প্রথমবার্তা,প্রতিবেদকঃ  দাতাদের কাছ থেকে অর্থ ছাড়ে দেশের বৈদেশিক ঋণের বোঝা বেড়েই চলেছে। গত অর্থবছরে দেশের ইতিহাসের রেকর্ড পরিমাণ ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক ঋণ এসেছে। আবার চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের পাঁচ মাসে প্রকল্প সহায়তা হিসেবে ঋণ ও অনুদান মিলে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে প্রায় ১৮৭ কোটি ডলার ছাড় হয়েছে।

 

 

 

 

 

২০১৩-১৪ হতে ২০১৭-১৮ পর্যন্ত ৫ অর্থবছরে বৈদেশিক সহায়তার ছাড়করণের পরিমাণ ১৯.৮৫ বিলিয়ন ডলার। সবমিলিয়ে বাংলাদেশের ঋণের পরিমাণ ২৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এর ফলে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ওপর চাপ বাড়ছে। আগামী বছরগুলোতেও এ চাপ অব্যাহত থাকবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। কারণ ইতিমধ্যেই প্রতিবেশী বেশ কয়েকটি দেশে ঋণের বোঝার চাপ দৃশমান হয়ে পড়েছে।

 

 

 

 

 

এদিকে ২০১৮-১৯ থেকে ২০২০-২১ পর্যন্ত তিন অর্থবছরে সরকারকে পরিশোধ করতে হবে ৫১৫ কোটি ডলার বা ৪১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। বিদেশি ঋণ পরিশোধের অঙ্ক বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, সরকারের বেশ কয়েকটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বড় প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নে অধিক গুরুত্ব দেয়ার কারণে মূলত ঋণ বাড়ছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি’র) প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

 

 

 

 

 

এদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুসারে বর্তমানে দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ১৭ লাখ। এ হিসাবে প্রতিটি নাগরিকের মাথাপিছু ঋণ ৬০ হাজার টাকা। তাই চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ঋণের সুদ পরিশোধে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রেখেছে সরকার। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কর আদায় করতে না পারায় সরকারকে বেশি ঋণের আশ্রয় নিতে হচ্ছে। আর এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামী ৪-৫ বছরের মধ্যে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে।

 

 

 

 

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের কর্মকর্তারা বলেন, ঋণ নিলে তো পরিশোধ করতেই হবে। এক্ষেত্রে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে নেয়া ঋণের আসলের প্রথম কিস্তি পরিশোধ করা হয়েছে সমপ্রতি। ফলে চলতি অর্থবছরে ঋণ পরিশোধ গত অর্থবছরের চেয়ে বেড়েছে।

 

 

 

 

 

পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর মনে করেন, ঋণের বোঝার কারণে অনেক দেশই ঝুঁকিতে পড়েছে। ঋণের পরিমাণ বাড়লে কি অবস্থা দাঁড়ায় এটা দৃশ্যমান হচ্ছে- পাকিস্তান, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা ও মালয়েশিয়ায়। তিনি বলেন, আমাদের দেশে এখনো ওই অবস্থায় যায়নি। তবে আমরা যদি ঋণের সঠিক ব্যবহার করতে না পারি। আগামীতে এই বোঝা ভারী হবে। তিনি বলেন, সরকার ঠিকমতো ঋণ ব্যবস্থাপনা করতে পারছে না। তুলনামূলকভাবে বিদেশি ঋণ অনেক সাশ্রয়ী। কিন্তু সরকার সহজ পথ হিসেবে বেছে নেয় বেশি সুদের অভ্যন্তরীণ উৎসকে। এতে আর্থিক খাতে চাপ বেড়ে যায়।

 

 

 

 

 

ইআরডি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে ১১০ কোটি ডলার বা ৯ হাজার ৮৩ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে আসলের পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ১৮০ কোটি ৮৫ লাখ টাকা এবং সুদ ১ হাজার ৯০৩ কোটি টাকা।
অন্যদিকে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের একই সময়ে ঋণ পরিশোধ করা হয়েছিল ৮৩ কোটি ১৩ লাখ ডলার বা ৬ হাজার ৫৫২ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে আসল ছিল ৫ হাজার ২১৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকা এবং সুদ ১ হাজার ৩৩৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা।

 

 

 

 

 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৬০ কোটি ডলার বা ১২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে আসল ১২৫ কোটি ডলার বা ১০ হাজার কোটি টাকা এবং সুদ ৩৫ কোটি ডলার বা ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এছাড়া ২০১৯-২০ অর্থবছরে ঋণ পরিশোধের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১৭৩ কোটি ডলার বা ১৩ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা।

 

 

 

 

এর মধ্যে আসল ১৩৫ কোটি ডলার বা ১০ হাজার ৮০০ কোটি টাকা এবং সুদ ৩৮ কোটি ডলার বা ৩ হাজার ৪০ কোটি টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে পরিশোধ করতে ব্যয় হবে ১৮২ কোটি ডলার বা ১৪ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা। এর মধ্যে আসল ১৪০ কোটি ডলার বা ১২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা এবং সুদ ৪২ কোটি ডলার বা ৩ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা।

 

 

 

 

 

এদিকে চলতি অর্থবছর সরকার দেশি-বিদেশি ও ব্যাংক খাত বাদে সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে ২৬ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য রয়েছে। এর মধ্যে গত ৬ মাসেই ২৫ হাজার ঋণ নেয়া হয়েছে। এ ঋণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল। কারণ সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে যে ঋণ নেয়া হয়, তার বিপরীতে সরকারকে বছরে ১১ শতাংশ পর্যন্ত সুদ গুনতে হচ্ছে। এ কারণে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ঋণ পরিশোধে ৫১ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে সরকার।

 

 

 

 

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ঋণমান সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ভালোই আছে। চিন্তার কারণ নেই। তবে সাম্প্রতিকালে ঋণ নেয়ার হার বাড়ছে। এজন্য অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। ঋণের বোঝা বৃদ্ধি কোনো দেশের জন্য শুভ লক্ষণ নয়।

 

 

 

 

তাই আমাদেরকে সহজ শর্তে ঋণ নেয়ার দিকে ঝুঁকতে হবে। বেশি সুদ দিতে হয় এমন ঋণ পরিহার করতে হবে বলে জানান তিনি।ইআরডি সূত্রে জানা গেছে, গতবারের তুলনায় এবার সরকারের সুদাসল পরিশোধ বাবদ ব্যয়ও কিছুটা বেড়েছে। নভেম্বর মাস পর্যন্ত দাতাদের কাছে পুঞ্জিভূত পাওনা হিসেবে ৬০ কোটি ৪১ লাখ ডলার পরিশোধ করেছে। এরমধ্যে আসল হিসাবে পরিশোধ করা হয়েছে ৪৫ কোটি ১৮ লাখ ডলার এবং সুদ পরিশোধ করা হয়েছে ১৫ কোটি ২৩ লাখ ডলার।

 

 

 

 

নভম্বের পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ৪১ কোটি ৬৩ লাখ ডলার ছাড় করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। এরপর বিশ্বব্যাংক ছাড় করেছে ৩৬ কোটি ৮৭ লাখ ডলার এবং জাপান সরকারের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার (জাইকা) ছাড় করা অর্থের পরিমাণ ৩৫ কোটি ২৫ লাখ ডলার।

 

 

 

 

 

 

ইআরডি’র তথ্যমতে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণ (পাবলিক সেক্টরে) ২৫ হাজার ৯০৮ মিলিয়ন ডলার বা ২ লাখ ৭ হাজার ২৬৫ কোটি টাকা। ওই অর্থবছরে সরকারকে ঋণ বাবদ সুদ পরিশোধ করতে হয়েছে ১ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা।অন্যদিকে ২০১২-২০১৩ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ ছিল ২৪ হাজার ৯০৭ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১ লাখ ৯৫ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা। যার সুদ পরিশোধ করতে হয়েছে ২ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা।

 

 

 

 

 

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে সব মিলিয়ে ৭১৭ কোটি ডলার বিদেশি সহায়তা ছাড় করে তা বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যবহার করতে চায় সরকার। গতবার অবশ্য ৭১৭ কোটি ৫০ লাখ ডলারের সমপরিমাণ অর্থ ছাড় হয়েছিল।

 

 

 

 

ঢাকায় নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বৈদেশিক ঋণ এখনো জিডিপি’র তুলনায় কম। বিদেশি ঋণ কাজে লাগাতে পারলে দেশের অর্থনীতির জন্য ভালো। তবে উপকারের পুরোপুরি সুযোগ আমরা কাজে লাগাতে পারছি না। ১০০ টাকার প্রকল্পে যদি ৫০০ টাকা খরচ করি তা হলে ফলাফল ভালো আসবে না। এছাড়া রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি কম। কাঙ্ক্ষিত হারে আসেনি ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ। তাই আগামীতে চ্যালেঞ্জ হতে পারে বলে জানান তিনি।

 

 

 

 

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দেয়া তথ্য মতে, চলতি অর্থবছরের পাঁচ মাসে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ দুই হাজার কোটি টাকা। এই সময়ে আদায় হয়েছে ৭৮ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকা। সে হিসাবে ঘাটতি ২৩ হাজার কোটি টাকা।

 

 

 

 

সমপ্রতি সংসদে অর্থমন্ত্রীর দেয়া তথ্যানুযায়ী ২০১৫ সালের ৩০শে জুন পর্যন্ত ১১টি সংস্থা ও দেশের কাছ থেকে মোট ২ লাখ ৭ হাজার ২৬৫ কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ নিয়েছে বাংলাদেশ। যার মধ্যে বিশ্বব্যাংক থেকে সর্বোচ্চ ১ লাখ ২ হাজার ৩৪৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা নেয়া হয়েছে। এছাড়া এডিবি থেকে ১ হাজার ৮৫০ কোটি ৫৬ লাখ, জাপান থেকে ১৯ হাজার ৩৭৬ কোটি ১৮ লাখ কোটি, চীন থেকে ৭ হাজার ৩৫৬ কোটি ৭ লাখ, ইসলামী ডেভলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি) থেকে ৩ হাজার ৩৫৮ কোটি ২১ লাখ টাকা, ডেনমার্ক থেকে ৮৬৯ কোটি ২১ লাখ টাকা, ভারত থেকে ১ হাজার ৬৫৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, কুয়েত থেকে ১ হাজার ৭৫ কোটি ৪৬ লাখ টাকা, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ২ হাজার ৭৯১ কোটি ৭৮ লাখ টাকা, ইফাদ থেকে ২ হাজার ৯৩৫ কোটি ৩৯ লাখ টাকা এবং অন্যান্য সংস্থা ও দেশ থেকে ৩ হাজার ৬৫০ কোটি ২১ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছে বাংলাদেশ।

 

 

 

 

দাতা দেশ ও সংস্থাগুলো সরকারের নেয়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) অন্তর্ভুক্ত প্রকল্পে অর্থসহায়তা দিয়ে থাকে। তুলনামূলক কম সুদে ঋণ পাওয়া যায় বলে সরকার এসব ঋণ নিয়ে থাকে।