প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:সরকার পরিচালনায় আওয়ামী লীগের একলা চলো নীতিতে হতাশা বাড়ছে ক্ষমতাসীন জোট ১৪ দলের অন্য শরিকদের মধ্যে। জোটের প্রধান শরিক দল আওয়ামী লীগের উপেক্ষার শিকার হওয়ায় অসন্তুষ্ট অন্য শরিক দলগুলো। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর মন্ত্রিসভায় ঠাঁই হয়নি ১৪ দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের।

 

সংসদেও গতবারের চেয়ে আসন কমেছে ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, বাংলাদেশ জাসদ, জেপি ও তরীকত ফেডারেশনের। অন্য শরিকদের ভাগ্যে তো জোটের মনোনয়নই জোটেনি। কোনো দিক থেকেই সুবিধা করতে না পেরে ক্ষুব্ধ ১৪ দলের ‘ছোট’ শরিকরা। তারা এখন অনুকূল সময়ের অপেক্ষায় আছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি দলের গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকজন নেতা এমন তথ্য দিয়েছেন।

 

ওই নেতারা জানান, এখনো ১৪ দলের উপযোগিতা শেষ হয়ে যায়নি। যে লক্ষ্য, উদ্দেশ্য নিয়ে ১৪ দল গঠিত হয়েছিল তা এখনো ফুরায়নি। জোট নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিষয়টি উপলব্ধি করবেন বলে ওই নেতারা মনে করেন। তাঁদের মতে, ১৪ দলীয় জোটকে মূল্যায়নের বিষয়ে তাঁর সিদ্ধান্তই সব। তবে যথাযথ মূল্যায়ন না পেলে একটা সময় জোটের শরিকরা ভিন্ন চিন্তা করতে বাধ্য হবে। আওয়ামী লীগের উপেক্ষার ধারা চলতে থাকলে একসময় শরিকরা পরিবেশ পরিস্থিতি বুঝে স্বতন্ত্র ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে।

 

সংশ্লিষ্ট নেতাদের মতে, আওয়ামী লীগের যখন প্রতিকূল সময় ছিল তখন তারা জোটগত রাজনীতিকে গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু বর্তমানে বিএনপি জামায়াত কোণঠাসা হয়ে পড়ায় রাজনীতেতে আওয়ামী লীগ খুবই সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় ১৪ দলকে গুরুত্ব দিচ্ছে না আওয়ামী লীগ। তবে রাজনীতিতে সব সময় পরিস্থিতি এক রকম থাকে না। সরকারের জন্য একটু প্রতিকূল পরিস্থিতি এলেই ১৪ দলের শরিকদের গুরুত্ব বাড়বে।

 

ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা কালের কণ্ঠকে বলেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কারণে ১৪ দলের সক্রিয়তা হারিয়েছে। তাঁরা ১৪ দলকে নিষ্ক্রিয় করে এককভাবে দলীয় কার্যক্রমে যাচ্ছে। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে ১৪ দল গঠিত হয়েছিল অর্থাৎ দেশকে একটি অসাম্প্রদায়িক দেশে পরিণত করা—সেই প্রয়োজন এখনো যায়নি।

 

সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাজনীতিতে দলগুলোর অপরিবর্তনীয় কোনো অবস্থান থাকে না। একেক সময়ে একেক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একেকটা কৌশল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৪ দল গঠনকালীন বাস্তবতা আর এখনকার বাস্তবতার অনেক ফারাক। এ দেশের রাজনীতিতে বিএনপি-জামায়াত কোণঠাসা হয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আনুপাতিক হারে আওয়ামী লীগের কাছে জোটের শরিকদের গুরুত্ব কমেছে। ভবিষ্যতে আবার পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে জোটের শরিকদের গুরুত্বও কমবেশি হবে।’

 

বাংলাদেশ জাসদের সভাপতি শরিফ নুরুল আম্বিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকার গঠনে আওয়ামী লীগের একলা চলো নীতি রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত একটি কাজ। এখন জোটে একটা ভারসাম্যহীন পরিস্থিতি বিরাজ করছে। তবে এখনো ১৪ দল বিলুপ্ত হয়নি। জোটের শরিকরা যার যার অবস্থান থেকে নিজেদের সংগঠিত করতে পারলে পরে অবস্থা কী হবে বলা যাচ্ছে না।’

 

১৪ দলের শরিক একটি বামদলের কেন্দ্রীয় গুরুত্বপূর্ণ এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আওয়ামী লীগের জন্য প্রতিকূল একটি রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ১৪ দল গঠন হয়েছিল। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ভয়াবহতার পর সেসময়ের ক্ষমতাসীন চারদলীয় জোটকে মোকাবেলায় আওয়ামী লীগের একটি বৃহৎ রাজনৈতিক জোট দরকার ছিল। সে বাস্তবতায়ই তারা জোটগত রাজনীতির দিকে ঝুঁকেছিল।

 

কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। আওয়ামী লীগ টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আছে। তাদের প্রতিপক্ষ বিএনপি-জামায়াত রাজনীতিতে একেবারেই কোণঠাসা। ফলে এখনকার বাস্তবতায় সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা আওয়ামী লীগের কাছে জোট শরিকদের গুরুত্ব কমে গেছে।

 

১৪ দলের শরিক একাধিক দলের কেন্দ্রীয় বেশ কয়েকজন নেতা জানান, বিভিন্ন ইস্যুতে ১৪ দলের একাধিক শরিক দলের নেতাদের নিয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের নানা বক্তব্যের কারণেও জোটের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। সম্প্রতি জাসদের সাবেক সভাপতি প্রয়াত কাজী আরেফ আহমেদকে নিয়ে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমুর গণমাধ্যমে একটি মন্তব্যের কারণে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায় ১৪ দলের দুই শরিক জাসদ ও বাংলাদেশ জাসদ।

 

কিছুদিন আগে সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়ার সঙ্গে গণমাধ্যমে আমির হোসেন আমুর বাহাস চলে বেশ কয়েক দিন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের একটি বক্তব্য নিয়েও আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা গণমাধ্যমে সমালোচনা করেন। বর্তমান সরকারের মেয়াদকালের ছয় মাসে ১৪ দলের শরিকদের সঙ্গে আরো একাধিক মতবিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। সরকার গঠন নিয়ে অসন্তোষের ফলেই নানা ইস্যুতে জোট শরিকদের মতপার্থক্য সামনে আসছে।