প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:  মারকিউরে হল্যান্ড হাউস হোটেলের রুমগুলো ছোট। তবে পরিবেশ দারুণ। লবির বাঁ ধারেই বার-কাম-কফি শপ। চায়ের জন্য সেখানে ঢুকতেই ডানের টেবিলে দুজন মুখোমুখি গম্ভীর আলোচনায় মগ্ন-স্টিভ রোডস ও তামিম ইকবাল। ভাবভঙ্গি দেখে মনে হলো, একজনের উদ্বেগ আরেকজন মুছে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। বিশ্বকাপের প্রথম তিন ম্যাচের পর বলে দেওয়ার দরকার নেই, কে কার মন থেকে উদ্বেগ মুছে দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। তো, সেখান থেকে উঠেই মন খুলে কথা বললেন তামিম ইকবাল।

 

 

 

 

 

প্রশ্ন : ফর্ম নিয়ে কোনো সংশয় ছিল না, এত প্রস্তুতি নিলেন। আপনার বিশ্বকাপটা কি সে রকম যাচ্ছে?তামিম ইকবাল : এখন পর্যন্ত ভালো না। আমি অনেক বড় আশা নিয়ে এসেছিলাম। আমার প্রতি সবার যেমন প্রত্যাশা, এখন পর্যন্ত সে রকম কিছু করতে পারিনি। তবে আমি আশাবাদী যে সহসাই আমার সেরা খেলায় ফিরতে পারব।

 

 

 

 

 

প্রশ্ন : আয়ারল্যান্ড থেকে এখানে আসার পর থেকেই উদ্বিগ্ন দেখছি। সেটার প্রভাবই কি পড়ছে আপনার ব্যাটিংয়ে? নাকি অন্য কোনো কিছু ঘটছে?তামিম : আমার ব্যাটিংয়ের একটা ছক আছে। দেখেন, তিনটি ম্যাচেই যদি শুরুতে আউট হয়ে যেতাম, তাহলে এত ভাবতাম না। কিন্তু তিনটি ম্যাচেই আউট হয়েছি উইকেটে সেট হওয়ার পর। আমার এমনটা হয় না। এটা আমার হতাশার কারণ। গত বিশ্বকাপের পর থেকে দারুণ সময় কেটেছে। এরপরও বিশ্বকাপটা ভালোভাবে শুরু করতে পারলাম না। এতে একটু চাপ তো অনুভব করছিই, অস্বীকার করব না। আমাদের দেশের মানুষের অনেক প্রত্যাশা। আমার নিজের কাছেই তো আমার অনেক প্রত্যাশা। তাই সবার উদ্দেশে একটা বার্তা দিতে চাই, একটু ধৈর্য ধরুন। সময় আসবে। তখন ভালো কিছুই করব। সেই ভালোর জন্য যতটুকু কষ্ট করার, আমি করছি। হয়তো বেশিই করছি। তবে সব সময় সব কিছু তো আর পরিকল্পনামতো হয় না। সে ক্ষেত্রে এটা মেনে নিতে হবে। সব কিছুর শেষ তো এখানেই নয়। অনেক ক্রিকেট খেলেছি। আশা করি চাপও সামলাতে পারব।

 

 

 

 

 

 

প্রশ্ন : আপনার তো চাপে এতটা মুষড়ে পড়ার কথা নয়। এত দিন খেলছেন, ফর্ম আছে এবং প্রস্তুতিও ভালো হয়েছে। এরপরও চাপ আসে কী করে?তামিম : প্রত্যাশার চাপ। ওই যে বললাম, আমার নিজেরই অনেক প্রত্যাশা। ওটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের প্রত্যাশা তো থাকবেই, বিশেষ করে আমাদের দেশে। যাঁরা এটা পড়ছেন, তারা হয়তো বুঝতে পারবেন না আমি কী বলতে চাচ্ছি। শুধু ঘনিষ্ঠরাই বুঝতে পারবে আমার কেমন লাগছে। মনে হচ্ছে আমি আবার ২০১৫ সালে ফিরে যাচ্ছি না তো! এটা আমি চাই না। গত বিশ্বকাপের সময় আমাকে, আমার পরিবারকে, স্ত্রীকে অনেক ভুগতে হয়েছে। ওটা আমার জন্য একটা কালো অধ্যায়। এই বিশ্বকাপে খেলছি, আমি চাই না আমি বা আমার পরিবার আবার ওই রকম পরিস্থিতির মধ্যে পড়ুক। ঘনিষ্ঠরা হয়তো বলবেন, ‘তুই এত রান করেছিস, সেঞ্চুরি করেছিস! এখন এসব চিন্তা করলে হবে?’ এ রকম বলা সহজ। শুধু সে-ই বুঝতে পারে, যে এটার মধ্য দিয়ে যায়। আবার সেসব দিনে ফিরে যেতে হয় কি না, আমি এটা ভেবে চিন্তিত। তবে ক্রিকেটে মজার ব্যাপারটা হলো এক-দুইটা ভালো ইনিংস খেললেই মানুষ সব ভুলে যায়। আমিও সে সময়টার অপেক্ষায় আছি।

 

 

 

 

 

প্রশ্ন : ২০১৫ বিশ্বকাপের ঘটনাগুলো সবার মনেও হয়তো আছে। আপনাকে, আপনার পরিবারকে বিস্তর ট্রল করা হয়েছে। এই তিন ম্যাচের পরই কি সে রকম শুরু হয়ে গেছে নাকি?তামিম : এবার খুব চেষ্টা করছি ওসব থেকে দূরে থাকতে। আমি এমনিতেই সোশ্যাল মিডিয়া বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করি না। আর আমার পরিবারও যদি জানে, আমি নিশ্চিত কেউই আমাকে বলবে না। তবে আশা করি ওই রকম কিছু এখনো হচ্ছে না। আরো ছয়টা ম্যাচ বাকি আছে। কয়েকটা ম্যাচ জিততে পারলে আমাদের সেমিতে ওঠার সম্ভাবনা আছে। কাজেই ওই রকম কিছু হবে না বলেই আশা করছি। শুধু আমার ক্ষেত্রে না, সবার জন্যই একটা কথা বলি। এবারও অনেককে নিয়ে অনেক কথা উঠছে। যাঁরা এসব করছেন তাঁদের অনুরোধ করব, যেন পাঁচটা মিনিট খোলা মনে চিন্তা করে দেখেন যাকে বলছেন সে গত ১২-১৩ বছরে কী করেছে, তাহলেই আর ওসব বলার ইচ্ছা হবে না। আমরা ফিট থাকি না থাকি, আমরা আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের জন্য লড়াই করি। কখনো সেই লড়াইয়ে জিতি, কখনো হারি। চেষ্টা কিন্তু কেউই কম করে না।

 

 

 

 

 

প্রশ্ন : আবারও সেই আগের প্রশ্নে ফিরছি। এসব ঝড়ঝাপটা তো এত দিনে কম সামলাননি। এরপরও চাপ নিচ্ছেন কেন?তামিম : সব মানুষ তো আর এক রকম না। কেউ এসব সহ্য করতে পারে, কেউ পারে না। আমার মনে একটা ভয় কাজ করে। সেটা আপনারা কেউ বুঝতে পারবেন না। গত বিশ্বকাপে যা যা হয়েছে, তার প্রভাব আমি, আমার স্ত্রী এবং আমার পরিবারের ওপর কতটা পড়েছে, সেটা দেশের ১৬ কোটি মানুষের কেউই বুঝতে পারবে না। আমি সেসব দিন ফিরে আসুক, চাই না। আমিও চাই না ওই সব দিনে ফিরে যেতে। এ আশা নিয়েই ইংল্যান্ডে এসেছিলাম যে এবার উল্টোটা দেখব। আগে খারাপটা দেখেছি, এবার ভালোটা দেখব। তবে আশা কিন্তু ছাড়িনি, এখনো সময় আছে।

 

 

 

 

 

প্রশ্ন : সেই ভালোর শুরু হতে পারে আপনার ভালো একটা ইনিংস দিয়েই। সেই ইনিংসটা এখনো আসেনি, কোথাও ঘাটতি রয়ে গেছে বলে কি মনে হচ্ছে আপনার?তামিম : ক্রিকেটে কোনো কিছুই যথেষ্ট নয়। এটা সবার জন্যই। আমি বলে দিতে পারি আমার গত ৫০ ম্যাচের স্কোরগুলো। কিন্তু তাতে কিচ্ছু যায়-আসে না। ক্রিকেট বর্তমান এবং ভবিষ্যতের খেলা। আমার বর্তমান নিয়েই মানুষ বেশি আলোচনা করবে। জানি একটা ভালো ইনিংস সুসময় ফিরিয়ে দেবে। সেটার জন্য চেষ্টাও কম করিনি, করছিও না। তবে নিজের ভুলও আছে। বিশ্বকাপের তিনটা ইনিংসের মধ্যে প্রথমটা নিয়ে আমার কোনো আক্ষেপ নেই, ভালো বল ছিল। কিন্তু পরের দুইবারই ভুল শট খেলে আউট হয়েছি। মাত্র দুটা ভুল সিদ্ধান্তের কারণে দুই ইনিংসে রান পাইনি। ভাগ্য একটু সহায় হলে হয়তো অন্য রকম হতে পারত। তবে ভাগ্য তো আর নিয়ন্ত্রণে নেই। চেষ্টা করব পরেরবার ভুল শট না খেলতে। তবে আবারও বলছি, আমি কিন্তু আশা ছাড়িনি। ভালো ইনিংস আসবে, ইনশাআল্লাহ।