (না, মোদীর ভূমিকায় কেউ অভিনয় করেননি!!) গোটা সিনেমা জুড়ে যে কথাটা প্রমাণ করার মরিয়া চেষ্টা করে গেলেন পরিচালক, মোদীও শেষমেশ মঞ্চে উঠে সেই ‘মা-বেটেকা সরকার’ ‘এক পরিবার’ বলে হুঙ্কার দাগলেন।অতএব প্রমাণিত হলো যে ছবির বিষয়বস্তু এক্কেবারে যথার্থ!

সূত্র: জিএন