ঢাকা, বুধবার, ১৩ই ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং | ২৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

আমার মুক্তি আলোয় আলোয়

আমি একজন নারী। মধ্যবিত্ত শিক্ষিত পরিবারে জন্মগ্রহন ও বেড়ে ওঠা। সমাজের বেড়া জাল ছিন্ন করতে চাওয়া আমার গতানুগতিক ইচ্ছা। ধর্মীয় অনুশাসন ও সামাজিক রীতিনীতি অনুসরণ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সন্তানদের বেড়ে ওঠা।

বেড় ওঠার সাথে সাথে সমাজিক অসংগতি একটু একটু বুঝতে শিখা। বৈষম্যগুলো প্রতিনিয়ত আমারমত সকল নারীর চোখে নিত্য নৈমত্তিক ঘটনা ও মনে প্রাণে তা বর্জন করার আকুল ইচ্ছা, বাসনা ও প্রার্থনা। রবীন্দ্রনাথের হৈমন্তী লবিন্য, শরৎচন্দ্রের বিলাসী, সবই এখন ও আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ঘটনা। বেগম রোকেয়ার নারী জাগরন শুধুই স্লোগান। মিটিং মিছিল ও ভাষন এ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সর্বোচ্চ আসনে নারী। চাকরির ক্ষেত্রে নারীর কোটা। গার্মেন্টস শিল্পে নারী শ্রমিক এর অবাধ বিচরন। এ চিত্রে কি নারীর জীবনের সামগ্রিক অংশের প্রতিফলন হয়? কখনই না। অধিকার চাইতে গেলে তাকে আলাদা করে শ্রেণী করা, তা নারীবাদী। নারীবাদী এই ট্যাগ ভদ্র বেশী এক শ্রেণী কর্তৃক প্রদ ও ট্যাগ। আর বাকি সব ট্যাগ বেপয়োর, অবাধ্য, উৎশৃঙ্খল নারী। এ ক্ষেত্রে অবশিষ্ট ভোগী নারী নিজের জন্য তার মনে কল্পিত ট্যাগ “জন্মই আমার অজন্ম পাপ”।

আদিকাল থেকে এখন পর্যন্ত বৈষম্যমূলক সমাজ ব্যবস্থা নারীর জন্য প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা। নারীর জন্য অসংগতিটা স্বাভাবিক ও অসংগতি দূর রকার চেষ্টাই অস্বাভাবিক, ভ্রান্ত, ও অলীক কল্পনা। নজরুলের সেই কবিতা-
কোন কালে হয়নি তো জয় পুরুষ তরবারী, প্রেরনা দিয়াছে শক্তি দিয়েছে বিজয়ী লক্ষী নারী। নারী লক্ষী বটেই যদি তার নায্য প্রাপ্য জিনিস যতক্ষন না পর্যন্ত চাইতে পারে। বৈষম্য টা শুরু হয় পরিবার থেকে।

বুঝতে শিখানো হয় সে পরিবারের সাময়িক সদস্য। তারপর চূড়ান্ত হয় সম্পত্তি বন্টনের মধ্যে দিয়ে। সম্পত্তি বন্টনের ক্ষেত্রে বিবিন্ন ধর্মীয় রীতি। অনুসরনীয় ও শিরর্ধায্য বিষয়। হিন্দু আইনে নারীকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা ও মুসলিম আইনে ভাইয়ের অংশের অর্ধেক সম্পত্তি বন্টের মধ্যে দিয়ে। সেক্ষেত্রে, পবিত্র কুরআনকে স্বাক্ষী করা। পবিত্র কুরআন এর সূরা নিমাতে বলা হয়েছে – কোন ক্ষেত্রেই বোন তার ভাইয়ের সম্পত্তির অর্ধেকের কম সম্পত্তি পাবেনা।

সমান পাবে না, তা কিন্তু কোথাও স্পষ্ট বাবে বলা হয় নি। রাষ্ট্র কি পারেনা তার প্রনীত আইনের যথার্থ প্রয়োগ করতে? সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭,২৮,৩১ এর সঠিক বাস্তবায়নের মধ্যে।

Man is not made for law, rather than law is made for man রাষ্ট্র, রাষ্ট্রীয় নীতি, প্রশাসন কি পারে না নারীর যোগ্য মূল্যায়ন করতে। নারী নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত আইন ২০০৩) নারীকে সুরক্ষা নিতে আইন প্রায়ন করেছে। কিন্তু, কি হারে এই আইন কার্যকর হচ্ছে? নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনাল প্রতিদিন কয়টা কেস পাচ্ছে আর কয়টা মিমাংসা দিচ্ছে? বিচার চাওয়া ও পাওয়া নারীর জন্য খুব স্বস্থিকর বিষয় নয়।

একজন নারী সমাজের যে শ্রেনিতে বসবাস করুক না কেন তার প্রাপ্য অর্জন করা অধরাই রয়ে যায়। অনেকটা তিস্তা চুক্তির মত। তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় প্রধান কারন গ্যারান্টি ক্লোজ। নারীর সুরক্ষায় প্রণীত আইন তাই অনেক, অংশই নারীবান্ধব হতে পারে নি। Domestic Violence Act, ২০১০ নারীকে সামগ্রিক ভাবে সুরক্ষা দিতে পারে নি। কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্নই থেকে যায়। ধর্মীয় নীতি, সামাজিক মূল্যবোধ ও আইন কোনটাই পারেনি নারীকে যোগ্য সম্মান, মর্যাদা ও প্রাপ্য দিতে।

সমাজের সর্বস্তরের মানুষের আন্তরিক চেষ্টা, সহযোগিতা, শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় নারীকে উপহার দিতে পারে বৈষম্যহীন সমাজ। না হতে পারে নারীর চেষ্টা, শ্রমের, সঠিক মূল্যায়ন, কারো দয়া, করুনা নয়।

ফারজানা কাশেমী, আইনজীবি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক

Lead News এর আরও খবর
Translate »