প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ইমার্জেন্সি অ্যান্ড ক্যাজুয়ালটি বিভাগের বেডে শুয়ে ছিলেন ষাটোর্ধ্ব আব্দুল মান্নান। নিস্তেজ দেহ, চোখ বন্ধ। মাথা ও হাত-পায়ে আঘাতের চিহ্ন। কাছে গিয়ে দাঁড়ানোর কিছুক্ষণ পর চোখ খুলে চাইলেন। তাতে ভর করে আছে আতঙ্ক। আগের রাতের বিভীষিকাময় স্মৃতি যেন এখন তাড়া করছে তাঁকে। বললেন, ‘আখতা (হঠাৎ) বিকট আওয়াজ।

 

 

এর পরেই লাগল দুনিয়াই ভাঙ্গিয়া যারগি (এরপরই মনে হলো দুনিয়া ভেঙে যাচ্ছে)। এর বাদে আর কিচ্ছু কইতে পারি না রে বাবা। হুঁশ যখন আইল, দেখি হসপিটালও।’ এটুকু বলেই আবার চোখ বন্ধ করলেন। দীর্ঘ, ঘন সফেদ দাড়ির আড়ালে অনেকটাই ঢাকা পড়া ঠোঁট জোড়া স্পষ্টই কাঁপছে।

 

 

সিলেট থেকে ঢাকাগামী আন্ত নগর ট্রেন উপবন এক্সপ্রেস গত রবিবার রাতে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার বরমচালে দুর্ঘটনায় পতিত হয়। সেই ট্রেনের যাত্রী ছিলেন আব্দুল মান্নান ও তাঁর দুই ছেলে। দুর্ঘটনায় তিনজনই কমবেশি আহত হয়েছেন।গতকাল সোমবার দুপুরে সিলেট অঞ্চলে চিকিৎসাসেবার সর্ববৃহৎ প্রতিষ্ঠান সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে এমন চিত্র।

 

 

ক্যাজুয়ালটি বিভাগের অন্য বেডগুলোতেও আহতরা শুয়ে-বসে আছে। আগের রাতের ভয়াবহ দুর্ঘটনার আতঙ্ক যেন হাসপাতালের বেডে শুয়েও পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারছে না তারা। এদের মধ্যে যাদের আঘাত গুরুতর নয় তারা বাড়ি ফেরার তোড়জোড় করছে। আর যাদের আঘাত বেশি, তাদের স্বজনরা চিকিৎসার বিষয়ে ছোটাছুটি করছে। আহতরা বলছে, প্রতিটি বগিতে অতিরিক্ত যাত্রী ছিল। যতজন যাত্রী বসা ছিল, এর দ্বিগুণের বেশি ছিল দাঁড়ানো। আর দরজার কাছে থাকা যাত্রীদের বেশির ভাগই দুর্ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে বাইরে ছিটকে পড়ে।

 

 

সেবার স্বপ্ন পূরণ হলো না ইভা ও সানজিদার.ফাহমিদা ইয়াসমিন ইভা (২০) ও সানজিদা আক্তারের (২১) স্বপ্ন ছিল সেবিকা হবেন। অসুস্থদের সেবা দিয়ে সুস্থ করে তুলবেন। সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতেই ভর্তি হয়েছিলেন সিলেট নার্সিং কলেজে। কিন্তু গত রবিবার রাতের ট্রেন দুর্ঘটনা তাঁদের সেই স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে। অকালে প্রাণ হারিয়েছেন দুই বান্ধবী।

 

 

ইভা সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার জালালপুরের আবদুল্লাহপুর গ্রামের আবদুল বারীর মেয়ে। তিন ভাই-বোনের মধ্যে ইভা সবার ছোট। পরিবারটিতে চলছে শোকের মাতম। ইভার ভাই আবদুল হামিদ বলেন, ‘রবিবার রাত ১০টার দিকে সিলেট রেলস্টেশন ছাড়ে উপবন এক্সপ্রেস। ট্রেন ছাড়ার কিছুক্ষণ আগে মাকে ফোন করে ইভা বান্ধবীর সঙ্গে প্রশিক্ষণের জন্য ঢাকায় যাওয়ার কথা জানায়। এই আমাদের সঙ্গে ওর শেষ কথা।’

 

 

আর সানজিদা আক্তার বাগেরহাটের মোল্লাহাট থানার আতজুরি ভানদর খোলা গ্রামের আকরাম মোল্লার মেয়ে। গতকাল বিকেলে তাঁর মরদেহ ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়। নার্সেস অ্যাসোসিয়েশন সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল শাখার সাধারণ সম্পাদক ইসরাইল আলী সাদেক জানান, সানজিদার লাশ নার্সিং কলেজে নিয়ে আসার পর ওর সহপাঠীরা কান্নায় ভেঙে পড়ে।

 

 

বিকেল সাড়ে ৫টায় নার্সিং কলেজে জানাজা শেষে মরদেহ হিমঘরে রাখা হয়েছে। আর নিহত ইভার মরদেহ পরিবারের সদস্যরা বাড়িতে নিয়ে গেছে। সিলেট নার্সিং কলেজের অধ্যক্ষ ফয়সল আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘পারিবারিক কাজের কথা বলে ইভা রবিবার হোস্টেল থেকে ছুটি নিয়েছিল। আর সানজিদা হোস্টেলে থাকত না। ওদের ঢাকায় যাওয়ার তথ্যও আমাদের কাছে ছিল না।’