প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংক ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে বাজেটে ব্যাংকিং খাতে বেশকিছু সংস্কারের ঘোষণা রয়েছে।একই সঙ্গে যেসব ব্যাংক সরকারের বিভিন্ন সুবিধা নিয়েও ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনেনি, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার হুশিয়ারি দেয়া হয়েছে।

 

এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংকিং খাতে যেসব সংস্কারের কথা বলা হয়েছে, সেগুলো দৃশ্যমান হলে গ্রাহকদের আস্থার বিষয়টি বোঝা যাবে। তখন তারল্যপ্রবাহ বাড়লে ঋণের সুদের হার কমবে। বাজেটে মুদ্রাবাজারে তারল্যপ্রবাহ বাড়ানোর যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, সেটি স্বল্পসময়ে সুফল বয়ে আনবে না।

 

ফলে ঋণের সুদের হার কমাতে এখন ব্যাংকগুলোকে নিজেদের অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসী খরচ কমাতে হবে। বাড়াতে হবে ঋণ আদায়।পোশাক শিল্পমালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির সভাপতি (বিজিএমইএ) ড. রুবানা হক যুগান্তরকে বলেন, সুদের হার কমাতে হবে। উচ্চ সুদ দিয়ে ব্যবসা করা যাবে না।

 

তিনি বলেন, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় আমরা নানাভাবে পিছিয়ে পড়ছি। তার ওপর সুদের হার বেশি হলে ব্যবসায় কোনোভাবে টিকে থাকা যাবে না। প্রতিযোগিতায় হেরে যাব। শুধু এক মাসেই বন্ধ করেছি ৩০টি কারখানা। প্রতিষ্ঠানগুলো লোকসানে জর্জরিত ছিল। তবে প্রস্তাবিত বাজেটে কিছুটা আশার কথা শুনিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

 

এখন চাইব, ঘোষণা অনুযায়ী যেন দ্রুত সুদের হার কমিয়ে আনা হয়।সূত্র জানায়, ঋণের সুদের হার কমাতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সরকার থেকে যেসব ছাড় দেয়া হয়েছে, সেসব বিষয়ে একটি প্রতিবেদন সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংক রেট কমানোর বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কাজ করছে।

 

ব্যাংক রেট কমানো হলে বাজারে এর কী ধরনের প্রভাব পড়বে, সে বিষয়টিও এরই মধ্যে সমীক্ষা করা হয়েছে। শিল্প খাতে কম সুদে ঋণের জোগান বাড়াতে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি তহবিল রয়েছে। এর আকার আরও বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন একটি তহবিল গঠনের বিষয়েও কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাজ করছে।

 

অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাংকের পরিচালকরা আমানতের সর্বোচ্চ ৬ এবং ঋণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ (নয়-ছয়) সুদহার কার্যকরের ঘোষণা দেন গত বছরের মে মাসে। গত বছরের ১ জুলাই থেকে এটি কার্যকর করার কথা। এ হার বাস্তবায়ন করতে ব্যাংকগুলোকে সরকার চারটি বিশেষ সুবিধা দিয়েছে।

 

এর মধ্যে রয়েছে- সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে রাখা, আগে রাখা যেত সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ। একই সঙ্গে আমানতের সুদের হারও কমানো হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সংরক্ষিত বাণিজ্যিক ব্যাংকের নগদ জমা বা সিআরআর সংরক্ষণের হার কমানো হয়। ফলে ব্যাংকগুলোর কাছে ফেরত যায় প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা।

 

কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে স্বল্পমেয়াদি ধারের নীতিনির্ধারণী ব্যবস্থা রেপোর (ট্রেজারি বিল পুনরায় ক্রয়-বিক্রয়) সুদহার কমানো হয়। এতে ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে স্বল্পমেয়াদে কম সুদে ধার নেয়ার সুযোগ তৈরি হয়।এসব ব্যবস্থার ফলে ব্যাংকগুলোর তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমলেও তারা ঋণের সুদের হার কমায়নি। উল্টো আমানত সংকটে এ হার আরও বাড়াতে থাকে।

 

অবস্থায় গত মে মাসে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সরকারি সংস্থাগুলোর আমানতের অর্থ ব্যাংকগুলোয়ও সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ সুদে আমানত হিসেবে রাখতে হবে।তবে এসব আমানত কেবল তারাই পাবে, যারা গত বছরের ২ আগস্টের পর থেকে ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে এনেছেন।এত উদ্যোগের পরও যখন ঋণের সুদের হার কমলো না, তখন প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, দেশের শিল্প ও ব্যবসা খাতকে প্রতিযোগিতায় সক্ষম করতে ব্যাংক ঋণের সুদের হার এক অংকের ওপরে রাখতে চান না।

 

এ লক্ষ্যে তারা কাজ শুরু করেছেন।যেসব ঋণগ্রহীতা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে খেলাপি হয়েছেন বা ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। পর্যায়ক্রমে ব্যাংকগুলো অনুমোদিত ও পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ বাড়ানো হবে।সংশ্লিষ্টরা জানান, এর মাধ্যমে সরকার খেলাপি ঋণ আদায় এবং মূলধন বৃদ্ধি করে তারল্যপ্রবাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এদিকে ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট মেটাতে বাজারে বিভিন্ন ধরনের বন্ড ও সঞ্চয়ী উপকরণ ছাড়ার উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে বাজেটে।

 

এর মাধ্যমে টাকার প্রবাহ বাড়িয়ে ঋণের সুদের হার কমানো হবে।বাজেটে বলা হয়, আর্থিক খাতে আগে বিশেষ কোনো উপকরণ ছিল না। তাই ব্যাংকগুলো স্বল্পমেয়াদি আমানত সংগ্রহ করে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ বিতরণে বাধ্য হতো। এতে ব্যাংকিং খাতে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়। এটি কখনও কখনও সংকট সৃষ্টি করে। এ জাতীয় ভারসাম্যহীনতা দূর করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।

 

একটি গতিশীল বন্ড মার্কেট তৈরি করতে বিভিন্ন ধরনের বন্ড ছাড়াকে উৎসাহিত করা হবে।এদিকে বাজেটোত্তর এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী ঋণের সুদের হার কমানোর ব্যাপারে সরকারের অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। যারা প্রতিশ্রুতি দিয়েও সুদের হার কমায়নি, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার হুশিয়ারিও তিনি দিয়েছেন।

 

প্রধানমন্ত্রীর এ ঘোষণার পর ব্যাংকিং খাত কিছুটা নড়েচড়ে বসেছে। তারা সব খাতে না হলেও কিছু খাতে ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার চেষ্টা করছে। এর মধ্যে শিল্প খাতকেই তারা প্রাধান্য দিচ্ছে।এ বিষয়ে ব্যাংকগুলোর পক্ষে এরই মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে অনির্ধারিত আলোচনাও হয়েছে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকও ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে।

 

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যেসব বিশেষ তহবিল গঠন করা হয়েছে, সেগুলোর ঋণের সুদের হার এখন সিঙ্গেল ডিজিটে রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে আরও কম। শিল্প খাতের জন্য এ ধরনের বিশেষ তহবিল গঠনের কথাটি এখন ভাবা হচ্ছে।এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত সরকারি খাতের পাঁচটি ও বেসরকারি খাতের দুটি ব্যাংক ছাড়া বাকি সব ব্যাংকের গড় সুদহার ডাবল ডিজিটে রয়েছে।

 

এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ হাতেম যুগান্তরকে বলেন, ১৩-১৪ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে কেউ ব্যবসা করতে পারবেন না। তার ওপর চক্রবৃদ্ধি সুদ। তিনি বলেন, সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে আনাসহ চক্রবৃদ্ধি সুদ বন্ধ করতে হবে। ব্যবসায়ীরা শেষ হয়ে যাচ্ছেন। অনেকে নীরবে ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছেন।