প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:লাখ লাখ টাকা ঘুষ ও মামা-খালুর জোর থাকলেই পুলিশে চাকরি হয়। নাহলে সম্ভব হয়! এ কথা লোকমুখেই বেশ প্রচলিত। তবে এবার ঠাকুরগাঁওয়ে তার সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে মাত্র ১০৩ টাকা ব্যয়ে ঠাকুরগাঁওয়ে পুলিশ কনস্টেবল পদে ৩৮ জন তরুণ-তরুণী চাকরি পেয়েছেন।

 

 

সারা দেশের মতো পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এবার ঠাকুরগাঁও থেকে নেওয়া হলো ৩৮ জনকে।ঠাকুরগাঁও পুলিশ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত ২৬ জুন ঠাকুরগাঁও পুলিশ লাইনে প্রায় ৩ হাজার জন নারী-পুরুষ পুলিশ কনেস্টবল নিয়োগে যাচাই-বাছাই অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রাথমিক শারীরিক পরীক্ষায় ৫০৩ জন নারী-পুরুষ উত্তীর্ণ হয়। এরপর ২ জুলাই লিখিত পরীক্ষায় ১৮৩ জন নারী-পুরুষ উত্তীর্ণ হয়। এরপর ৩ জুলাই চুলচেরা বিশ্লেষণ করে সম্পূর্ণ মেধার ভিত্তিতে ৩৮ জন নারী-পুরুষের নাম চূড়ান্ত করা হয় এবং এই ৩৮ জনকে পুলিশ কনেস্টবল পদে চাকরি দেয়া হয়।

 

 

পরে ওই দিনই পুলিশ লাইনে এক অনুষ্ঠানে সদ্য পুলিশ কনেস্টবলে চাকরিপ্রাপ্ত ১৯ জন নারী ও ১৯ জন পুরুষকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান ঠাকুরগাঁওয়ের পুলিশ সুপার মনিরুজ্জামান মনির। এসময় পুলিশের অন্য কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়াও পুলিশের বিভাগের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারের সদস্যরা সদ্য নিয়োগ প্রাপ্ত কনেস্টবল পদে নারী-পুরুষদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের পরিবারের লোকজনকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন।

 

এদিকে পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগের প্রায় এক মাস আগে থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণা, লিফলেট বিতরণ, মাইকিং এবং জেলার বিভিন্ন স্থানে ব্যানার টাঙানো হয় ঠাকুরগাঁও পুলিশ বিভাগের পক্ষ থেকে। এবার আর্থিক লেনদেনসহ সব অনিয়ম ও সুপারিশ পরিহার করে সুষ্ঠুভাবে পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগের বিষয়টি সম্পন্ন করতে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়। বাড়ানো হয়েছিল গোয়েন্দা নজরদারিও।

 

 

১৯ জন নারীর মধ্যে সদর উপজেলার হরিনারায়নপুর গ্রামের দিনমজুরের মেয়ে রোজিনা আক্তার। বাবা রেজাউল করিম, পেশায় তিনি একজন দিনমজুর। অভাবের সংসারের হাল ধরার মতো কেউ নেই। বাবার পক্ষে এ সংসার চালানো দায়।
রোজিনা আক্তার বলেন, ছোট বেলা থেকেই আমার খুব ইচ্ছে ছিল পুলিশে চাকরি করার। কিন্তু অভাবের সংসারে ঘুষ দিয়ে চাকরি নেওয়ার সেই সামর্থ্য নেই আমার। তিনি বলেন, এবার আমি শুনেছি পুলিশের চাকরিতে কোনো ঘুষ লাগবেনা।

 

 

পুলিশের এমন প্রচারণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে কনেস্টবল পদে আবেদন করেছিলাম। পরিবারের পক্ষ থেকেও উদ্বুদ্ধ করা হয় আমাকে। তাই আত্মবিশ্বাসও ছিল বেশ। সর্বশেষ মেধার ভিতিত্তেই আমার চাকরি হয়েছে। কিন্তু লেগেছে মাত্র ১০০ টাকার ব্যাংক ড্রাফট ও ৩ টাকার পুলিশ ফরম। মাত্র ১০৩ টাকায় আমার চাকরি হয়েছে। এখন সংসারের কিছুটা হাল আমিও ধরতে পারব।

 

 

১৯ জন ছেলের মধ্যে সদর উপজেলার আখানগর গ্রামের কৃষক সাতাব উদ্দীনের ছেলে আশরাফ আলী। তিনি বলেন, ঘুষ ছাড়া পুলিশে চাকরি হয়না, এটা খুব প্রচলিত ছিল; তারপর টাকা দিলেও দেখা যায় চাকরি নেই এবং টাকাও নেই। কিন্তু এবার ঠিক তার উল্টো চিত্র ঠাকুরগাঁওয়ে। মাত্র ১০৩ টাকায় মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতেই আমার পুলিশ কনেস্টবল পদে চাকরি হয়েছে।
ঠাকুরগাঁওয়ে ঘুষ ছাড়াই চাকরি হয়; এটা প্রমাণ করেছে পুলিশ বিভাগ। মানুষের মাঝে ফিরে এসেছে পুলিশের প্রতি আস্থা ও ভরসা। এজন্য পুলিশ বিভাগকে ধন্যবাদ জানিয়েছে ঠাকুরগাঁওয়ের সর্বস্তরের মানুষ।

 

ঠাকুরগাঁওয়ের পুলিশ সুপার মোহাঃ মনিরুজ্জামান বলেন, চাকরি পাওয়া ছেলে মেয়েদের অভিব্যক্তি শুনে আমি বিমোহিত হয়েছি। যারা চাকরি পেয়েছে তাদের অধিকাংশই হতদরিদ্র কৃষক ও দিনমজুর পরিবারের সন্তান। প্রকৃত মেধাবিরাই সুযোগ পেয়েছে চাকরিতে।

 

 

তিনি আরও বলেন, সরকারসহ পুলিশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্তাব্যক্তিরা চাচ্ছেন পুলিশে স্বচ্ছতা ফিরে আসুক। সেই চাওয়া পূরণেই ঠাকুরগাঁওয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রেখে শুধু মেধা এবং প্রয়োজনীয় যোগ্যতার ভিত্তিতেই এবারে পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ সম্পন্ন করা হয়েছে। এ ধারা আগামীতেও অব্যাহত রাখতে চাই।