প্রথমবার্তা,ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধিঃ  খুনিয়াদীঘি নামের ইতিহাস আলোচনা করতে এখনো গাহয়ে কাটা দেয়! দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও শত মানুষ চোখে দেখান দৃশ্য ভুলতে পারেননি।এমনি একজন প্রত্যক্ষদর্শী হলেন,‘খুনিয়াদীঘির লালটকটকে পানি আমার চোঁখের দেখা, আজ এ কথা বলতে চাই-‘খুনিয়াদীঘি মানে স্বাধীণ বাংলাদেশ’।

 

 

 

 

ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলা সদর। এখান থেকে মাত্র সিকি মাইল দক্ষিণে পাকা রাস্তা সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় পাকিস্তানি হানাদারদের বর্বরতার নিরব সাক্ষী ‘খুনিযা দীঘি’ বধ্যভূমি। যা ঠাকুরগাঁও জেলারতো বটেই দেশের বড় বধ্যভূমিগুলোরও একটি।৬ একর আয়তনের খুনিয়া দিঘি প্রায় দুইশ’ বছর আগে স্থানীয় কোনও জমিদার খনন করেছিলেন। জনশ্রুতি আছে এই এলাকার ব্যবসায়ীরা দিঘির পাশ দিয়ে ব্যবসা করতে রায়গঞ্জে যেতেন।

 

 

 

 

দীঘি এলাকাটি নির্জন জঙ্গলাকীর্ণ ছিল। এখানে এক ব্যবসায়ীকে খুন করে দিঘির পাড়ে ফেলে রাখা হয়েছিল। তখন থেকেই এর নাম হয়ে যায় খুনিয়া দিঘি। ধারণা করা হয়, মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী প্রায় কয়েক হাজার মানুষকে হত্যা করে এই দিঘিতে ফেলে রাখে।

 

 

 

 

বিজয়ের মাস ডিসেম্বর এলেই ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলা হানাদারদের সেই রোমহর্ষক নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞের কথা স্মরণ করে শিউরে ওঠেন এখানকার মানুষ। সেসময় বিভিন্ন এলাকা থেকে স্বাধীনতাকামী নিরীহ লোকজনদের ধরে এনে এখানে মুক্তিযোদ্ধাদের খবর জানতে একটি শিমুল গাছের সঙ্গে হাতের তালুতে পেরেক গেঁথে ঝুলিয়ে রেখে রাইফেলের বাট ও বেয়োনেট দিয়ে অবর্ণনীয় নির্যাতন চালানো হতো। এরপর সেই হতভাগ্য নিরীহ মানুষগুলোকে দিঘির পাড়ে দাঁড় করে ব্রাশফায়ার করতো হানাদার বাহিনী। তাদের দোসর রাজাকাররা লাশগুলো ভাসিয়ে দিত দিঘির জলে।

 

 

 

 

 

সেখানেই লাশগুলো পচে গলে পানির সঙ্গে মিশে যেত। হাজার লাশ আর রক্তে দিঘির পানির রং সব সময়ই থাকতো লাল। শুধু তাই নয়, খান সেনারা স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় এলাকার তরুণী ও সুন্দরী নারীদের পিতা-মাতা এবং স্বামীর উপস্থিতিতেই ধরে এনে ক্যাম্পে আটকে রেখে চালাতো পাশবিক নির্যাতন। সেই স্মৃতি ভাবলে আজও শিউরে ওঠেন এলাকার মানুষ।১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন হানাদার বাহিনীর নিষ্ঠুরতম নির্যাতনের বর্ণনা করতে গিয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল ডিগ্রি কলেজ অধ্যক্ষ তাজুল ইসলাম বলেন,‘পাকিস্তানী সেনারা আমার ভাই নজরুল ইসলামকে ধরে এনে এই খুনিয়া দিঘিতেই হত্যা করেছে। ক্যাম্পে আটকে রেখে ওরা সুন্দরী নারীদের ওপর বর্বর নির্যাতন চালাত।

 

 

 

 

 

এতে তাদের অনেকে অন্ত:সতͦা হয়ে পড়েছিলেন। দেশ স্বাধীনের পর তাদের অনেকের কোলে জন্ম নেয় পিতৃ পরিচয়হীন অনেক সন্তান। যাদের আর পুনর্বাসন করা হয়নি। এছাড়া খান সেনারা স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় পীরগঞ্জ, রাণীশংকৈল, হরিপুর উপজেলার কয়েক হাজার লোককে ধরে নিয়ে এসে রাণীশংকৈলের খুনিয়া দিঘির পাড়ের একটি শিমুল গাছের সঙ্গে হাতের তালুতে পেরেক মেরে ঝুলিয়ে রেখে মুক্তিযোদ্ধাদের খবর জানতে নানা নির্যাতন চালায়। পরে হত্যা করে লাশ ভাসিয়ে দিতো এই খুনিয়া দিঘির জলে।খুনিয়া দিঘীর পাড়ে পাক বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের নিরব সাক্ষী সেই শিমুল গাছটি এখন ডালপালা বিস্তার করে বিরাট আকার ধারণ করেছে। শহীদদের স্মৃতি ধরে রাখতে ওই পুকুর পাড়ে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়।

 

 

 

 

 

তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার এনামুল হক টেন্ডারের মাধ্যমে আর সিসি পিলার দিয়ে বাউন্ডারি ওয়াল গ্রিলসহ মোট ৯ লাখ টাকার কাজ সম্পন্ন করেন।উপজেলা মুক্তি যোদ্ধা কমান্ডার হবিবর রহমার বলেন, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে ধরে রাখতে প্রয়োজনে এখানে জাতীয় পর্যায়ের স্মৃতিসৌধ তৈরির কথা জানান।২৬ শে মার্চ রাত ১২টা এক মিনিটে তোপধ্বনির পর ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয় খুনিয়া দিঘির শহীদদের।

 

 

 

 

 

 

শহীদদের স্মৃতি ধরে রাখতে এবারে বর্তমান মাননীয় স্বর্রামন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান জানিয়েছেন, আগামী ২৫শে মার্চ গণহত্যা দিবস উপলক্ষে রাত ৯টা থেকে ৯টা ১ মিনিট পর্যন্ত সারাদেশে বøাক আউট পালন করা হবে। এই এক মিনিট অন্ধকারে থাকবে সারাদেশ। রোববার (৩ মার্চ) ২৫শে মার্চ গণহত্যা দিবস এবং ২৬ শে মার্চ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উদযাপন উপলক্ষে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত একটি মিটিং শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ তথ্য জানান।