প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:    দুঃসময়ের খাঁচায় বন্দি হয়ে পড়লেই সম্ভবত সেরাটা বের হয়ে আসে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের! শাই হোপ আর রোস্টন চেসের মধ্যকার ১১৫ রানের জুটিতে তিন শরও বেশি রানের নিচে চাপা পড়ার আশঙ্কা ছিল। কিন্তু ডাবলিন আবহাওয়া অফিসের জানানো বৃষ্টির পূর্বাভাসের মতো সে আশঙ্কা মুছে দিয়েছেন মাশরাফি বিন মর্তুজা। এরপর ব্যাটসম্যানদের দায় ছিল দুই দিন আগে আয়ারল্যান্ডের দ্বিতীয় সারির দলের বিপক্ষে ব্যাটিং বিপর্যয়কে নিছকই ‘নেট প্র্যাকটিস’ প্রমাণ করা। তামিম ইকবাল, সৌম্য সরকার আর সাকিব আল হাসান মিলেই সে দায় মিটিয়েছেন। তাতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ত্রিদেশীয় সিরিজে নিজেদের প্রথম ম্যাচ জিতে হিম ঠাণ্ডা, চোট আর ফর্ম নিয়ে সংশয় অনেকটাই মুছে দিয়েছে বাংলাদেশ।

 

 

 

 

তিন শর দিকে ছুটতে থাকা প্রতিপক্ষকে ২৬১ রানে থামিয়ে রাখতে পারার আত্মবিশ্বাস যেকোনো দলকেই চাঙ্গা করবে। তবে ডাবলিনের ক্লন্টার্ফ ক্রিকেট ক্লাব গ্রাউন্ডে দিনভর বয়ে চলা হিম হাওয়া টার্গেটে আরো গোটা বিশেক রান জুড়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে! সামান্য ধৈর্যচ্যুতি ব্যাটসম্যানের পতন ডেকে আনে, বৈরী আবহাওয়া মনঃসংযোগে ব্যাঘাত ঘটাতে পারত। তামিম তো আরো একটি কারণে উতলা ছিলেন। অনেক দিন ম্যাচে নেই।

 

 

 

প্রস্তুতি ম্যাচে বড় ইনিংস খেলতে না পেরে একে ওকে জিজ্ঞাসা করছিলেন, ‘ব্যাটিং কেমন করছিলাম?’ গত পরশু প্র্যাকটিসের পর জানিয়ে যান, ‘নেটেও যা তা ব্যাটিং করলাম!’ কেমার রোচের বলে শর্ট কাভারে রোস্টন চেস ক্যাচটা রাখতে পারলে বিষাদের সময়কাল বাড়ত হয়তো। তবে ক্রিকেটে ‘জীবন’ খেলারই অংশ। ওই একটিবার রেহাই পাওয়ার পর তামিম খেলেছেন পরিণত তামিমের মতো। অ্যাশলে নার্সের সঙ্গে শীতল যুদ্ধ থেকে থাকতে পারে তাঁর। সে কারণেই কি না, ক্যারিবীয় এ অফস্পিনারের বিপক্ষেই একটু ছটফট করেছেন তামিম। তা ছাড়া বাকি ক্যারিবীয় বোলারদের সামলেছেন ম্যাচ পরিস্থিতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। অভিজ্ঞতায় যেন প্রতিদিনই ঋদ্ধ হচ্ছেন বাঁহাতি এ ওপেনার।

 

 

 

 

তবে বাইশ গজে অভিজ্ঞতারও মাঝেমধ্যে দম ফুরায়। শ্যানন গ্যাব্রিয়েলের যে বলটা তামিম শর্ট কাভারে জেসন হোল্ডারের হাতে তুলে দিয়েছেন, সেটির আর কোনো ব্যাখ্যা নেই। তাতে ২০ রানের জন্য আরেকটি সেঞ্চুরি বঞ্চিত তামিমকে সন্তুষ্ট থাকতে হলো ৪৫তম ওয়ানডে ফিফটি করে। এতেই পুরোপুরি ‘মুক্তি’ নেই তাঁর, অধিনায়কের সঙ্গে একটা বাজি যে হেরে গেছেন! আগের দিন মাশরাফি বলেছিলেন, ‘তুই অন্তত ৭০+ রানের একটা ইনিংস খেলবি।’ সে রকম হলে লন্ডনে গিয়েই অধিনায়ককে একটি বিশেষ উপহার দেওয়ার কথা তো এখন রাখতেই হবে তামিমকে!

 

 

 

 

তামিম একা নন, সেঞ্চুরির সুযোগ হাতছাড়া করেছেন সৌম্য সরকারও। এ দুজনের ১৪৪ রানের উদ্বোধনী জুটিই ফিনিশিং ল্যাপের কাছাকাছি পৌঁছে দিয়েছে বাংলাদেশকে। চেসের লং হপ ছক্কার হাতছানি দিয়েই এসেছিল সামনে। কিন্তু পুলটা ঠিকঠাক হয়নি আর দীর্ঘকায় চেসও সীমানা দড়ির ওপর দারুণ ক্যাচ নিয়ে সৌম্যর বিদায় নিশ্চিত করেছেন।

 

 

 

 

ব্যাটিংয়ে ওই একবারই আশঙ্কা উঁকি দিয়েছিল বাংলাদেশকে ঘিরে। লম্বা জুটি ভাঙার পর কী কী যেন হয়, অতীতে এমন অনেক হয়েছে। তবে গতকাল আর হয়নি। ক্রিজে আসা সাকিবকে মনে হলো এতক্ষণ বোধহয় তিনিই ব্যাটিং করছিলেন! কোনো জড়তা নেই, ফিল্ডিংয়ের ফাঁক গলে অনায়াসে প্রান্ত বদল করেছেন আবার হোল্ডারের বাউন্সারে করতেও দ্বিধাহীন। তাতে তামিম-সাকিব জুটি থেকে আরো ৫২ রান যোগ হয়েছে বাংলাদেশের ইনিংসে। এরপর ‘নটে গাছটি মুড়াল’, বাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচের গল্পও প্রায় ফুরাল! সাকিব আর মুশফিকুর রহিমের হাত ধরে জয়ের বন্দরে পৌঁছেছে বাংলাদেশ, পুরো ৫ ওভার অব্যবহৃত রেখে। ৪১তম ফিফটি করে অপরাজিত থেকেছেন সাকিব আল হাসান।

 

 

 

 

 

তবে ম্যাচের শুরুতে আবহাওয়া পূর্বাভাসের মতোই মেঘের আনাগোনা ছিল। ত্রিদেশীয় সিরিজের প্রথম ম্যাচে এ মাঠেই আইরিশ বোলারদের কচুকাটা করেছিলেন শাই হোপ আর জন ক্যাম্পবেল। তাও ভালো যে চোটের কারণে একাদশ থেকে ঝরে পড়েছেন শেষেরজন। তবে মাশরাফির চিন্তায় ছিলেন শাই হোপ, যিনি কি না গতকালও ৪৩তম ওভার পর্যন্ত চোখ রাঙিয়ে গেছেন বাংলাদেশকে। টানা দ্বিতীয় সেঞ্চুরি করেছেন ক্যারিবীয় এ ওপেনার। এ নিয়ে হোপের তিন সেঞ্চুরি হলো বাংলাদেশের বিপক্ষে, মাত্র ৭ ম্যাচে! সঙ্গে আরেক ওপেনার সুনীল অ্যামব্রিসও জমে গিয়েছিলেন।

 

 

 

 

অবশ্য তাঁর বিদায় হতে পারত ব্যক্তিগত ২০ রানেই, যদি মাশরাফির করা এলবিডাব্লিউর জোরালো আবেদন নাকোচ না করতেন আম্পায়ার মার্ক হাওথর্ন এবং যদি এ সিরিজে ডিআরএস থাকত। তো, এঁদের দুজনের মধ্যকার ৮৯ রানের জুটি ভাঙেন মেহেদী হাসান মিরাজ। ঠাণ্ডার দেশে ভালো বোলিং করতে না পারার অনুযোগের জবাব তিনি কাল দিয়েছেন। প্রথম ওভারেই ফিরিয়েছেন অ্যামব্রিসকে। অবশ্য এতে দুর্দান্ত ক্যাচ নিয়ে অবদান রেখেছেন মাহমুদ উল্লাহও। টানা ১০ ওভারের স্পেলে ৩৮ রান দেওয়াটা নিঃসন্দেহে আত্মবিশ্বাসও ফিরিয়ে আনবে মিরাজের মনে।

 

 

 

 

 

ক্লন্টার্ফের উইকেটে স্পিনাররা বাড়তি সাহায্য পাবেন, অনুমানের কথা আগের দিনই বলেছিলেন মাশরাফি। তবে বিশ্বের যেকোনো পরিবেশ কিংবা উইকেটেই বাংলাদেশের স্পিনবাজি সাকিব। অ্যামব্রিসের বিদায়ের পর ক্রিজে আসা ডোয়েন ব্রাভো সেট হওয়ার আগেই তাঁকে তুলে নিয়েছেন বাঁহাতি এ স্পিনার। এরপর আর উইকেট পাননি। তবে হোপ আর রোস্টন চেসের মতো সেট হয়ে যাওয়া ব্যাটসম্যানদেরও খোলসবন্দি করে রেখেছেন সাকিব। ১০-০-৩৩-১, ক্লন্টার্ফের উইকেটে যেকোনো বোলারের জন্যই ঈর্ষণীয় সাফল্য।

 

 

 

 

 

 

অবশ্য আসল কাজটা সেরেছেন অধিনায়ক স্বয়ং। প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় বল গ্রিপ করতে পারছিলেন না মুস্তাফিজুর রহমান, মারও খেয়েছেন তাই। মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিনও ব্রেক থ্রু দিতে পারছেন না। এমন অবস্থায় মরিয়া মাশরাফি স্লগ ওভারে ক্যারিবীয় ইনিংস ঢোকার আগেই শেষ করে দেন সাকিব এবং নিজের বোলিং কোটা। অবশ্য এ ফাটকা খেলেই ২ উইকেটে ২০৫ রান তুলে ফেলা ক্যারিবীয়দের নাগালের মধ্যে রেখেছেন মাশরাফি। নিজের শেষ ২ ওভারে ৫ বলের ব্যবধানে তিনি তুলে নিয়েছেন ৩ উইকেট। উইকেটগুলো কাদের? চেস, হোপ এবং ক্যারিবীয় ব্যাটিংয়ের শেষ ভরসা জেসন হোল্ডারকে। তাতেই স্লগ ওভারে নিঃসংকোচে বোলিং করেছেন মুস্তাফিজ এবং সাইফ। উইকেট পেয়েছেন দুজনে আর বাংলাদেশও পেয়েছে পেশাদার ব্যাটিংয়ে ম্যাচ শেষ করার প্রাণশক্তি।

 

 

 

 

 

 

দুঃসময় সরিয়ে সুসময়ের পথেও কি যাত্রা শুরু করল? শেল্ডন কট্রেলকে বাউন্ডারি হাঁকিয়ে সাকিব যখন ম্যাচ শেষ করেছেন, তখন কিন্তু ডাবলিনের আকাশ ফুঁড়ে সূর্যের ঝলমলে হাসি। এটা তো রূপক নয়, গোলার্ধের এ প্রান্তে আসার পর এমন সূর্যালোক গতকালই প্রথম দেখেছে বাংলাদেশ দল। ব্যাপারটা কাকতালীয় হলেও এমন জয়ের পর রৌদ্রস্নানের চেয়ে উপভোগ্য আর কি হতে পারে!